২০ জুন ২০২৬, ১৫:৫৭

হল শুধু থাকার জায়গা নয়, এটি সংগ্রাম-স্বপ্ন আর আত্মনির্ভরতার পাঠশালা

হলে ক্রিকেট খেলছেন শিক্ষার্থীরা  © টিডিসি

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল শুধু শিক্ষার্থীদের থাকার জায়গা নয়, এটি সংগ্রাম, স্বপ্ন, বন্ধুত্ব, দায়িত্ববোধ ও আত্মনির্ভরতার এক জীবন্ত পাঠশালা। পরিবার থেকে দূরে থেকে প্রতিদিনের ক্লাস, পরীক্ষা, অর্থনৈতিক চাপ, অসুস্থতা ও নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে করতেই শিক্ষার্থীরা গড়ে তোলে নিজেদের নতুন পরিচয়। আর সেই পথচলায় হল জীবন হয়ে ওঠে আনন্দ-বেদনা, অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির এক অনন্য অধ্যায়।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) শত শত শিক্ষার্থী পরিবার থেকে দূরে আবাসিক হলগুলোয় বসবাস করছেন। প্রতিদিনের ব্যস্ত ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, সাংগঠনিক কার্যক্রম ও ব্যক্তিগত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদের দিন কাটে। বাইরে থেকে হল জীবনকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে অনেক অজানা গল্প।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম ফজিলাতুন্নেছা জোহা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তায়্যিবা রহমান বলেন, ‘সকালে ক্লাস থাকলে অনেক সময় অ্যালার্মের সঙ্গে যুদ্ধ করেই দিন শুরু হয়। বাসায় থাকলে মা কয়েকবার ডেকে দিতেন, নাস্তা তৈরি থাকত। হলে ঘুম থেকে উঠে নিজেকেই সব গুছিয়ে ক্লাসে দৌড়াতে হয়। অনেক সময় নাস্তা করার সুযোগও হয়ে ওঠে না। আর হলের খাবার এই নিয়ে বাড়তি বলতে গেলেই চোখের পানি আর নাকের পানি একাকার হয়ে যায়। খাবারের একেক দিন একেক স্বাদ, পরিমাণ, অনেক সময় এমন অনেক কিছু হাসি মুখে তুলে নিতে হচ্ছে, যেটা একসময় বাসা বাড়িতে সে খেতো না। এখন ৩০ টাকার এই মিলই যেন শিক্ষার্থীদের একমাত্র ভরসা। অপর দিকে বাইরে খাবারের যে আকাশছোঁয়া দাম, যা অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষেই বহন করা সম্ভব নয়।’

সকাল গড়িয়ে দুপুর। ক্লাস, ল্যাব, অ্যাসাইনমেন্ট আর বিভাগের নানা ব্যস্ততায় সময় পার হয়ে যায়। কেউ লাইব্রেরিতে, কেউ গবেষণাগারে, আবার কেউ ক্যাম্পাসের ছায়াঘেরা কোনো কোণে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় কিংবা পরবর্তী ক্লাসের অপেক্ষায়।

আরও পড়ুন: এনটিআরসিএ শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে, এটা আইনের কোথাও নেই

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হলের শিক্ষার্থী নুসরাত বৃষ্টি বলেন, ‘অনেকের মতো আমিও টিউশনি করি। দুপুরে ক্লাস শেষ করে একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ আর থাকে না। বিকেলে টিউশনে যেতে হয়। এ পর্যায়ে এসে পরিবারের কাছে টাকা চাইতে ভালো লাগে না। তাই নিজের খরচের একটা অংশ নিজেই চালানোর চেষ্টা করি।’

শুধু টিউশন নয়, অনেক শিক্ষার্থীই বিভিন্ন সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক চর্চা কিংবা ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গেও যুক্ত। ফলে ক্লাসের বাইরেও তাদের ব্যস্ততা কম নয়। বিকেল নামলে হলের করিডরে কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। কেউ খেলাধুলা করতে যায়, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়, আবার কেউ ক্লান্ত শরীর নিয়ে রুমে ফিরে আসে।

