২১ মার্চ ২০২৬, ১৬:০৭

ডিজিটাল সালামীর যুগে ফিকে হচ্ছে নতুন টাকার উচ্ছ্বাস

ঈদ সালামী নিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা  © টিডিসি সম্পাদিত

সময় বদলের সাথে সাথে ঈদ উদযাপনের ধরনেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। একসময় ঈদ মানেই ছিল নতুন টাকার খসখসে নোট হাতে পাওয়ার আনন্দ। বড়দের কাছ থেকে সালামি নেওয়ার উচ্ছ্বাস আর সেই টাকাগুলোর গন্ধ আবার যত্ন করে রেখে দেওয়ার স্মৃতি। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে সেই চিত্র একেবারেই বদলে গেছে। সালামী প্রদানে মোবাইল ব্যাংকিং এখন সকলের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। তাই ঈদে নতুন টাকার সালামীর চল তুলনামূলক কমে গেছে। 

যদিও প্রযুক্তির এই অগ্রগতি সময়ের চাহিদা পূরণ করছে কিন্তু ঐতিহ্যবাহী অনুভূতিগুলোর গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না। ঈদ শুধুমাত্র অর্থ লেনদেনের বিষয় নয়, এটি আবেগ, সম্পর্ক ও সংস্কৃতিরও প্রতিফলন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার যাত্রা শুরু হয় ২০১০-১১ সালের দিকে। এরপর ধীরে ধীরে এর বিস্তার ঘটলেও ২০১৫ সালের পর থেকে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। বিশেষ করে ২০২০ সালের পর করোনা পরিস্থিতির সময় ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা পরবর্তীতে ঈদের সালামির ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এনে দেয়। বর্তমানে বিকাশ, রকেট, নগদ ও উপায়সহ বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সালামি দেওয়া একটি সহজ ও প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিণত হয়ে গেছে বলে মনে করছেন বর্তমান তরুণ শিক্ষার্থীরা।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান মিমের বলেন, ডিজিটাল সালামি অনেক সহজ ও নিরাপদ। দূরে থাকলেও পরিবার, আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে মুহূর্তেই সালামি পাওয়া যায়, যা আগে সম্ভব ছিল না। তবে, আগে ঈদে নতুন টাকার গন্ধটাই ছিল আলাদা আনন্দ। এখন মোবাইল ব্যাংকিং এর বদৌলতে টাকা দ্রুত আসে ঠিকই, কিন্তু আগের সেই অনুভূতিটা আর পাই না।

মাভাবিপ্রবির বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী মাইশা মিরাজ দিশা স্মৃতিচারণ করে বলেন, শৈশবে ঈদের আনন্দ একটু অন্য রকম ছিল। রাতে বালিশের নিচে নতুন জামা কাপড় রেখে ঈদ এর আনন্দের জন্য ঘুমাতে না পারা, সকালে উঠে মায়ের হাতের সেমাইয়ের মৌ মৌ গন্ধ, নামাজ শেষে কোলাকুলি করে ঈদ মোবারক বলার সে যে কি আনন্দ সেটা হয়তো এখনকার যুগের অনেক শিশুরই অজানা।

এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, তখন সালামি মানেই ছিল হাতে গুঁজে দেওয়া দুটাকা, পাঁচ টাকা কিংবা একটা চকলেট। কিন্তু তার থেকেও বেশি ছিল বড়দের স্নেহভরা মাথায় হাত রাখা, আর আন্তরিক দোয়া- “ভালো থাকিস, মানুষ হ।” সেই কথাগুলোই যেন আজকের হাজার টাকার চেয়েও দামী ছিল। হয়তো তখন আমাদের কাছে সব কিছু কম ছিল কিন্তু হৃদয় ছিল ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। এখন সব কিছু হাতের মুঠোয় তবুও যেনো ঈদ এর আমেজ পরিপূর্ণতা নেই।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আসফি রায়হান বলেন, ছোটবেলার ঈদ ছিল নিজের খুশির জন্য, আর বড়বেলার ঈদ হয়ে গেছে অন্যদের খুশিতে নিজের আনন্দ খোঁজার উপলক্ষ। তখন আনন্দ ছিল সরল, এখন তা হয়ে গেছে গভীর ও অর্থবহ। ঈদের সকাল শুরু হতো নতুন জামা পরে, পরিবারের সবার সঙ্গে মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। নামাজ শেষে বড়দের সালাম করা, আর সেই কাঙ্ক্ষিত সালামি পাওয়া যেন ছিল দিনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। সেই সালামি জমিয়ে খেলনা কেনা, মেলা ঘোরা, আর বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি সব মিলিয়ে ঈদ ছিল একেবারে খুশির উৎসব।

তিনি আরও বলেন, এখন ঈদের সব কিছুই হয়ে গেছে কেমন যান্ত্রিক এবং সহজলভ্য। তাই সেই নির্ভেজাল আনন্দটা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আর ঈদে আরও একটি মজার পরিবর্তন হলো- আগে সালামি পেতাম, আর এখন নিজের পকেট থেকেই সালামি দিতে হয়!

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রবিউল্লাহ রানা জানান, ছেলেবেলায় ঈদের সালামি শুধু টাকার লেনদেন ছিল না; ছিল ভালোবাসা, সম্মান আর প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর এক আনন্দঘন উপলক্ষ। বাড়ি বাড়ি ঘুরে সালাম দেওয়া, নতুন টাকার গন্ধ, সেমাইয়ের সুবাস- সেই উচ্ছ্বাসই ছিল ঈদের আসল আমেজ। তবে বর্তমানে ডিজিটাল মাধ্যমে এক ক্লিকেই সালামি পৌঁছে গেলেও কমে গেছে সরাসরি দেখা হওয়া, হাতে সালামি নেওয়া আর একসাথে সময় কাটানোর সেই উষ্ণতা। তাই আজও স্মৃতির ভাঁজে রয়ে গেছে সেই ঈদ, যেখানে টাকার পরিমাণ নয়—আন্তরিকতাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

তবে আধুনিক সালামি মাধ্যমগুলোর ব্যাপক সমালোচনার পরেও মাভাবিপ্রবির শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার শিফা আধুনিক সালামি মাধ্যমের উপযোগিতা, প্রয়োজনীয়তা ও সুবিধা উল্লেখ করে বলেন, ছোটবেলায় খালা ও মামার কাছ থেকে হাতে হাতে সালামি পেতাম। যা পেতাম, সেটুকুই ছিল তার ঈদের আনন্দ। তখন ডিজিটাল মাধ্যম না থাকায় দূরের অনেকেই ইচ্ছা থাকলেও সালামি পাঠাতে পারতেন না।

তিনি আরও বলেন, সময়ের সাথে ঈদের অভিজ্ঞতা বদলেছে। এখন ঈদ এলে আম্মু ও ভাইয়ার দেওয়া সালামি দিয়ে দিন শুরু হয়, যা আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্তগুলোর একটি। পাশাপাশি বিকাশের মাধ্যমে সালামির সঙ্গে পাওয়া শুভেচ্ছা ও দোয়ার বার্তাগুলো আমাকে অনেক বেশি আনন্দ দেয়। তার মতে, ঈদের সালামি শুধু অর্থ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভালোবাসা, খোঁজখবর ও সম্পর্কের আন্তরিকতা।

সব মিলিয়ে, ডিজিটাল সুবিধা ঈদকে সহজ ও আধুনিক করে তুললেও নতুন টাকার সেই স্পর্শ, গন্ধ আর উচ্ছ্বাসের রেশ এখনো এক অনন্য অনুভূতি হয়ে রয়ে গেছে তরুণদের মনে।