১৭ মে ২০২৬, ১৭:২৭

জবির পর ডুয়েট—নিজ ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষার্থীদের ভিসি নিয়োগের দাবি, নেপথ্যে কী?

জবির পর ডুয়েট— নিজ ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষার্থীদের ভিসি নিয়োগের দাবি, নেপথ্যে কী?  © প্রতীকী ছবি

নিজ ক্যাম্পাস থেকে উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগের দাবি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাদের নিয়োগ করা বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চাপের মুখে পদত্যাগ করেছিলেন। তখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও (জবি) উপাচার্য পদত্যাগ করেছিলেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র-শিক্ষকদের পক্ষ থেকে দাবি উঠছিল, পরবর্তী ভিসি যেন নিজ ক্যাম্পাস থেকে নিযুক্ত হন। সেসময় শিক্ষার্থীরা মাঠেও নেমেছিল। পরে প্রথমবারের মতো নিজ ক্যাম্পাস থেকে জবি উপাচার্য নিযুক্ত করা হয়েছিল অধ্যাপক ড. রেজাউল করিমকে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতা নেওয়ার পর কয়েক দফায় জবিসহ ২০টিরও বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জবিতে ফের টানা দ্বিতীয়বারের মতো নিজ ক্যাম্পাস থেকে নিয়োগ দেওয়া হয় নতুন ভিসি অধ্যাপক ড. রইছ্ উদ্দিনকে।

এদিকে, গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ (ডুয়েট) একসঙ্গে ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই ডুয়েটে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনে নামেন। চলমান আন্দোলন আজ রবিবার (১৭ মে) সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

ডুয়েটের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত উপাচার্যকে অব্যাহতি দেওয়া নিয়ে তাদের কোনো বিরোধ ছিল না। কিন্তু তাদের চাওয়া ছিল ডুয়েটের উপাচার্য হবেন ডুয়েটের কর্মরত কোনো শিক্ষক। তিনি যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হতে পারেন এবং তিনি যেকোন রাজনৈতিক মতাদর্শ লালন করতেও পারেন। 

কেন এই চাওয়া?
ডুয়েট বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে অন্যতম এবং বিশেষায়িত। ডুয়েটে শুধুমাত্র পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরাই কেবল উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায় ফলে ডুয়েটের একাডেমিক পরিবেশ দেশের অন্য সকল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছুটা আলাদা।

শিক্ষার্থীদের মতে, ডুয়েটের বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, অ্যাকাডেমিক কাঠামো এবং প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও ধারণা তুলনামূলক অনেক বেশি। ফলে ডুয়েটের সার্বিক উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ শিক্ষক থেকে উপাচার্য নিয়োগ করাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে। কোনো বহিরাগত ভিসি তারা মেনে নেবেন না। 

কারণ হিসেবে তারা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়ে শিক্ষার্থীদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে জুলাই অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন উপাচার্য বুয়েটের (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমানের পদত্যাগের পর ও শিক্ষার্থীরা ডুয়েটের অভ্যন্তরীণ কোনো শিক্ষকের মধ্য থেকে উপাচার্য নিয়োগের দাবি জানিয়েছিল। সেই দাবি অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ডুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনকে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছিল।

এবারও ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর যখন নতুন উপাচার্য নিয়োগের গুঞ্জন তৈরি হয় তখন থেকে শিক্ষার্থীরা দাবি জানিয়ে এসেছিলেন উপাচার্য যেন ডুয়েটের কোনো শিক্ষককেই নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়ে সম্প্রতি ক্যাম্পাসে কর্মসূচিও পালন করেছিলেন শিক্ষার্থীরা।

এদিকে, গত ১৪ মে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরপরই তা প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। ওই দিনের বিক্ষোভ মিছিল পরবর্তী বক্তব্যে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আমানুল্লাহ বলেন, আমরা চেয়েছি, আমাদের ডুয়েটে কর্মরত, রিগার্ডলেস অব ইচ এডুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড, তিনি যে ইনস্টিটিউট থেকে পড়ে আসুক, তিনি শাবিপ্রবি থেকে পড়ে আসুক। কিন্তু আমার ডুয়েটে কর্মরত কোন শিক্ষক হতে হবে, তাকে ডুয়েটকে ওউন করতে হবে। এর বাইরে আমরা কোনো ভিসি মানব না।

মূলত শিক্ষার্থীদের দাবি এটিই ছিল, কিন্তু শিক্ষার্থীদের দাবি পক্ষে বা বিপক্ষে ছাত্রদলের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য না পাওয়া গেলে ও ভিসিকে প্রত্যাখ্যান করে শুরু হওয়া আন্দোলনকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ‘মব’ বলে আখ্যায়িত করে এসেছিল। তাছাড়া ফেসবুকের বিভিন্ন নিউজের কমেন্টে তাদের হুমকি দিতে দেখা যাচ্ছিল।

গত শুক্রবার (১৫ মে) দুপুরের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে সড়ক অবরোধ করে এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবালকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করেন। এদিকে গতকাল শনিবার (১৬ মে) রাতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আজ শিক্ষার্থীরা নবনিযুক্ত উপাচার্যকে লাল কার্ড প্রদর্শন কর্মসূচিতে যোগ দিতে শহীদ মিনারে জড়ো হন। এর কিছু সময় পর বেলা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে নিয়ে ডুয়েট শাখা ছাত্রদল ও স্থানীয়  বিএনপি নেতাকর্মীরা মেইন গেইট ভেঙে ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে শুরু করে বেলা তিনটা পর্যন্ত থেমে থেমে সংঘর্ষ চলতে থাকে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, এ ঘটনায় সাংবাদিক সহ ১৮ জন আহত হয়েছেন। তাছাড়া সংবাদ সংগ্রহের সময় ডুয়েট সাংবাদিক সমিতির প্রতিনিধি জাকারিয়ার ফোন ছিনিয়ে নেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে প্রশাসন। গাজীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ডুয়েটে উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। আজ তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। এ ঘটনায় এখনো কেউ আহত হননি বলে জানান তিনি।