তরুণদের ভাবনা: স্বাধীনতা শব্দটি কি তবে বন্দি শুধু ইতিহাসের পাতায়?
স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি জাতির আত্মত্যাগ, সংগ্রাম এবং অর্জনের দীর্ঘ পথচলার প্রতিচ্ছবি। প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই রক্তঝরা অধ্যায়, যার বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি পতাকা এবং নিজেদের পরিচয়। তবে সময়ের সাথে সাথে স্বাধীনতার অর্থ ও উপলব্ধিও পরিবর্তিত হচ্ছে- বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গিতে।
দেশের ৫৬ তম স্বাধীনতা দিবসে, বর্তমান প্রজন্ম- বিশেষ করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীরা, স্বাধীনতা নিয়ে কি ভাবছেন? স্বাধীনতা কি কেবলই ইতিহাসের গণ্ডিতে আবদ্ধ?
বর্তমান প্রেক্ষাপট, জীবনের বাস্তবতা ও চিন্তার সাথে মিলিয়ে স্বাধীনতা বিষয়টিকে খতিয়ে দেখছেন তারা। সামগ্রিকভাবে তরুণরা বলতে চেয়েছেন তাদের কাছে স্বাধীনতার মানে শুধু অতীতের গৌরব নয়, বরং বর্তমানের অধিকার ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। মুক্তভাবে মত প্রকাশ, বৈচিত্র্যকে সম্মান করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়াকেও তারা স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনালসের গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রেজওয়ানা হোসাইন বলেন, স্বাধীনতা শুধু একটি শব্দ নয়, একটি চেতনার নাম। আমাদের কাছে স্বাধীনতা মানে শুধু রক্তের বিনিময়ে পাওয়া ভূখণ্ড নয়, বরং মুক্ত চিন্তা, নির্ভীক কণ্ঠ আর নিজের পরিচয়কে গর্বের সাথে তুলে ধরার অধিকার।
জেন জি প্রজন্ম স্বাধীনতাকে দেখে নতুন চোখে; ডিজিটাল দুনিয়ায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করার সাহস, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা। তবে এই স্বাধীনতা শুধুই ভোগের নয়, বরং আমাদের দায়িত্বও যেমন- সহনশীলতা শেখা, অন্যের কথা শোনা, এবং সমাজকে এগিয়ে নেওয়া। স্বাধীনতা তাই আমাদের কাছে শুধু উদযাপন নয়, এটি প্রতিদিনের চর্চা; একটি চলমান যাত্রা, যেখানে নতুন প্রজন্ম প্রতিনিয়ত এর অর্থ নতুন করে লিখে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন : স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ হেল কাফি জানান- স্বাধীনতা আমার কাছে কেবল একটি শব্দ নয়, বরং একটি নিরন্তর অনুভূতির নাম। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে দাঁড়িয়ে আমরা যখন আগামীর স্বপ্ন বুঁনি, তখন আমাদের কাছে স্বাধীনতা মানে কেবল একটি লাল-সবুজ পতাকা নয়; বরং সেই পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে 'সত্য ও ন্যায়ের' পক্ষে কথা বলার অধিকার।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা মানে এক বিশাল আকাশ, যেখানে ডানা মেলার অধিকার সবার সমান। এই ডিজিটাল যুগে আমরা স্বাধীনতাকে দেখি নাগরিক মর্যাদার আয়নায়। যখনই আমরা কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই, তখনই স্বাধীনতার এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি হয়। আমাদের কাছে স্বাধীনতা মানে- মেধার কদর পাওয়া, বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করা এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার অদম্য সাহস।
তবে এই স্বাধীনতা কেবল অধিকার নয়, এটি বড় এক দায়বদ্ধতাও। ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হওয়া এবং ঘৃণা নয়, বরং যুক্তি দিয়ে একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠন করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট সততা আর দেশপ্রেমের মাধ্যমেই আমরা স্বাধীনতার ঋণ শোধ করতে চাই।
আবার যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-এর পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থী সাব্বির আলম সিয়াম বলেন-স্বাধীনতা আমাদের কাছে কেবল একটি অর্জন নয়, বরং একটি চলমান দায়িত্ব ও চেতনার প্রতীক।
এটি আমাদের চিন্তার মুক্তি, ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা এবং সমান সুযোগের স্বপ্ন বহন করে।তরুণ প্রজন্ম বিশ্বাস করে, প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হয় আত্মউন্নয়ন ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে মেধার মূল্যায়ন এবং নৈতিকতা সর্বাগ্রে স্থান পায়। স্বাধীনতা আমাদেরকে শুধু অধিকারই দেয় না, বরং দেশের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে। এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি।
এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-এর ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী আনোয়ার হোসেন আনন্দ জানান-২৬শে মার্চ-স্বাধীনতার এক গৌরবময় দিন, যা আমাদের ইতিহাস ও আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে আজকের তরুণদের কাছে এটি শুধু উদযাপনের নয়, বরং আত্মসমালোচনারও সময়। অনেকেই ভাবেন-স্বাধীনতার স্বপ্ন আমরা কতটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি? বাস্তবতার সীমাবদ্ধতায় কেউ হতাশ হলেও, এই দিনটি নতুন করে দায়িত্বশীল হওয়ার প্রেরণা দেয়। ছোট ছোট ভালো কাজ, সততা ও সচেতনতার মাধ্যমেই পরিবর্তন সম্ভব-এমন বিশ্বাসই আমাদের এই তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যতের পথ দেখায়।
সব মিলিয়ে, স্বাধীনতা আজ আর কেবল অতীতের একটি অর্জন নয় বরং বর্তমানের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। নতুন প্রজন্মের ভাবনা, প্রশ্ন ও প্রত্যাশা প্রমাণ করে যে স্বাধীনতার চেতনা এখনো জীবন্ত। ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, আত্মসমালোচনা ও সচেতনতার মাধ্যমে যদি আমরা নিজ নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখি, তবেই গড়ে উঠবে সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ-যেখানে স্বাধীনতা সত্যিকার অর্থেই প্রতিফলিত হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।