ঈদের ছুটিতে ঘরমুখো পবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের আনন্দ-অনুভূতির গল্প
ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি ও পারিবারিক বন্ধনের অনন্য বার্তা নিয়ে আবারও এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা। দীর্ঘ অ্যাকাডেমিক ব্যস্ততা, ক্লাস-পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট আর ক্যাম্পাস জীবনের ক্লান্তি পেরিয়ে ঘরে ফেরার আনন্দে এখন মুখর পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ঈদ মানেই পরিবারের কাছে ফেরা, মায়ের হাতের রান্না, শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর কিছুটা মানসিক প্রশান্তি— এমন অনুভূতিই উঠে এসেছে শিক্ষার্থীদের কথায়।
ঈদকে ঘিরে পবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের নানা অনুভূতি, প্রত্যাশা ও ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে আমাদের এই আয়োজনে— ‘পবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা’।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর থেকেই ঈদ মানে অনেকদিন পর পরিবারের কাছে ফেরা, মায়ের হাতের রান্না, ছোটোবেলার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা আর কিছুটা স্বস্তির সময় কাটানো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত সিডিউলের মাঝে এই সময়টার জন্য সবাই অপেক্ষায় থাকে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর মতো ঈদকে ঘিরে পরিবার ও প্রিয় মানুষদের সঙ্গে কিছু সুন্দর সময় কাটানোর ক্ষেত্রে আমিও ব্যতিক্রম নই।
তবে এবার ঈদের ছুটিতেও একটা খারাপ লাগা কাজ করছে। আমাদের চিরচেনা ক্যাম্পাস তার গতি হারিয়েছে। ক্যাম্পাসে সেই স্বাভাবিক পরিবেশ কিংবা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগের উচ্ছ্বাস অনেকটাই কমে গেছে। ক্যাম্পাসে শিক্ষক রাজনীতির বলি হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। তাদের অ্যাকাডেমিক জীবনে এখন সেশনজটের ঘনঘটা। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বিষয়টা সত্যিই হতাশাজনক। শিক্ষকরা আদৌ ব্যাপারটা নিয়ে ভাবেন কিনা, শিক্ষার্থী হিসেবে আমি সন্দিহান।
আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও গবেষণার পরিবেশ আরও ভালো হোক। শিক্ষকদের রাজনৈতিক ব্যস্ততার চেয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। একইসঙ্গে শিক্ষকরা যেন রাজনীতির বাইরে এসে শিক্ষার্থীদের শুধু শিক্ষার্থী হিসেবেই দেখেন, সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করেন— এই প্রত্যাশাও থাকবে।
আশা করি, ঈদের পর আবারও আমাদের ক্যাম্পাস স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। ত্যাগ ও কুরবানির শিক্ষায় সবাই হৃদয়ের সব কালিমা কুরবানি দিয়ে নতুন উদ্যমে ক্যাম্পাসে ফিরতে পারে— এটাই কামনা। সবাই পরিবারের সঙ্গে ভালো সময় কাটান, নিরাপদে থাকুন। ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত হোক আমাদের জীবন।
আব্দুল্লাহ মুহসিন তানজিম, শিক্ষার্থী ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ
ঈদুল আজহা যেন আত্মত্যাগের এক চিরন্তন শিক্ষা
ঈদুল আজহা ইসলামী সংস্কৃতির এক মহান উৎসব এবং আত্মত্যাগের এক চিরন্তন শিক্ষা বহন করে এই দিনটি। হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের স্মরণে প্রতিবছর মুসলিমরা এই ঈদ উদযাপন করে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেকেই পড়াশোনার জন্য প্রিয়জন থেকে দূরে অবস্থান করে। লেকের পাড়ে আড্ডা, চায়ের কাপের ধোঁয়া আর অ্যাসাইনমেন্টের ডেডলাইন—এই নিয়েই কেটে যায় ক্যাম্পাসের দিনগুলো। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন আমাদের স্বাবলম্বী হতে শেখায় সত্যি, কিন্তু উৎসবের দিনগুলো ঘনিয়ে আসলেই মনটা আর ক্যাম্পাসের চার দেয়ালে আটকে থাকতে চায় না। তখন পিছুটান কেবলই এক টুকরো চেনা আঙিনা আর প্রিয়জনদের সান্নিধ্য। ঈদুল আজহা আমাদের জন্য পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর, মা-বাবার সান্নিধ্যে কিছুটা প্রশান্তি খোঁজার সুযোগ করে দেয়।
ঈদুল আজহা মানে কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি আত্মত্যাগ, সহানুভূতি, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পরিবারকে ফিরে পাওয়ার এক মূল্যবান উপলক্ষ।
ঈদুল আজহা আসে প্রতি বছর আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তুলতে। এই উৎসবের শিক্ষা কেবল ঈদের ওই কয়েকটা দিনের জন্য নয়, বরং সারা বছরের পথচলার এক পাথেয়।
আমরা যদি সত্যিই এই উৎসবের মর্তবাকে ধারণ করতে পারি, তবে আমাদের সমাজ থেকে হিংসা, অনৈক্য আর বৈষম্য দূর হবে। আসুন, শুধু পশু নয়, কোরবানি করি নিজেদের অহংকার। উৎসবের এই আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি মন, প্রতিটি পরিবার এবং আমাদের পুরো সমাজ।
মো. ফারহান সাদিক, অ্যানিমেল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ
পবিত্র ঈদুল আজহা মানেই ত্যাগ, ভালোবাসা ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য শিক্ষা
প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদের ছুটি ঘিরে সবার মাঝে বইছে ঘরে ফেরার আনন্দ। পরিবার, প্রিয়জন ও শেকড়ের টানে সবাই ফিরছে আপন ঠিকানায়।
