বুটেক্সের আবাসিক হলগুলোয় আয়োজিত হলো হল ফেস্ট-২০২৬
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) হলগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হলো বহুল প্রতীক্ষিত ‘হল ফেস্ট-২০২৬’। শুক্রবার (১৫ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের তিনটি আবাসিক হল—শহীদ আজিজ হল, জিএমএজি ওসমানী হল ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম হল এবং মেয়েদের বীর প্রতীক ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম হলে এই বর্ণিল আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। বিদায়ী ব্যাচকে সম্মাননা ও স্মরণীয় বিদায় জানাতে আয়োজিত এই উৎসব ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উচ্ছ্বাস, আনন্দ ও আবেগ।
মূলত চতুর্থ বর্ষের আবাসিক শিক্ষার্থীদের বিদায়ী সংবর্ধনার অংশ হিসেবে প্রতিবছর হলগুলোতে এই ফেস্ট আয়োজন করা হয়। এ উপলক্ষে পুরো হলজুড়ে নান্দনিক আলোকসজ্জা ও সাজসজ্জায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। দুইদিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে ছেলেদের হলে ফুটবল, ক্রিকেট এবং ইনডোর গেমসের অংশ হিসেবে ক্যারাম, দাবা, কার্ড, ই-ফুটবল ও ফিফাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। মেয়েদের হলে আয়োজন করা হয় দাবা, লুডুসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। তবে শিক্ষার্থীদের প্রধান আকর্ষণ ছিল বাহারি খাবারের আয়োজনের প্রতি।
প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণের জন্য আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইঞ্জি. মো. জুলহাস উদ্দিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, মাননীয় সংসদ সদস্য ও ‘মায়ের ডাক’-এর প্রধান সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি, আইটিইটির মহাপরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. এনায়েত হোসেনসহ আইটিইটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বুটেক্সের আবাসিক হলগুলোর প্রভোস্টরা।
হল ফেস্ট নিয়ে বীর প্রতীক ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম হলের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী অন্বেষা পাল বলেন, ‘হল ফেস্ট নিয়ে যত বলবো ততই কম হবে। প্রতিবার খুব এক্সাইটেড থাকি বাট এইবার মন খুব খারাপ। চলে যেতে হবে এই সুন্দর জায়গা থেকে। পেছনে ফিরে দেখলে অনেক স্মৃতি, অনেক সুন্দর মুহূর্ত।’
শহীদ আজিজ হলের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন, ‘হল ফেস্ট হলের বসবাসরত প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্যে এক অন্যরকম অনুভূতি। প্রতিবছরের মতো এবছরেও ৪৭তম ব্যাচের ভাইদের বিদায়বেলাতেও অনেক আড়ম্বরপূর্ণভাবে হল ফেস্ট আয়োজিত হতে দেখে খুবই ভালো লাগছে। পাশাপাশি ভাইদের বিদায়বেলায় নিজেও আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এটাই চাওয়া যে, এমন আয়োজন যাতে প্রতিবছর আরো বেশি আড়ম্বরতার সাথে পালিত হয় এবং এই ধারা যাতে অব্যাহত থাকে।’
সৈয়দ নজরুল ইসলাম হলের ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আরিফিন নাহিদ বলেন, ‘বহুল কাঙ্ক্ষিত উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে যখন বাড়ি ছেড়েছিলাম তখনই বুঝতে পেরেছিলাম বাড়িতে আর স্থায়ীভাবে থাকা হবে না। দেখতে দেখতে হল জীবনের দেড় বছর পার করে ফেললাম। তারপর ল্যাব, সিটি আর অ্যাসাইনমেন্ট এ জর্জরিত বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে প্রাণবন্ত করতে চলে আসলো হল ফেস্ট। সুস্বাদু খাবার -দাবার, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সবকিছু মিলিয়ে বছরের অন্যতম আনন্দঘন দিন এই হল ফেস্ট।’
জিএমএজি ওসমানী হলের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আদিত্য মাহফুজ সাফিন বলেন, ‘আমার হল জীবনের প্রথম ফেস্ট হিসেবে অন্যতম আবেগঘন স্মৃতি হয়ে থাকবে এই আয়োজন। বড় ভাইদের কাছ থেকে পাওয়া স্নেহ, দিকনির্দেশনা ও অভিভাবকত্ব আমাদের হল জীবনকে করেছে আরও সুন্দর ও সহজ। বিদায়ী ভাইদের জন্য রইল গভীর শ্রদ্ধা ও শুভকামনা।’