শহীদ আবরার ফাহাদ হলের শিক্ষার্থী আবু সুফিয়ান বলেন, ‘দিনের সবচেয়ে ভালো সময় মনে হয় বিকেলটা। ক্লাসের চাপ একটু কমে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে মধু খালার দোকানে চা খেতে খেতে গল্প করা, ক্যাম্পাসে হাঁটা—এসব মুহূর্ত মানসিক চাপ খানিকটা কমিয়ে দেয়।’

সন্ধ্যার পর শুরু হয় আরেক ব্যস্ততা। কেউ পড়ার টেবিলে বসে, কেউ ল্যাপটপ খুলে অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করার চেষ্টা করে। আবার অনেকেই অনলাইন ক্লাস, ফ্রিল্যান্সিং বা চাকরির প্রস্তুতিতে সময় দেন।

জননেতা আব্দুল মান্নান হলের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলামের ভাষায়, ‘বাসায় থাকলে সন্ধ্যায় পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে গল্প করতাম। হলে সেই পরিবেশটা নেই। তবে মাঝেমধ্যে সময় পেলে রুমমেটদের সঙ্গে গল্প করতে করতে কখন যে রাত হয়ে যায়, বুঝতেই পারি না।’

আরও পড়ুন: আগামী দিনে টেক্সটাইল খাতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে বুটেক্স: শিক্ষামন্ত্রী

হল জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রায় সবাই অসুস্থতার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। আলেমা খাতুন ভাসানী হলের শিক্ষার্থী আমেনা আক্তার বলেন, ‘অসুস্থ হলে সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারি হল জীবন বনাম পরিবারের মূল্য। বাসায় থাকলে মা হয়তো মাথায় পানি দিতেন, পছন্দের খাবার রান্না করতেন। হলে জ্বর নিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকলে মাঝে মাঝে খুব একা লাগে। তখন বন্ধুদের সাহায্যই সবচেয়ে বড় ভরসা।’

জননেতা আব্দুল মান্নান হলের আরেক শিক্ষার্থী নাজমুস সাকিব বলেন, ‘রাত ১২টার পর হঠাৎ চা খেতে বের হওয়া, পরীক্ষা সামনে রেখে সবাই মিলে পড়া, মাসের শেষ দিকে টাকা বাঁচাতে একসঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করে খাওয়া—এসবই হল জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি। পরিবারের বাইরে আরেকটা পরিবার পাওয়া যায় এখানে।’

রাত গভীর হলে ক্যাম্পাস অনেকটাই নীরব হয়ে যায়। কিন্তু অনেক হলের কক্ষেই তখনো আলো জ্বলতে দেখা যায়। কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ গবেষণার কাজ করছেন, আবার কেউ ভবিষ্যতের চাকরির স্বপ্ন নিয়ে বইয়ের পাতায় ডুবে আছেন।

শহীদ জিয়াউর রহমান হলের শিক্ষার্থী রায়হান আহমেদ বলেন, ‘হল জীবন আমাকে আত্মনির্ভর হতে শিখিয়েছে। কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে অর্থ ব্যবস্থাপনা, সময়ের মূল্য বোঝা—সবকিছুই এখানে শিখেছি। কষ্ট আছে, কিন্তু এই কষ্টই মানুষকে শক্ত করে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো শুধু শিক্ষার্থীদের থাকার জায়গা নয়; এটি সংগ্রাম, স্বপ্ন, বন্ধুত্ব, দায়িত্ববোধ এবং আত্মনির্ভরতার এক অনন্য পাঠশালা। এখানে যেমন জ্বরের রাতে মায়ের অভাব অনুভূত হয়, তেমনি রাতজাগা আড্ডায় বন্ধুদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় আরেকটি পরিবার। আর এভাবেই প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত মিলিয়ে তৈরি হয় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিগুলো।