ফল প্রকাশের পর খাতা দেখা ও পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ চান মাভাবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর উত্তরপত্র দেখা এবং সেই ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ চেয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা সরব হয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের দাবি, পরীক্ষার নম্বর প্রকাশের পর একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খাতা দেখার সুযোগ থাকলে মূল্যায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী আস্থার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। বর্তমানে প্রচলিত ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে মূল্যায়নে অসংগতি ও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের প্রতিফলন ঘটে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। উত্তরপত্র পর্যালোচনার এই সুযোগ নিশ্চিত করা হলে ভুলত্রুটি সংশোধনের পথ প্রশস্ত হবে এবং মেধার সঠিক মূল্যায়ন ঘটবে বলে তারা মনে করছেন।
মাভাবিপ্রবির বর্তমান মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুযায়ী, ১০০ নম্বরের মধ্যে ৩০ নম্বর থাকে ইন্টার্নাল কোর্স টিচারের হাতে এবং বাকি ৭০ নম্বরের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার খাতা প্রথম ও দ্বিতীয় পরীক্ষক দ্বারা মূল্যায়ন করা হয়। নম্বর ইনপুট দেওয়ার ক্ষেত্রে অটোমেশন পদ্ধতি চালু থাকলেও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, খাতায় নাম ও আইডি দৃশ্যমান থাকায় অনেক সময় নিরপেক্ষ মূল্যায়ন বিঘ্নিত হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, পরীক্ষায় ভালোভাবে লিখলেও প্রত্যাশিত নম্বর পাওয়া যায় না। আবার তুলনামূলক কম লিখেও কিছু শিক্ষার্থী বেশি নম্বর পেয়ে থাকেন। ব্যক্তিগত পছন্দ–অপছন্দের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে খাতার মূল্যায়নে পড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নম্বর নিয়ে কারসাজি বা ইচ্ছাকৃতভাবে কম–বেশি দেওয়া আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দ্রুত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
অন্য এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জানান, একটি সহজ কোর্সে আশানুরূপ পরীক্ষা দিয়েও মাত্র ২.৫০ সিজিপিএ পাওয়ায় তিনি শিক্ষকের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, কিন্তু শিক্ষক কেবল ‘থার্ড এক্সামিনার’ হওয়ার অজুহাত দিয়ে দায় এড়িয়েছেন। ওই শিক্ষার্থীর মতে, ‘এই টার্ম বা বাহানার সত্যতা ঠিক কতটুকু আর এর প্রমাণই বা কি যে আমার খাতা আসলেই থার্ড এক্সামিনার হয়েছে, এটা বোঝার তো একটা উপায় থাকা চাই।’
শিক্ষার্থীদের এই দাবির পক্ষে হাবিপ্রবি শিক্ষার্থী রিয়া মোদক বলেন, ‘নম্বর প্রকাশের পর উত্তরপত্র দেখার সুযোগ থাকা একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যদিও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালায় পুনঃনিরীক্ষণ বা পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে, বাস্তবে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় খাতা দেখার সুযোগ পান না, যা দ্বিধা ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী কাঠামোবদ্ধভাবে খাতা দেখার সুযোগ নিশ্চিত করলে মূল্যায়নের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা দুটোই বৃদ্ধি পাবে। এই স্বচ্ছতা শিক্ষককে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য নয়, বরং একটি অংশগ্রহণমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া।’
বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষকদের মতে, মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক ও ত্রুটিমুক্ত করতে ‘ইউনিক কোড’ বা কোডিং সিস্টেম চালু করা জরুরি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো: সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতার উপরে কোন প্রমাণ থাকে না যে এটা কার খাতা, তার আইডি/রোল নম্বর সহ গুরুত্বপূর্ণ সকল তথ্য খাতার উপর অংশ থেকে তুলে ফেলা হয় পরবর্তীতে ইউনিক কোড মিলিয়ে তা আবার খাতা দেখা শেষে সংযুক্ত করা হয়। যে বিষয়টি আপনাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে করা হয় না অর্থাৎ নাম, আইডি সব তথ্যই খাতার উপরে থাকে। তো এই কারণে কোন শিক্ষকের প্রিয় বা অপ্রিয় শিক্ষার্থীদের নম্বর কম বা বেশি দেবার উপায় থাকে না।’
তিনি আরও জানান, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পরীক্ষক দেখার পরেও শিক্ষার্থী সন্তুষ্ট না হলে পরীক্ষা পরিচালক বরাবর আবেদন করে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মাধ্যমে পুনরায় খাতা দেখানোর সুযোগ থাকা উচিত।
ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্সের সিনিয়র লেকচারার মো: তৌহিদুল ইসলামও একই মত দিয়ে বলেন, ‘আমার মনে হয় কোডিং সিস্টেম করা উচিত। পরীক্ষার শুরুতে উপরের নাম আর সাবজেক্ট লেখা অংশটুকু ছিঁড়ে নিয়ে কোডিং এর মাধ্যমে খাতা চেক করলে স্বজনপ্রীতি কমে যাবে।’
দেশের প্রচলিত আইনও শিক্ষার্থীদের তথ্য পাওয়ার অধিকারকে সমর্থন করে। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ৬ ও ৮ ধারা অনুযায়ী, পাবলিক অথরিটি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার উত্তরপত্র পর্যালোচনার আবেদন গ্রহণ করতে বাধ্য। এছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে নম্বর কারসাজি প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর অধীনে জালিয়াতি ও প্রতারণার মতো ফৌজদারি ব্যবস্থা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর আওতায় তদন্তের সুযোগ রয়েছে।
তবে মাভাবিপ্রবি প্রশাসন বর্তমান নীতিমালার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর সেমিস্টার পরীক্ষার সর্বমোট ১০০ নম্বরের মধ্যে ২০ শতাংশ ইন্টার্নাল কোর্স টিচার ক্লাস টেস্ট, অ্যাসাইনমেন্ট বা প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে এবং বাকি ১০ শতাংশ উপস্থিতি অনুযায়ী প্রদান করেন। বাকি ৭০ শতাংশ নম্বর দিয়ে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষায় মূল্যায়ন করা হয়।’
খাতা দেখার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘নীতিমালা অনুযায়ী ইন্টার্নাল কোর্স টিচার খাতা দেখার পর সেই খাতা আবার অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকের কাছে পাঠাতে হবে। যদি ফার্স্ট এবং সেকেন্ড এক্সামিনারের নম্বরের পার্থক্য ২০ শতাংশ হয় তবে সেই খাতা থার্ড এক্সামিনারের কাছে পাঠানো হয়।’
পুনর্মূল্যায়নের আবেদনের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালাতে এ বিষয়ে স্পষ্ট বলা আছে যে, পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়ন করার আবেদন করা যাবে না। তাই বর্তমানের আলোকে বিষয়টি সম্ভব নয়।’
তবে ভবিষ্যতে ইউনিক কোড চালুর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘খাতাতে ইউনিক কোড চালু করার বিষয়টিতে অর্ডিন্যান্স বোর্ড চাইলে পরিবর্তন আনতে পারেন। যেহেতু পরীক্ষার সম্পূর্ণ বিষয়টি শৃঙ্খলা বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল, তাই নতুন নীতিমালার প্রবর্তন কেবল তাঁদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তেই সম্ভব।’
মাভাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা মনে করেন, একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উত্তরপত্র দেখার সুযোগ চালু করলে একাডেমিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিবেশের গুণগত মানোন্নয়ন নিশ্চিত করবে।