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা তাঁদের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরলে মাননীয় সংসদ সদস্য তা বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। পরে বিদায়ী ব্যাচের প্রতিনিধিদের মাঝে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
এ সময় মাননীয় সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি বুটেক্স ও দেশের টেক্সটাইল খাতের সকলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর বর্তমান অবস্থা আরও উন্নত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ছাত্রী হলগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের নতুন হল নির্মাণের দাবিও দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে আমরা আশাবাদী।’
আইটিইটির মহাপরিচালক ইঞ্জি. মো. এনায়েত হোসেন বলেন, ‘আমরা অতীতে হলে শিক্ষার্থীদের ওপর যে ধরনের টর্চার বা অনিয়ম হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আর পুনরাবৃত্তি হতে দেব না। আমাদের পেশাজীবী সংগঠন সবসময় সব ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। অতীতে অবৈধ শিক্ষক নিয়োগের মতো ঘটনাও ঘটেছে, যা আর যেন না ঘটে সে বিষয়ে আমি মাননীয় ভিসি মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
নীট কনসার্ন গ্রুপের পরিচালক এ কে এম মহসিন আহমেদ বলেন, ‘আজকের এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে যেন ২৭ বছরের পুরোনো স্মৃতির ভেতরে ফিরে গেছি। শহীদ আজিজ হলে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আজ চোখের সামনে ভেসে উঠছে। শিক্ষার্থীদের যেকোনো প্রয়োজনে আমাকে এবং আইটিইটি (ITET)-কে সবসময় পাশে পাবে। আমরা সবসময় শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করে যাব।’
উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইঞ্জি. মো. জুলহাস উদ্দিন বলেন, ‘আমি হল প্রভোস্টগণ ও শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। বুটেক্স থেকে সদ্য সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া দুইজনকে শিগগিরই বড় পরিসরে সংবর্ধনা দেওয়া হবে, যেখানে বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশায় কর্মরত বুটেক্সিয়ানরাও উপস্থিত থাকবেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কল্যাণ ও উন্নয়নের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
জি এম এ জি ওসমানী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘প্রতিটি ব্যাচের বিদায়ের সময় আমরা হলফেস্টের আয়োজন করে থাকি, মূলত তাঁদের সম্মাননা ও বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে। এখান থেকেই তাঁদের জীবনের এক নতুন যাত্রা শুরু হয়। জীবনের প্রতিটি ধাপেরই আলাদা সৌন্দর্য ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে—স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, এরপর কর্মজীবন; এভাবেই জীবনের চক্র চলতে থাকে। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে বুটেক্স ও দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনবে।’
শহীদ আজিজ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবিব বলেন, ‘বিদায়ী ব্যাচ ও শহীদ আজিজ হলের সকল শিক্ষার্থীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা। বিদায়ী শিক্ষার্থীরা এখন শিক্ষাজীবন শেষ করে নতুন কর্মজীবনে প্রবেশ করবে। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়াররা ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দেবে এবং দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনবে। হলফেস্ট আমাদের ঐতিহ্য ও ভালোবাসার একটি অংশ, যা প্রতিবছর আমাদের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। এই আয়োজন সফল করতে যারা সহযোগিতা করেছেন, বিশেষ করে ফেস্ট কমিটি ও অ্যালামনাইদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’
আনন্দ, আবেগ, ভ্রাতৃত্ববোধ ও বিদায়ের অনুভূতির মিশেলে এবারের হল ফিস্ট-২০২৬ শিক্ষার্থীদের মনে রেখে গেল এক অনন্য স্মৃতি।