২৮ জুন ২০২৬, ১৭:১৫

কোনটি হেলে পড়েছে, কোনটিতে ফাটল—শাবিপ্রবিতে উন্নয়নের আড়ালে ধস

নতুন সামাজিক বিজ্ঞান ভবন, প্রথম ছাত্রী হল ও ইউসি ভবনে ফাটলের দৃশ্য  © টিডিসি

উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণ হলেও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে একের পর এক ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে চলমান নির্মাণকাজের মান নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। সম্প্রতি সামাজিক বিজ্ঞান ভবন, ইউনিভার্সিটি সেন্টার (ইউসি ভবন) ও আয়েশা সিদ্দিকা হলের বিভিন্ন অংশে ফাটল ও কাঠামোগত দুর্বলতার চিহ্ন দেখা যাওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

২৩ কোটি টাকার ভবনে ফাটল
ক্যাম্পাসের ‘ডি’ বিল্ডিং-সংলগ্ন পাঁচতলাবিশিষ্ট সামাজিক বিজ্ঞান ভবনটিতে নিয়মিত পাঠদান চলছে। প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থী যাতায়াত করেন এই ভবনে। বাইরে থেকে আকর্ষণীয় দেখালেও ভেতরে সিঁড়ি ও দেয়ালজুড়ে ছোট-বড় ফাটল। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৭ সালে একনেকে অনুমোদিত শাবিপ্রবি অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-১-এর আওতায় ভবনটি নির্মাণ করা হয়। এর ব্যয় ছিল ২৩ কোটি ২৯ লাখ টাকা। ২০২০ সালের ১১ মার্চ কাজ শুরু হয়ে ২০২৪ সালের ৩০ জুন ভবনটির কাজ শেষ হয়। কাজ শেষ হওয়ার পরপরই ভবনজুড়ে ফাটল দেখা দিতে শুরু করে বলে জানিয়েছেন এই ভবনের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিভাগ। এরপর এ বছরের শুরুর দিকে ভূমিকম্প হলে পুরো ভবনে বিশাল ফাটল ধরে। পরবর্তী সময়ে সিমেন্টের প্রলেপ দিয়ে ফাটল ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ব্যবহারিক না শিখেই এইচএসসি পরীক্ষায় বসবেন শিক্ষার্থীরা!

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নির্মাণকজে দুর্নীতি এবং নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করার কারণেই এমনটা হয়েছে। এমনকি আগামী দিনে সামান্য মাত্রায় ভূমিকম্প হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলেও দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে ভবনটিতে সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজকর্ম ও পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের কার্যক্রম চলছে।

হেলে পড়েছে ইউসি ভবন, দেয়ালে গভীর ফাটল
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি সেন্টার (ইউসি ভবন) উদ্বোধনের ১২ বছর না যেতেই একাধিক ফাটল দেখা দেয়। বর্তমানে ভবনটি দৃশ্যমানভাবে পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। জানা গেছে, ২০১১ সালের ১১ এপ্রিল ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০১২ সালের ৮ আগস্ট শেষ হয়। প্রায় ৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত দ্বিতল ভবনটি মূল পরিকল্পনায় চারতলা হওয়ার কথা থাকলেও পরে ঝুঁকি বিবেচনায় তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। সরেজমিনে ভবনের দেয়াল ও পিলারে লম্বা তির্যক ফাটল দেখা গেছে। দোতলার মেঝের একটি অংশ একদিকে দেবে গেছে। এমনকি ভবনটি নির্মাণ করার সময় কাজের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা। তবে এ বিষয়ে কর্ণপাত করেনি সংশ্লিষ্টরা। এমনকি প্রকৌশল দপ্তর থেকে ভবনটি ভেঙে ফেলার সুপারিশ করা হলেও চলছে নিয়মিত কার্যক্রম। 

ভবনটিতে প্রক্টর কার্যালয়, ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালকের কার্যালয়, ডে-কেয়ার সেন্টার বিভিন্ন সাংগঠনিক কক্ষ এবং সোনালী ব্যাংকের শাখা রয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর যাতায়াত থাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

 আয়েশা সিদ্দিকা হলে ফাটল, শিক্ষার্থীদের স্থানান্তর
এদিকে ছাত্রীদের আবাসিক আয়েশা সিদ্দিকা হলের ‘সি’ ব্লকে ফাটল দেখা দেওয়ায় ঝুঁকি এড়াতে কয়েকটি কক্ষ থেকে ৩৪ জন শিক্ষার্থীকে স্থানান্তর করেছে হল কর্তৃপক্ষ। গত ২৪ জুন ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট ড. ফাহমিদা আখতার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ৩২২ থেকে ৩২৫ এবং ৪২২ থেকে ৪২৬ নম্বর কক্ষের ছাত্রীদের গেস্টরুম, লন্ড্রিরুম ও ডি ব্লকের রিডিং রুমে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল নয়, স্থগিত: জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী

