০৫ জুলাই ২০২৬, ০০:০০

নোবিপ্রবির ট্রেজারার পদে আলোচনায় ৪ জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক

আলোচিত 8 অধ্যাপক   © টিডিসি ফটো

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ট্রেজারার (কোষাধ্যক্ষ) পদটি শূন্য হওয়ার পর কে হচ্ছেন পরবর্তী কোষাধ্যক্ষ, তা নিয়ে ক্যাম্পাস ও সংশ্লিষ্ট মহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। গত ৭ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. হানিফ মুরাদ লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদটি শূন্য হয়।

​সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, শূন্য পদটি পূরণে ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের নাম নিয়ে আলোচনা চলছে। নতুন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগের দৌড়ে এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষকের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।

​আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শিক্ষকেরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং মেরিন সাইন্স এন্ড ফিসারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার, বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ড. মো. মহিনুজ্জামান, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন এবং ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল কাইয়ুম মাসুদ এবং ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস (এমআইএস) বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জিয়াউল হক। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, আলোচিত এই শিক্ষকবৃন্দ প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন।

​অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সাথে তিনি নোবিপ্রবির বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের অন্যতম সংগঠন ‘সাদা দল'-এর সাধারণ সম্পাদক। শিক্ষক রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী এই অধ্যাপকের রয়েছে দীর্ঘ একাডেমিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা। ফ্যাসিবাদী আমলে বিভিন্ন সময় জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন, স্বীকার হয়েছিলেন নিপীড়ন ও বৈষম্যের। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিএনপিপন্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কেন্দ্রীয় সংগঠন ইউট্যাব (ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) এর শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে তার সুসম্পর্ক রয়েছে, যা তাকে এই পদের দৌড়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছে। 

এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আসলে এই ব্যাপারে তো সরকারই নির্ধারণ করবেন কে দায়িত্বে আসবেন। কয়েক মাস ধরে এটা নিয়ে আলোচনা চলছে কে আসবে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা আমার কাছে প্রধান অগ্রাধিকার এবং বর্তমান উপাচার্য মহোদয়ও আসলে শিক্ষার্থীদের বিষয়ে খুবই আন্তরিক। সরকার যদি আমাকে যোগ্য মনে করে দায়িত্ব প্রদান করে সেটা এখানে হোক কিংবা বাইরে তাহলে আমি সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাবো।’

​আলোচনায় রয়েছেন পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ড. মো. মহিনুজ্জামান। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। একজন ক্লিন ইমেজ বা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির গবেষক হিসেবে সুপরিচিত এই অধ্যাপক গবেষণায় অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ভালো ও মানসম্মত গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) থেকে একাধিকবার গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট (গবেষণা প্রকল্প) লাভ করেছেন। বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন-৩ নির্মাণসহ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এর আগেও একাধিক প্রকল্পের পিডি ছিলেন। এছাড়াও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে তার সুসম্পর্ক ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

আলোচনায় থাকার বিষয়ে অধ্যাপক ড. মো. মহিনুজ্জামান বলেন, ‘কে দায়িত্বে আসবে এটা সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের উপর নির্ভর করছে। আওয়ামী লীগের সময় আমাকে বিএনপিপন্থী হিসেবে একঘরে করে রাখা হতো, তত্ত্ববধায়কের সময় আমাকে জামাত ট্যাগ দেওয়া হয়েছে। এখন বলা হচ্ছে আমি নাকি নীলদলের সাথে যুক্ত ছিলাম। অথচ তাদের কোন সদস্য ফরম পর্যন্ত আমি পূরণ করি নাই।কিন্তু তারপরও আমাকে নিয়ে বিভিন্ন কিছু বলা হয়। এটা আসলেই খুবই দুঃখজনক। যাই হোক সরকার আমাকে যোগ্য মনে করে যদি দায়িত্ব দেয়, তাহলে আমি আমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ নিষ্ঠা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করবো এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও কিভাবে উঁচু অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যায় সে চেষ্টা করবো।’

ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের (বিজনেস ফ্যাকাল্টি) বর্তমান ডিন এবং সাদা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. আবদুল কাইয়ুম মাসুদ কোষাধ্যক্ষ পদের জন্য অন্যতম আলোচিত প্রার্থী। ট্রেজারার পদের মূল কাজ যেহেতু বাজেট প্রণয়ন ও আর্থিক খাত তদারকি করা, সেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত কারণেই আর্থিক খাতে তার বিশেষ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বড় নিয়ামক হতে পারে। এছাড়া গবেষক হিসেবেও অধ্যাপক ড. মাসুদের ভালো সুখ্যাতি আছে এবং বিভিন্ন সময় স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন গবেষণা অ্যাওয়ার্ড। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসিরের সঙ্গেও তার ভালো সখ্যতা রয়েছে।

অধ্যাপক ড. আবদুল কাইয়ুম মাসুদ বলেন, ‘বিভিন্ন দিক থেকে  বিভিন্নজন কতো কথা বলে! এটা যেহেতু সরকারি একটা সিদ্ধান্ত সেক্ষেত্রে আগে থেকে তো কিছু বলা যায় না। তবে সরকার দায়িত্ব প্রদান করলে সেক্ষেত্রে আমি আমার সর্বোচ্চটুকু বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে কাজ করে যাবো।’

এছাড়াও আলোচনার দৌড়ে রয়েছেন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস (এমআইএস) বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জিয়াউল হক। ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের (বিজনেস ফ্যাকাল্টি) একজন দক্ষ শিক্ষক হিসেবে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাতে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বিশেষ জানাশোনা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ও আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষায় তার এই প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ট্রেজারার পদে নিজের নাম আলোচিত হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. মো. জিয়াউল হক জানান, ‘এই পদের জন্য আমার নাম আলোচনায় আছে শুনে ভালো লাগলো। তবে এই পদের জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে কারও কাছে কোনো তদবির বা লবিং করি নাই। সরকার যদি আমার ওপর আস্থা রেখে এই দায়িত্ব দেয়, তবে তা আমি সততা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করতে প্রস্তুত আছি।’

​বিশ্ববিদ্যালয় ও মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত এই চার জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের নাম সব মহলে জোরালোভাবে উচ্চারিত হলেও, শেষ মুহূর্তে এই পদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় কোনো চমক বা ভিন্ন কারো নাম আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রশাসনের শীর্ষ মহলে জোর আলোচনা চলছে চতুর্মুখী এই প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়ে সরকার কি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনো মুখকে এই গুরুদায়িত্বে নিয়ে আসবে? নাকি আলোচিত এই তিন প্রার্থীর মধ্য থেকেই যোগ্যতার ভিত্তিতে কাউকে বেছে নেওয়া হবে তা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট মহলে নানামুখী সমীকরণ চলছে।

​বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক শৃঙ্খলা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুষম তদারকি এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একজন দূরদর্শী, যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে এই পদে দেখতে চান তারা।

​নতুন ট্রেজারার নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ট্রেজারার পদের নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ চ্যান্সেলর (মহামান্য রাষ্ট্রপতি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারাধীন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক স্থবিরতা কাটাতে এবং একাডেমিক-প্রশাসনিক সমন্বয় গতিশীল করতে এই পদে যোগ্য কাউকে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।