শাবিপ্রবিতে মাস্টার্স থিসিস আবেদনে অযৌক্তিক বাড়তি শর্তের অভিযোগ, ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স থিসিস প্রোগ্রামে আবেদনের ক্ষেত্রে নতুন করে জীবনবৃত্তান্ত, সুপারভাইজারের প্রত্যয়নপত্র, রেফারেন্স লেটার, সার্টিফিকেটসহ নানা অযৌক্তিক শর্ত আরোপের অভিযোগ উঠেছে। এসব শর্ত আরোপকে অপ্রয়োজনীয় ও হয়রানি বলে অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থীরা। কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব নিয়ম আগে থেকেই থাকলেও তা মানা হতো না।
এ ছাড়া রেজিস্ট্রার দপ্তরের নোটিশে থিসিস প্রোগ্রামের জন্য এসব বাড়তি শর্ত ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য বলা হলেও তা মৌখিক আদেশে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে জানান বিভাগগুলোর প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। তবে এটাকে টাইপিং ভুল বলছেন রেজিস্ট্রার দপ্তরের কর্মকর্তারা।
গত ২৭ জুলাই রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরিত ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ উল্লেখ করে মাস্টার্স বাই কোর্সওয়ার্ক, মাস্টার্স বাই মিক্সড মোড (থিসিস প্রোগ্রাম), মাস্টার্স বাই রিসার্চ ও ডক্টোরাল বাই রিসার্চ প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এতে আবেদনের সঙ্গে জীবনবৃত্তান্ত (সিভি), ব্যাংক রশিদ, পাসপোর্ট সাইজের দুই কপি ছবি, সনদ ও গ্রেড সার্টিফিকেটের সত্যায়িত কপি জমাদানের আহ্বান করা হয়। একইসাথে মাস্টার্স বাই কোর্সওয়াক বাদে বাকী প্রোগ্রামগুলোর জন্য গবেষণা প্রস্তাবের সারসংক্ষেপ, সুপারভাইজারের প্রত্যয়নপত্র ও রেফারেন্স লেটার সংযুক্ত করার শর্ত দেওয়া হয়। এতে আবেদনের শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয় ১৫ সেপ্টেম্বর। তবে অভিযোগ রয়েছে, নোটিশটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ হলেও অনেক বিভাগগুলো এর হার্ডকপি যথাসময়ে পাঠানো হয়নি।
মাস্টার্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা বলছেন, প্রথমে ভর্তি ফরমসহ স্ববিভাগের অ্যাপিয়ার্ড সার্টিফিকেট, ব্যাংক রশিদ, পাসপার্টের সাইজের দুই কপি সত্যায়িত ছবি রেজিস্ট্রার দপ্তরে একবার জমা দিয়েছি। এগুলো আবার জমা নেওয়া তো কোন অর্থ হয় না।
এ দিকে বিভাগগুলো আগের নিয়ম অনুযায়ী থিসিসের বিষয় ও সুপারভাইজারের নাম উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আবেদন নিয়ে জিএসসি সভায় অনুমোদন করে তা রেজিস্ট্রার দপ্তরের একাডেমিক শাখায় পাঠায়। কিন্তু রেজিস্ট্রার দপ্তরের একাডেমিক শাখা সেসব আবেদন প্রত্যাখ্যান করে বিভাগগুলোকে নতুন বিজ্ঞপ্তির শর্ত মেনে পুনরায় আবেদন জমা দিতে বলে।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ভাষ্য, আগে থিসিস আবেদনের জন্য এত ব্যাপক কাগজপত্রের প্রয়োজন হতো না। এখান থেকে স্নাতক শেষ করা শিক্ষার্থীদের যাবতীয় একাডেমিক তথ্য কর্তৃপক্ষের কাছে আগে থেকেই সংরক্ষিত আছে। নতুন করে একই তথ্য ও সনদ চাওয়াকে তারা অপ্রয়োজনীয় ও হয়রানি বলে মনে মনে করছেন। এছাড়া জিএসসি সভায় ইতোমধ্যে অনুমোদিত থিসিস শিক্ষার্থীদের সুপারভাইজারের প্রত্যয়নপত্র ও রেফারেন্স লেটার কেন আবার আলাদাভাবে জমা দিতে হবে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন।
নোটিশে উল্লেখ করা সুপারভাইজারের প্রত্যয়নপত্র ও রেফারেন্স লেটারের মধ্যে পার্থক্য এবং জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।
এ দিকে সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠেছে ফলাফল প্রকাশ না হওয়া নিয়ে। সব বিভাগে মাস্টার্স কার্যক্রম শুরু হলেও লোক প্রশাসন বিভাগের স্নাতকের চূড়ান্ত ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি বলে জানান বিভাগটির শিক্ষার্থীরা। ফলে ১৫ সেপ্টেম্বরের আবেদনের শেষ সময়সীমা নির্ধারিত থাকলেও, এসব বিভাগের অনেক শিক্ষার্থী এখনো তাদের স্নাতকের ফলাফলই হাতে পাননি।
থিসিস প্রোগ্রামের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা তো এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই স্নাতক শেষ করেছি। আমাদের সব একাডেমিক তথ্য ও ডকুমেন্ট আগে থেকেই রেজিস্ট্রার দপ্তরে সংরক্ষিত আছে। তাহলে নতুন করে জীবনবৃত্তান্ত, রেফারেন্স লেটার নামে এমন হয়রানি কেন?’
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘যেখানে জিএসসি সভায় মিক্সড মেথডের অধীনে থিসিস শিক্ষার্থীদের ও তাদের টপিক মনোনীত হয়েছে, সেখানে আবার নতুন সুপারভাইজারের প্রত্যয়নপত্র, রেফারেন্স লেটার চাওয়া অপ্রয়োজনীয় ও বাড়তি কাজ। একইসাথে শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক ভর্তি ফর্মের সাথে ব্যাংক রশিদ জমা দিয়েছে, তাহলে আবার নেওয়াও তো হয়রানির কাজ।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘হলের ভর্তির সময় দিয়েছে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এদিকে আমরা এখনো রেজাল্ট পাইনি। মাস্টার্সের রেজিষ্ট্রেশন নাম্বারও এখনো পাইনি। তাহলে আমরা ভর্তি ফরমে রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার কি দিবো? আগে তো এই ধরনের শর্ত ছিল না। হঠাৎ করে অল্প সময়সীমা বেঁধে দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার ও গ্র্যাজুয়েট এডমিশন কমিটির সেক্রেটারি সাবিহা ইয়াসমিন বলেন, ‘এসব নিয়ম আগে থেকেই অর্ডিন্যান্সে ছিল, কিন্তু অনুসরণ করা হতো না। রেফারেন্স লেটার, সুপারভাইজারের কনসার্ন লেটার ও থিসিস প্রস্তাব এই বিষয়গুলোই আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়। যাদের ফল প্রকাশিত হয়নি, তারা বিভাগ থেকে সিজিপিএ উল্লেখসহ টেস্টিমোনিয়াল জমা দিতে পারবেন। ডিনদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এসব নথি পরে জমাদান সাপেক্ষে শর্তসাপেক্ষ ভর্তি অনুমোদন দেওয়া হবে। এরপর বোর্ড অব স্টাডিজ ও একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদনের পরই প্রকৃত রেজিস্ট্রেশন নম্বর মিলবে।’
এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কালাম আহমদ চৌধুরীকে একাধিকবার কল দিয়েও পাওয়া যায়নি।