২৩ জুলাই ২০২৬, ২১:০১

ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপে চীনে যাচ্ছেন যবিপ্রবির দম্পতি: ব্যর্থতা পেরিয়ে স্বপ্ন জয়

দুই মুখ হলেন যবিপ্রবির পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (ইএসটি) বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাহিদ হাসান ও সোহেলী আশারফ  © টিডিসি ছবি

জীবনযুদ্ধে একে অপরের পরিপূরক হয়ে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) এক শিক্ষার্থী দম্পতি। যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসা প্রত্যাখ্যান ও আর্থিক ক্ষতির মতো বড় ধাক্কা সামলে অবশেষে ফুল ফান্ডেড চাইনিজ গভর্নমেন্ট স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি করতে চীনে যাচ্ছেন তারা। চীনের খ্যাতনামা সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির স্কুল অব আর্কিটেকচার-এ একই সঙ্গে পিএইচডি গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন তারা।

সাফল্যের পেছনের এই দুই মুখ হলেন যবিপ্রবির পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (ইএসটি) বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাহিদ হাসান ও সোহেলী আশারফ। তাদের একজনের বাড়ি যশোর সদরে এবং অন্যজনের বাড়ি ঝিকরগাছা উপজেলার ছুটিপুরে।

পড়াশোনা ও প্রাথমিক যাত্রা
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। প্রথম বর্ষে পড়াশোনা পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই কমে গিয়েছিল সিজিপিএ। তবে হাল না ছেড়ে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অনার্স শেষে নাহিদ ৩.৩০ এবং সোহেলী ৩.৫৬ সিজিপিএ অর্জন করেন। তৃতীয় বর্ষ থেকেই ক্লাসের পাশাপাশি গবেষণাগারে নিয়মিত সময় দেওয়া, গবেষণাপত্র পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নিয়মিত টিউশনি—এভাবেই কাটত তাদের দিন।

বিয়ের নেপথ্যে স্বপ্ন ও বড় ধাক্কা
বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল একসঙ্গে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া। ২০২৫ সালের মে-জুনের দিকে তারা যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্রাইটন-এ সেলফ-ফান্ডেড CAS-এর মাধ্যমে আবেদনের সিদ্ধান্ত নেন। একজন মূল আবেদনকারী এবং অন্যজন স্পাউস হিসেবে আবেদন করবেন—এই পরিকল্পনা থেকেই তড়িঘড়ি করে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

কিন্তু বিয়ের পরই জীবনে নেমে আসে কঠিন এক সময়। ব্রাইটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয় এবং কষ্টার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। যুক্তরাজ্যে যাওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলেও তারা একে অপরের হাত ছাড়েননি। যখন একজন ভেঙে পড়েছেন, অন্যজন মানসিকভাবে সাহস জুগিয়েছেন।

কঠিন লড়াই ও অবশেষে সাফল্য
২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে বিদেশে স্কলারশিপের প্রস্তুতি শুরু করেন তারা। একই বছরের অক্টোবরে আইইএলটিএস পরীক্ষা দেন। চলতি বছর নাহিদ চীনের মর্যাদাপূর্ণ CAS-ANSO স্কলারশিপ এবং থাইল্যান্ডের AIT-এ পিএইচডির জন্য আংশিক অর্থায়নের সুযোগ পান। অন্যদিকে সোহেলীও যুক্তরাষ্ট্রের University of Maine-এর একজন অধ্যাপকের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পান।

তবে তাদের স্বপ্ন ছিল একসঙ্গে থাকার। অবশেষে সেই সুযোগ এনে দেয় সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি। দুজনেরই আবেদন এবং সংশ্লিষ্ট অধ্যাপকের সম্মতি থাকায় চলতি বছরের ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে তারা কাঙ্ক্ষিত CSC ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপের চূড়ান্ত ফলাফল পান। অতীতের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতার কারণে ভিসা পাওয়ার আগ পর্যন্ত কাউকেই বিষয়টি জানাননি তারা। গত ২০ জুলাই ভিসা হাতে পাওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুখবরটি ভাগাভাগি করেন।

সাফল্যের খবর শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তাদের বাবা-মা। এই যৌথ অর্জনে দুই পরিবারেই বইছে আনন্দের বন্যা।

নিজেদের এই অর্জনের পেছনে শিক্ষকদের অবদানের কথা স্মরণ করে তারা জানান, বিএসসি থিসিস সুপারভাইজার ড. হাসিবুর রহমান এবং এমএসসি সুপারভাইজার ড. নাজনীন নাহার সবসময় তাদের অনুপ্রাণিত করেছেন। টিউশনি বা চাকরির কারণে প্রশাসনিক কাজ থমকে গেলে শিক্ষকরাই অভিভাবকের মতো পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করেছেন।

অনুজদের উদ্দেশ্যে পরামর্শ
ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে দেশের নীতিনির্ধারণে অবদান রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করে এই দম্পতি অনুজদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘নিজের সম্ভাবনা যতটুকুই হোক না কেন, চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে। দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই লক্ষ্য নির্ধারণ করে গবেষণাগারে সময় দেওয়া, গবেষণা প্রকাশনায় মনোযোগ দেওয়া, IELTS-এর প্রস্তুতি নেওয়া, প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যানভিত্তিক সফটওয়্যার (SPSS, Origin বা Python) শেখা এবং নিজের সিভি নিয়মিত হালনাগাদ রাখা জরুরি। আর সবচেয়ে বড় কথা, যেখানে নিজের কোনো লাভ বা দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ নেই, সেখানে সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে।’