নোবিপ্রবিতে ছাত্রদলের সংঘর্ষের নেপথ্যে কী?
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষকে ঘিরে সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রকাশ্যে ঘটনাটির সূত্রপাত হলের একটি কক্ষের সিট পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে হলেও সংঘর্ষের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ, বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ, দুই আবাসিক হলের প্রশাসনের ভূমিকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক উকিল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদের ভূমিকা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
ইতোমধ্যে ঘটনার তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। কমিটি সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়ার পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ ও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বিশ্লেষণ করছে। আগামীকাল রবিবার (৩০ আগস্ট) তাদের প্রতিবেদন উপাচার্যের কাছে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। অন্যদিকে সংঘর্ষের পর নোবিপ্রবি ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। ঘটনার প্রকৃত নেপথ্য কী—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সিট পরিবর্তন থেকে সংঘর্ষ
শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ আগস্ট গভীর রাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক উকিল হলের ৪১৩ নম্বর কক্ষে সিট পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। পরে তা হাতাহাতিতে গড়ায়।
প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নোবিপ্রবি ছাত্রদলের সভাপতি জাহিদ হাসান ও সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হোসেনের অনুসারীদের সঙ্গে সিনিয়র সহ-সভাপতি সাব্বির হোসেন শান্তর অনুসারীদের বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পরে হল ও পকেট গেট এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষে আহত একজন (১৮ আগস্টের ফটো)
পরদিন সংঘর্ষ আরও বিস্তৃত হলে হলের বিভিন্ন কক্ষে ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। সংঘর্ষের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দুই সাংবাদিকও হেনস্তার শিকার হন। অপর এক সাংবাদিকের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ধারণ করা ভিডিও মুছে ফেলার অভিযোগও পাওয়া গিয়েছে। একপর্যায়ে প্রক্টরিয়াল বডি একজন বহিরাগতকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
প্রশ্নের মুখে হল প্রশাসন
সংঘর্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হয়ে উঠেছে—যে দুটি আবাসিক হলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সূত্রপাত এবং পরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ল, তখন হল প্রশাসন কোথায় ছিল?
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সংঘর্ষের সময় এবং পরবর্তী দীর্ঘ সময় দুই হলের প্রভোস্ট ও আবাসিক শিক্ষকদের অনেকেই ঘটনাস্থলে ছিলেন না। ফলে হলের ভেতরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যায়নি।
বিশেষ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক উকিল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম হলের প্রভোস্ট সহকারী অধ্যাপক মো. ফরিদ দেওয়ান ছুটিতে ছিলেন বলে জানা গেছে।
সংঘর্ষের দিন ড. কাইয়ুম মাসুদ ঢাকায় ছিলেন (ফেসবুক থেকে নেয়া)
প্রাপ্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট সংঘর্ষের সময় অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদ ক্যাম্পাসের বাইরে ছিলেন। একই সময়ে রাজধানীতে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁর অংশগ্রহণ এবং সেখানকার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের তথ্যও সামনে এসেছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে—একটি আবাসিক হলে যখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে, তখন হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রভোস্ট কীভাবে ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান করছিলেন? এছাড়াও সংঘর্ষের দিন ১৮ আগস্ট শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হাসান হাসিবকে প্রকাশ্যে বলতে দেখা যায়, ‘মাসুদ কাইয়ুম স্যার কই এখানে?’
ছুটি ছাড়াই অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ
অধ্যাপক ড. আব্দুল মাসুদ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—তিনি ছুটি না নিয়েই ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী, কোনো প্রভোস্ট ছুটিতে গেলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার কথা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে অধ্যাপক মাসুদের ওই সময়ের ছুটির অনুমোদন বা রেজিস্ট্রার দপ্তরে পাঠানো ছুটির আবেদন পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সংঘর্ষের দিন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদককে প্রকাশ্যে বলতে দেখা যায়, ‘মাসুদ কাইয়ুম স্যার কই এখানে?’ (ফাইল ফটো)
সংঘর্ষের আগে থেকেই অস্থিরতার অভিযোগ
অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে—সংঘর্ষের আগেই তিনি ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদের অসন্তোষ তৈরি হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ না পাওয়ার পর তিনি প্রশাসন তথা সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং ক্যাম্পাসে অস্থিরতা তৈরির তৎপরতায় যুক্ত হন।
মাইজদী শহরের হোটেল ভ্যালেন্টিনো (ফেসবুক থেকে নেয়া)
আরও অভিযোগ রয়েছে, কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের পূর্বমুহূর্তে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগপন্থী কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নামান।
সংঘর্ষের পরদিন হোটেলে বৈঠক
ঘটনার পরদিন মাইজদী শহরের হোটেল ভ্যালেন্টিনোতে ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি সাব্বির হোসেন শান্ত ও তার অনুসারীদের সঙ্গে অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদের একটি বৈঠকের তথ্যও সামনে এসেছে।
সংঘর্ষের সময় দেশীয় অস্ত্র হাতে কয়েকজন (১৮ আগস্টের ফটো)
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সংঘর্ষের মাত্র একদিন পর ছাত্রদলের একটি পক্ষের নেতাকর্মীদের সঙ্গে একজন শিক্ষকের এমন বৈঠক ছিল উদ্দেশ্যমূলক। বৈঠকের পর সাব্বিরপন্থি নেতাকর্মীদের ভূমিকা আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে বলেও সূত্রের দাবি।
এমনকি এরপর ক্যাম্পাসের মূল ফটকের সামনে একজন শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনাও ঘটে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে বৈঠকটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে অধ্যাপক ড. মাসুদের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, “আমার বিভাগের সিনিয়র-জুনিয়র শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই বিষয়ে ঝামেলা হয়। তারা সেটি মীমাংসা করার জন্য আমাকে ডেকেছে, আমি গিয়েছি।”
সংঘর্ষের সময় দেশীয় অস্ত্র হাতে একজন (১৮ আগস্টের ফটো)
সংঘর্ষের দায়ও উঠেছে ড. মাসুদের বিরুদ্ধে
১৮ আগস্ট সংঘর্ষের সময় বিলুপ্ত নোবিপ্রবি ছাত্রদল কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদকে সংঘর্ষের জন্য দায়ী করেন।
এ অভিযোগের সঙ্গে হোটেল বৈঠক, হল প্রশাসনে তাঁর অনুপস্থিতি এবং সংঘর্ষের আগের কথিত তৎপরতার বিষয়গুলো একসঙ্গে সামনে আসায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, সংঘর্ষের সময় হল প্রাঙ্গণে প্রক্টরিয়াল টিমকে যেতে নিরুৎসাহিত করেন অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদ। পাশাপাশি তদন্তের জন্য গঠিত কমিটি যেন সঠিক সময়ে প্রতিবেদন জমা দিতে না পারে সেজন্য কমিটির কতিপয় সদস্যকে অনুরোধও করেন তিনি।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও নোবিপ্রবির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. হাছান উদ্দীন জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ডাকা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ এবং অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। আগামীকাল প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
কমিটির সদস্যসচিব ও প্রক্টর অধ্যাপক এএফএম আরিফুর রহমানও জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে এবং বিভিন্ন ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা আমাদের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার। কোনো অবস্থাতেই ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না। ইতোমধ্যে গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি পুরো বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরপরই জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ক্যাম্পাসে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যৌথ নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।