৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:২৯

যবিপ্রবিতে জনবল-সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ

যবিপ্রবির ডা. এম আর খান মেডিকেল সেন্টার  © টিডিসি

জনবল-সংকটে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ডা. এম আর খান মেডিকেল সেন্টারে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় শিক্ষার্থীদের জরুরি সেবার জন্য ছুটতে হচ্ছে শহরের হাসপাতালগুলোয়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ক্ষোভ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানরত ৩৪৯ জন শিক্ষক, প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী, ১৬৩ জন কর্মকর্তা ও ৩৪৬ জন কর্মচারীদের জন্য চিকিৎসক মাত্র ৪ জন। প্যাথলজি বিভাগে যন্ত্রপাতি থাকলেও টেকনিশিয়ান না থাকায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে যেতে হয় ১৫ কিলোমিটার দূরে শহরের হাসপাতালে। এই যাতায়াতের জন্য দুটি অ্যাম্বুলেন্সের একটি নষ্ট থাকায় একাধিক জন অসুস্থ হলে বিপাকে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের দিনগুলোয় মেডিকেল বন্ধ ও ২৪ ঘণ্টা সেবা না থাকায় জরুরি সেবা নিতে ছুটতে হয় শহরে। এ ছাড়া নারী চিকিৎসক স্বল্পতা ও তাদের অনুপস্থিতির কারণে চিকিৎসাসেবা নিতে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়েন অনেক নারী শিক্ষার্থী। 

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, মেডিকেলে একটি শিফট চালাতে প্রয়োজনীয় পদসমূহের মধ্যে চিফ মেডিকেল অফিসার পদে ১ জন কর্মরত, ডেপুটি মেডিকেল অফিসারের ১টি পদ শূন্য। সিনিয়র মেডিকেল অফিসারের ২টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ১ জন। মেডিকেল অফিসারের ৫টি পদের মধ্যে কর্মরত ২ জন, নার্সের ৪টি পদের মধ্যে কর্মরত ২ জন ও মেডিকেল এটেনডেন্টের ৩টি পদের বিপরীতে আছে ২ জন। এক্স-রে টেকনিশিয়ান (রেডিওগ্রাফি) ২টি পদের বিপরীতে ১ জন আছে। এক্স-রে টেকনিশিয়ান ও ল্যাব টেকনোলজিস্টের ২টি পদই শূন্য, মেডিকেল সহকারী পদে ২টির বিপরীতে ১ জন, অফিস সহকারী পদে ২টির বিপরীতে ১ জন ও ক্লিয়ার হিসেবে ২টির বিপরীতে ২ জন আছেন। এ ছাড়া ১ জন করে  পিএ, স্টোর কিপার ও সিনিয়র কম্পাউন্ডার রয়েছে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জনবলের অর্ধেক দিয়েই চলছে মেডিকেলের ৮ ঘণ্টার এক শিফট সেবা। যেখানে ২৪ ঘণ্টায় তিন শিফটে মেডিকেল সেবা চালু থাকার কথা।

আরও জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলের প্যাথলজি বিভাগে স্থায়ী পদ থাকলেও তাতে নেই কোনো জনবল। ফলে মেডিকেলে রোগীদের রোগ নির্ণয়ের জন্য করা যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এ ছাড়া মেডিকেল সেন্টারে শয্যাসংকটও রয়েছে। বর্তমানে মাত্র পাঁচটি শয্যা থাকলেও একটি প্রকল্পের আওতায় ২০টি শয্যা বরাদ্দ পেয়েও স্থান সংকটের কারণে তা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। একাধিক শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে তাদের শহরের সদর হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

মেডিকেল সূত্র জানায়, জনবল-সংকটে সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা সেবা দিতে পারেন না তারা। তারপরও ডিউটি ভাগ করে প্রতি বৃহস্পতিবার এবং প্রতিদিন ইভেনিং শিফট রাত ৮টা পর্যন্ত চালু রেখেছেন তারা। এ ছাড়া তাদের ওষুধেরও সংকট রয়েছে। ঊর্ধ্বতনকে সে বিষয়ে জানানো হয়েছে। 

ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আল শাহরিয়ার রাফিদ বলেন, ২৪ ঘণ্টা মেডিকেল সেবা চালু থাকার কথা থাকলেও বৃহস্পতি, শুক্রবারসহ যেকোনো ছুটির দিন বন্ধ থাকে মেডিকেল সেন্টার। রাতে কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে তাকে শহরে যেতে হয় কারণ মেডিকেল বন্ধ থাকে। আবার অনেক সময় চিকিৎসকরা নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেলে না থেকে শহরের বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখেন। আবার মেডিকেলে কখনোই প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মেডিকেলের সমস্যা সমাধান করে দ্রুত শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার চিকিৎসার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

ইএসটি বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজা আক্তার মিথি বলেন, মেডিকেল সেন্টারে সার্বক্ষণিক নারী চিকিৎসক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জরুরি চিকিৎসাসেবার মান উন্নত করতে হবে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। 

চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. দীপক কুমার বলেন, ‘বর্তমানে এক শিফট সেবা দিতে যে লোকবল প্রয়োজন তার অর্ধেক রয়েছে। কিন্তু সেই জনবল দিয়ে আমরা ইভেনিং শিফট চালু করেছি। তবে ২৪ ঘণ্টা সেবা চালু করতে আমাদের এক শিফটের লোকবলের দ্বিগুণ প্রয়োজন। বিষয়টি আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছি। তারা যদি পদক্ষেপ গ্রহণ করে তবে আমরা শিক্ষার্থীদের ভালো সেবা দিতে পারব।’

এ বিষয়ে যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর বলেন, ‘মেডিকেল সেন্টারের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আমি পূর্ণ অবগত। শূন্য পদগুলো পূরণের মাধ্যমে সেন্টারটিকে পূর্ণাঙ্গরূপে কার্যকর করতে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছি। খুব দ্রুতই শিক্ষার্থীরা এর সুফল দেখতে পাবে। আমার শিক্ষার্থীরা যাতে ক্যাম্পাসে সর্বোত্তম চিকিৎসাসেবা পায়, তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।’

উল্লেখ্য, গত বুধবার রাতে যবিপ্রবির বীর প্রতীক তারামন বিবি ছাত্রী হলের ডাইনিংয়ের খাবার খেয়ে অসুস্থ হন শতাধিক শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে জনবল-সংকটের কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে শহরের আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ ছাড়া মেডিকেল সেন্টারের দশা বেহাল। নারী চিকিৎসকদের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থীরা।