হলের শিক্ষার্থীরা জানান, আগে থেকেই বিভিন্ন কক্ষে ফাটল ছিল। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর ফাটল আরও বড় হয়েছে এবং কোথাও কোথাও দেয়ালের অংশ দেবে গেছে। এ ছাড়া ‘ডি’ বিল্ডিংসহ কয়েকটি শিক্ষা ভবন, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ভবন ও কয়েকটি দপ্তরেও ফাটল দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা কাজের গুণগতমান এবং নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বাদ যায়নি গৌরবের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারও
দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু এবং দৃষ্টিনন্দন শাবিপ্রবির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। ২০০১ সালে ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্মারকটির গায়েও লেগেছে অবহেলার দাগ। শহীদ মিনারের প্রথম বেদির দুটি দেয়াল, দ্বিতীয় বেদির ৪টি দেয়াল এবং মূল বেদির সামনের ও পেছনের দেয়ালসহ মূল ফ্লোরে বড় বড় ফাটল ধরেছে। এমনকি মূল বেদির পেছনের অংশটি এখন পশ্চিম দিকে ঝুঁকে পড়েছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে।

চলমান ১২০০ কোটির নির্মাণকাজে বাড়ছে উদ্বেগ
শাবিপ্রবিতে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭টি বড় প্রজেক্টের কাজ চলমান। যখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত চেহারা বদলে যাওয়ার কথা, ঠিক তখনই নতুন-পুরোনো ভবনের এই ধাবমান ফাটল ও হেলে পড়ার চিত্র পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, চলমান নির্মাণকাজে মাটি মিশ্রিত বালি, পাথর এবং নিম্নমানের সিমেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে নড়বড়ে উন্নয়ন হচ্ছে। শুরুতে এসব কাজের গুণগত মান তদারকির জন্য শাবিপ্রবির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের কয়েকজনকে যুক্ত করা হলেও হঠাৎ অদৃশ্য ইশারায় তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে কাজের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিয়ে আরও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে শাবিপ্রবির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষক অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম বলেন, ‘উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়নের জন্য ডিজাইন, নিয়মিত সুপারভিশন এবং ভালো মালামাল ব্যবহার করা প্রয়োজন যেটা শাবিপ্রবির ক্ষেত্রে হয়নি। এমনকি ইউসি ভবনের ডিজাইনে যা ছিল পরবর্তীতে সেটার অস্তিত্ব খুঁজে পাইনি এবং মেয়েদের হলের ডিজাইন করাই ঠিক হয়নি যেটা আমরা আগেই বলেছিলাম। যেভাবে করার কথা ছিল সেভাবে করা হয়নি।’

আরও পড়ুন: ছাত্রদল নেতার অনুসারী অবৈধভাবে হলে, প্রতিবাদ করায় ছাত্রশক্তির দুই নেতাকে মারধর

নতুন ১৭ প্রজেক্টের চলমান কাজের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে নির্মাণ কাজে যেসব ব্র্যান্ডের সিমেন্ট এবং রড ব্যবহার করা হচ্ছে, তা কোনো দিন নামই শুনিনি। আমরা এর আগের প্রশাসনকে উদ্বেগ জানিয়ে চিঠিও দিয়েছি। সিন্ডিকেটেও কথা বলেছি, কিন্তু কেউ কর্ণপাত করছেন না। আমরা বড় ধরনের আশঙ্কা করছি এসব ভবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে।’

এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল আহমদ চৌধুরীকে একাধিকবার কল দিয়েও পাওয়া যায়নি।

এদিকে গত ২৩ মে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম। নিয়োগের পরপরই তিনি উন্নয়নকাজের বিভিন্ন দিক পরিদর্শন করে দেখেন। এ বিষয়ে উপাচার্য  বলেন, ‘আমি দায়িত্ব পেয়েছি এক মাস হলো। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা ভালো বলতে পারবেন। এ রকম কেন হচ্ছে আমরা দেখব। তবে মেয়েদের হলের সমস্যা সমাধান করার জন্য একটা কমিটি করে দিয়েছি। তারা একটা ভালো সমাধান দিতে পারবে বলে আশা করছি।’