১৮ জুন ২০২৬, ১৫:০২

নোবিপ্রবির মেগা প্রকল্প: সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কাজ হওয়া নিয়ে ধোঁয়াশা

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়  © টিডিসি সম্পাদিত

​নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) অ্যাকাডেমিক ভবন-৩ এর অবশিষ্ট অংশ নির্মাণসহ ৩৩৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকার মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ সরাসরি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত এক নির্দেশনায় প্রকল্পের নির্মাণকাজ উন্মুক্ত দরপত্র (ওপেন টেন্ডার) পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোরালো দাবি সত্ত্বেও সেনাবাহিনীর কাছে সরাসরি এই কাজ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

​বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অ্যাকাডেমিক অবকাঠামো উন্নয়ন ও সার্বিক ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের লক্ষ্যে অনুমোদিত এই মেগা প্রকল্পের আওতায় অ্যাকাডেমিক ভবন-৩ এর অসম্পূর্ণ অংশের নির্মাণকাজও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক নির্দেশনার কারণে এখন নিয়মতান্ত্রিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচন করে এ কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে।

​এর আগে প্রকল্পের কাজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের দাবিতে সোচ্চার হন নোবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিন ধরে অ্যাকাডেমিক ভবন-৩ এর নির্মাণকাজ ঝুলে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি প্রদানসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক প্রচার চালায়। এ বিষয়ে নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির উদ্যোগে পরিচালিত দুই দিনব্যাপী এক অনলাইন জরিপে শিক্ষার্থীদের মতামতের স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ২ হাজার ৭৭৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশই প্রকল্পের কাজ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়নের পক্ষে মত দেন।

​শিক্ষার্থীদের মতে, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা থাকে এবং নির্মাণকাজের গুণগত মানও বজায় থাকে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান আবাসন ও ক্লাসরুম সংকটের কারণে অ্যাকাডেমিক ভবন-৩ দ্রুত সম্পন্ন হওয়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

​তবে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি বিবেচনার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে আইনি কাঠামোর কারণে। নোবিপ্রবি পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস (ডিপিডি) দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়নের মূলত দুটি পদ্ধতি রয়েছে— সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) অথবা উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম)। এই মেগা প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপিতে স্পষ্টভাবেই 'উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি'র কথা উল্লেখ থাকায় সরাসরি সেনাবাহিনীকে কাজ দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই।

​বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রকল্পের জন্য একটি যোগ্য পরামর্শক (কনসালট্যান্ট) প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, যেখানে ৯টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করে আবেদন জমা দিয়েছে। তবে এই তালিকায় সেনাবাহিনী বা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নেই। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত হওয়ার পর মূল নির্মাণকাজের জন্য উন্মুক্ত টেন্ডার আহ্বান করা হবে। এমতাবস্থায়, সেনাবাহিনীর কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কাজটিতে অংশ নিতে চায়, তবে তাদেরও প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই লড়তে হবে।

​এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান বলেন, ‘অনুমোদিত ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) নির্মাণকাজ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেখানে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি কাজ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। আমরা শুরু থেকেই একটি সরকারি বা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজটি বাস্তবায়নের বিষয়ে আগ্রহী ছিলাম, কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের জানানো হয়েছে যে বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী তা সম্ভব নয়।’

​তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা মাননীয় উপাচার্য মহোদয়সহ পুনরায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করব। বিকল্প কোনো আইনি পথ বা বিশেষ বিবেচনা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। কারণ সরকারি বা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করানো গেলে তা দ্রুত ও মানসম্মতভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হতো।’

​তবে টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে আশ্বস্ত করে পিডি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত যে প্রতিষ্ঠানই কাজ পাক না কেন, আমাদের মূল লক্ষ্য থাকবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ গুণগত মান বজায় রেখে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা। আমরা চলতি মাসেই দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা করেছি এবং আমাদের টেকনিক্যাল টিম প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে।’

আরও পড়ুন : সামরিক জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার গুরুত্ব অপরিসীম: সেনাপ্রধান

​সার্বিক বিষয়ে নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, ‘এ মুহূর্তে কে টেন্ডার পাবে বা কে কাজ করবে, সে বিষয়ে কোনো আগাম সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। নতুন অর্থবছর থেকে এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হবে।’

​উল্লেখ্য, গত বছরের ১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় নোবিপ্রবির অসম্পূর্ণ অ্যাকাডেমিক ভবন-৩ সম্পন্নকরণসহ সামগ্রিক ক্যাম্পাস উন্নয়নে ৩৩৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকার এই মেগা প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।