চার প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় ফাতেমার
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বিদায় মুহূর্ত সাধারণত আবেগ আর স্মৃতিতে ভরা থাকে। তবে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষেরশিক্ষার্থী ফাতেমা জিন্নাতের বিদায়টি হয়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী। নিজের বিদায় সংবর্ধনায় নানি, মা ও ছোট্ট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে চার প্রজন্মের উপস্থিতিতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাদের একসঙ্গে উপস্থিতির দৃশ্যটি অনুষ্ঠানে তৈরি করে আবেগঘন ও অনন্য এক মুহূর্ত।
রবিবার (২৩ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা চত্বরে আয়োজিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ফাতেমা এসেছিলেন একা নন, সঙ্গে ছিলেন তার জীবনের সবচেয়ে আপন তিন প্রজন্ম। নানি, মা ও ছেলে ইয়াহিয়া—একসঙ্গে চার প্রজন্মের উপস্থিতিতে মুহূর্তটি হয়ে ওঠে ব্যতিক্রমী ও আবেগঘন। নাটোরের মেয়ে ফাতেমা জিন্নাতের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের এই বিশেষ দিনে পরিবারের তিন প্রজন্মকে পাশে পাওয়ার দৃশ্যটি মুহূর্তেই সবার নজর কেড়ে নেয়।
একটি প্রশ্ন, বদলে গেল অনুষ্ঠানের আবহ
বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ফাতেমার কাছে জানতে চান, অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে কারা এসেছেন। ফাতেমা জানান, তার সঙ্গে এসেছেন তার নানি, মা ও ছোট্ট ছেলে ইয়াহিয়া।
সাধারণ একটি প্রশ্নের এমন উত্তরই যেন বদলে দেয় অনুষ্ঠানের আবহ। বিষয়টি জানার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ, ডিন ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান তাদের মঞ্চে আমন্ত্রণ জানান এবং ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। মুহূর্তেই বিদায় সংবর্ধনার মঞ্চ হয়ে ওঠে চার প্রজন্মের ভালোবাসা, গর্ব ও আশীর্বাদের এক অনন্য দৃশ্যের সাক্ষী।
যে অর্জনের পেছনে ছিল দুই প্রজন্মের ভালোবাসা
ফাতেমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের এই অর্জন কেবল তার একার নয়। তার পথচলার প্রতিটি ধাপে ছিল মা ও নানির ভালোবাসা, দোয়া, ত্যাগ এবং নিরন্তর অনুপ্রেরণা। একজন মা যেমন সন্তানের স্বপ্ন পূরণে পাশে থেকেছেন, তেমনি নানির দোয়া হয়ে থেকেছে ফাতেমার পথচলার নীরব শক্তি। দীর্ঘদিনের সেই অপেক্ষা ও প্রার্থনার পর নাতনির বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সমাপ্তি নিজের চোখে দেখা নানির জন্যও নিশ্চয়ই ছিল গর্ব ও প্রশান্তির এক বিশেষ মুহূর্ত। আর সেই স্বপ্নপূরণের সাক্ষী হয়ে পাশে ছিল ছোট্ট ইয়াহিয়া।
মায়ের ক্লাস থেকে বিদায়ের মঞ্চে
ফাতেমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সঙ্গে ইয়াহিয়ারও যেন ছিল আলাদা এক সম্পর্ক। অনেক সময় ছোট্ট সন্তানটিও মায়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ক্লাসে উপস্থিত থাকত। মায়ের পড়াশোনার ব্যস্ততা, ক্যাম্পাসের দিনগুলো সবকিছুরই কোনো না কোনোভাবে সাক্ষী সে। তাই মায়ের বিদায়ের দিনটি শুধু ফাতেমার জন্য নয়, ইয়াহিয়ার জন্যও হয়ে উঠল একটি স্মরণীয় অধ্যায়।
হয়তো আজ সে জানে না, সেই দিনটি কতটা বিশেষ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বড় হতে হতে একদিন যখন সে এই ছবির দিকে তাকাবে, তখন হয়তো বুঝবে তার ছোট্ট উপস্থিতিও মায়ের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের মুহূর্তকে পূর্ণতা দিয়েছিল।
চোখে আনন্দাশ্রু, মনে গর্ব
সেদিন ফাতেমার চোখে ছিল বিদায়ের আবেগ। মায়ের চোখে ছিল আনন্দাশ্রু, গর্ব আর ভালোবাসা। আর নানীর চোখে ছিল দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আসা দোয়া ও প্রিয় নাতনির সাফল্য দেখার প্রশান্তি। চার প্রজন্মের এই উপস্থিতি যেন নীরবে একটি সত্যই বলে দিচ্ছিল একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য কখনোই শুধু তাঁর নিজের নয়।
একটি ডিগ্রির পেছনে থাকে পরিবারের ত্যাগ, অপেক্ষা, ভালোবাসা, উৎসাহ আর অসংখ্য প্রার্থনা। একজন শিক্ষার্থী যখন সাফল্যের শেষ ধাপে এসে দাঁড়ায়, তখন সেই অর্জনের আনন্দ ভাগ করে নেন তাঁর পরিবারও।
একটি ছবিতে চার প্রজন্মের গল্প
ফাতেমা জিন্নাতের বিদায় তাই শুধুই একজন শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সমাপ্তি নয়। এটি একটি পরিবারের স্বপ্নপূরণের গল্প। এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ভালোবাসা, দোয়া ও আশীর্বাদ পৌঁছে দেওয়ার গল্প। একটি ছবিতে হয়তো ধরা পড়েছে মাত্র কয়েকজন মানুষ। কিন্তু সেই ছবির ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি পরিবারের দীর্ঘ পথচলা একজন নানীর দোয়া, একজন মায়ের ত্যাগ ও ভালোবাসা, একজন শিক্ষার্থীর অর্জন এবং একটি ছোট্ট সন্তানের ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
ফাতেমার বিদায়ের সেই মুহূর্ত তাই হয়তো একটি অনুষ্ঠানের স্মৃতি হয়ে থেমে থাকবে না। বরং চার প্রজন্মের ভালোবাসা, ত্যাগ ও অর্জনের প্রতীক হয়ে থেকে যাবে একটি পরিবারের জন্য, আর পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতির পাতায়ও।