আমার কাছে ঈদুল আজহা শুধু পশু কুরবানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি নিজের ভেতরের রাগ, হিংসা, অহংকার ও সব খারাপ দিককে ত্যাগ করার শিক্ষা দেয়। এই উৎসব আমাদের মানুষ ও প্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায়। আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই— হিসেবে আমরা আশরাফুল মাখলুকাত। তাই কুরবানির সময় প্রাণীদের প্রতি সদয় আচরণ করা, তাদের অযথা কষ্ট না দেওয়া এবং যথাযথ যত্ন নেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। শুধু কুরবানির পশুই নয়, রাস্তার কুকুর, বিড়ালসহ সকল প্রাণীর প্রতিও আমাদের সহৃদয় হওয়া উচিত। অযথা আঘাত করা বা প্রাণীদের কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা মানবিকতারই অংশ। সর্বোপরি, মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা— এই পবিত্র ত্যাগের মাধ্যমে তিনি যেন আমাদের অন্তরের পশুত্ব, হিংসা ও অহংকার দূর করে মানবিক, সহনশীল ও সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। সবাইকে পবিত্র ঈদুল আজহার আন্তরিক শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।
মাসুদা আক্তার রিফা, অ্যানিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ
ঈদ, আনন্দ ও আত্মশুদ্ধি
ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির মহান শিক্ষা নিয়ে প্রতি বছর আমাদের মাঝে আসে পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা হলো আত্মত্যাগের মাধ্যমে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা এবং সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ করা। কোরবানির মাধ্যমে মানুষ শুধু পশু নয়, নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ ও স্বার্থপরতাকেও ত্যাগ করার শিক্ষা লাভ করে। শুধু পবিপ্রবি নয়, বরং দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছেই এই ঈদ আনন্দ, পারিবারিক বন্ধন ও মানবিকতার এক অনন্য উপলক্ষ্য। কেননা, ঈদ মানে শুধু বাড়ি ফেরা নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে উৎসবে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আত্মিক প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া, যা ব্যস্ত অ্যাকাডেমিক জীবনের অস্থিরতা ভুলিয়ে সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। এই পবিত্র উৎসব আমাদের ধৈর্য, সহমর্মিতা ও মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা দেয়। ঈদের ছুটি শিক্ষার্থীদের আবারও পরিবার ও প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে ফিরিয়ে আনে, গড়ে তোলে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন। ত্যাগ, মানবতা ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিক পবিত্র ঈদুল আজহা।
মেহেরুন্নেছা লাবনী, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ
দূরত্বের গ্লানি ভুলে ঈদের ছুটি আমাদের কাছে এক স্বর্গীয় সুখ
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন আমাদের অবাধ স্বাধীনতা দিলেও, ব্যস্ততার ভিড়ে সবচেয়ে বেশি অভাব বোধ হয় পরিবারের। ক্লাস, পরীক্ষা আর টিউশনির যান্ত্রিক জীবনে মন খারাপ হলেও চাইলেই বাড়ির পানে ছুটে যাওয়া যায় না। এই দীর্ঘ দূরত্ব আর ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিক অচলাবস্থার মানসিক চাপ সাময়িকভাবে দূর হয়ে যায়, যখন মায়ের কোল আর বাবার হাসিমুখের কথা মনে পড়ে। সব ক্লান্তি উপেক্ষা করে দিনশেষে তাই আমরা ফিরে আসি চেনা শেকড়ে। পরিবারকে কাছে পাওয়া, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আবার সেই চিরচেনা গরুর হাটে যাওয়ার আনন্দ— সব মিলিয়ে শুরু হয় এক বাঁধভাঙা উৎসব। আসলে ঈদুল আজহা কেবল ত্যাগের উৎসব নয়, এটি নিজের ভেতরের সংকীর্ণতাকে বিসর্জন দেওয়ার এক অনন্য আত্মশুদ্ধি। এবারের ঈদ সবার মাঝে সাম্য ও সম্প্রীতির বার্তা বয়ে আনুক, এটাই প্রত্যাশা।
মাহফুজুর রহমান মিশু, অ্যানিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ
শিকড়পানে ফেরা : যান্ত্রিক ক্যাম্পাস থেকে ত্যাগের উৎসব
পরিবারের মায়া ছেড়ে বের হওয়া সন্তানেরা চাইলেও সহজে আর ফিরে যেতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু করার পর আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছি, সেখানে সবকিছুর মাঝেও অভাব শুধু পরিবারের। সারাদিনের ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, মিড, সেমিস্টার, সংগঠন, আড্ডা, টিউশনির ভিড়ে পরিবারের কথা মনে পড়লেও বেশিক্ষণ মন খারাপ নিয়ে থাকা যায় না। চাইলেই ছুটে যেতে পারি না পরিবারের কাছে। এই দূরত্ব কাটাতে ঈদের ছুটি আমাদের জন্য এক স্বর্গীয় সুখ। সকল ব্যস্ততা উপেক্ষা করে আমরা ফিরে আসি পরিবারের কাছে। পরিবারকে কাছে পাওয়া, তাদের ভালোবাসা, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়া— সব যেন স্বপ্নের মতো সুন্দর। শুরু হয় বাঁধভাঙা উৎসব।
ঈদুল আজহা কেবল পশু কোরবানির উৎসব নয়, এটি নিজের অহংকার ও সংকীর্ণতাকে বিসর্জন দেওয়ার এক অনন্য শুদ্ধাচার। ক্যাম্পাসের শিক্ষা আমাদের মস্তিষ্ককে শানিত করলেও, ত্যাগের এই উৎসব হৃদয়কে করে তোলে প্রশস্ত। সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অটুট হোক এবারের ঈদে।
শুভ রায় চৌধুরী, আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