০১ মে ২০২৬, ২২:০৬

নীরব হাতেই সচল বুটেক্স , শ্রমিক দিবসে অদেখা মানুষের গল্প

বুটেক্স   © টিডিসি ফটো

সকাল এখনো পুরোপুরি জাগেনি। ক্যাম্পাসের গাছে গাছে পাখির ডাক, ফাঁকা করিডোর, নিস্তব্ধ একাডেমিক ভবন—এই নীরবতার মধ্যেই শুরু হয়ে যায় কাজ।

কেউ ঝাড়ু দিচ্ছেন, কেউ ড্রেন পরিষ্কার করছেন, কেউ আবার গেটের পাশে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব নিচ্ছেন নিরাপত্তার। এরা কেউ আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন না, তবুও তাদের হাতেই প্রতিদিন সচল থাকে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স)।

শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা, ক্লাস-পরীক্ষা, ক্লাব কার্যক্রম— সবকিছুর পেছনে রয়েছে এক অদৃশ্য শ্রম। পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা প্রতিদিন ক্যাম্পাসকে রাখেন বাসযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন। কিন্তু সেই কাজের স্বীকৃতি কিংবা পারিশ্রমিক— সবসময় কি তাদের পরিশ্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

নিরাপত্তা প্রহরীদের জীবন যেন সময়ের সীমানা মানে না। দিন-রাত পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। রাতের নিরবতা যখন ক্যাম্পাসকে ঢেকে ফেলে, তখনই তাদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।

অফিস সহায়ক ও নিরাপত্তা প্রহরী নিতাই দত্ত বলেন, “আমি ২৭ বছর ধরে এখানে চাকরি করছি। ঝড়-বৃষ্টি হোক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় খোলা বা বন্ধ— যে পরিস্থিতিই থাকুক না কেন, আমাদের দায়িত্ব পালন করে যেতে হয়। দিন-রাত কোনো পার্থক্য থাকে না। সরকারি বেতনে কোনোভাবে সংসার চললেও মাঝে মাঝে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। কিন্তু সেই ওভারটাইমের পারিশ্রমিক ঘণ্টায় মাত্র ২০ টাকা, যা বর্তমান সময়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। তবে কাজ করতে গিয়েই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমাদের এক আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তারা আমাদের কাছে পরিবারের সদস্যদের মতো হয়ে যায়।”

ক্যাম্পাসের ভেতরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হলের সাপোর্ট স্টাফরা। শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনে তারা অপরিহার্য— খাবার পরিবেশন, পরিষেবা দেওয়া, নানা কাজে সহযোগিতা করা— সবই তাদের দায়িত্বের অংশ। অথচ তারাও ন্যায্য মজুরি ও ভালো কর্মপরিবেশের প্রত্যাশা করেন।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম হলের পরিচ্ছন্নতা কর্মী মো. হুমায়ুন কবির বলেন, “আমাদের হলের অনেক স্টাফ ১০, ১২ এমনকি ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন। কিন্তু যারা ৪০০০, ৫০০০ বা ৬০০০ টাকার মতো কম বেতনে চাকরি করছেন, তাদের জন্য সংসার চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে যায়। তাই কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি, হল স্টাফদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হোক।"

তিনি আরও বলেন, মাঝে মাঝে আমাদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়, কিন্তু সেই অনুযায়ী ওভারটাইম ভাতা আমরা পাই না। তবে হলের শিক্ষার্থীরা আমাদের প্রতি অনেক সহযোগিতাপূর্ণ। যেকোনো বিপদে তারা আমাদের পাশে দাঁড়ায়, এমনকি কোনো খাবারের আয়োজন করলে সেখানে আমাদেরও অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে তাদের সঙ্গে আমাদের একটি ভিন্নধর্মী, আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।”

জিএমএজি ওসমানী হলের নিরাপত্তা প্রহরী মো : শফিকুল বলেন, জিএমএজি ওসমানী হলের নিরাপত্তা প্রহরী শফিউল বলেন, “আমরা যে বেতন পাই, চারটি সন্তান নিয়ে বর্তমান বাজারে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর। আমাদের বেতন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দেওয়া হয়, ফলে আমরা কোনো ঈদ বোনাস বা বৈশাখী বোনাস পাই না। তবুও শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিকতা থেকেই আমরা দিন-রাত কাজ করে যাই। তাদের চলাফেরা, খেলাধুলা ও ক্যাম্পাসের প্রাণচাঞ্চল্য আমাদের সব দুঃখ-কষ্ট অনেকটাই ভুলিয়ে দেয়।”

মহান শ্রমিক দিবস আসে প্রতিবছর, শ্রমের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ এনে দেয়। কিন্তু বুটেক্সের এই নীরব কর্মীদের জন্য সেই দিনটি কেবল প্রতীকী হয়ে থাকলে চলবে না। প্রয়োজন বাস্তব পরিবর্তন— ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং জীবনের নিশ্চয়তা।

কারণ দিনের শেষে, এই নীরব হাতগুলোর ওপরেই দাঁড়িয়ে থাকে পুরো ক্যাম্পাসের প্রতিদিনের ছন্দ।