বুটেক্সের ভিন্নধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের ঈদ ঘিরে অনুভূতি
রমজান মাস মুসলমানদের জন্য সংযম, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক চর্চার এক বিশেষ সময়। টানা এক মাস সিয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিনে উদযাপিত হয় ঈদুল ফিতর। তবে এই উৎসব শুধু ধর্মীয় পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বাংলাদেশে এটি পরিণত হয়েছে এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আনন্দে। পরিবার, বন্ধু ও প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার মধ্য দিয়ে এই সময়টায় গড়ে ওঠে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার এক গভীর বন্ধন।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) ক্যাম্পাসেও রমজান মাস এলে দেখা যায় এমনই এক সুন্দর সম্প্রীতির চিত্র। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীরা একসাথে বসে ইফতার করা, আড্ডা দেওয়া কিংবা একে অপরের অনুভূতিকে সম্মান করার মধ্য দিয়ে তুলে ধরেন পারস্পরিক সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ। ভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিতে ফুটে ওঠে সেই বৈচিত্র্যময় বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির গল্প।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী সপ্তক বড়ুয়ার কাছে ঈদ, পূজা কিংবা পূর্ণিমা—সব ধর্মের উৎসবই মূলত মানুষের উৎসব। তার মতে, ধর্মীয় উৎসবগুলো কেবল আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার বার্তাও বহন করে। তিনি বলেন, “রমজান মাস মুসলমানদের জন্য সংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মশুদ্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। টানা এক মাস রোজা রাখা এবং নিয়মিত নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে যে চর্চা হয়, তা মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
রমজান মাসে বন্ধুদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নেওয়াটা তার কাছে বিশেষ আনন্দের বিষয়। সবার সঙ্গে বসে একসাথে খাবার ভাগাভাগি করা ও আড্ডা দেওয়ার মুহূর্তগুলো তাকে ভিন্নধর্মী এক আনন্দ দেয়। ঈদের দিন মুসলিম বন্ধুদের কাছ থেকে দাওয়াত পাওয়া এবং সেই দাওয়াতে অংশ নেওয়াটাও তার কাছে খুবই আনন্দের। তিনি আরও বলেন, “ঈদ মুসলিমদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও এর আনন্দ যেন সবার মাঝেই ছড়িয়ে পড়ে। কোলাকুলি, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং একসাথে সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে মানুষের মনে তৈরি হয় শান্তি ও সম্প্রীতির অনুভূতি।”
হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী তিথি কর বলেন, “ধর্ম ভিন্ন হলেও উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করার মধ্যেই মানবিকতার প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।” তার মতে, রোজার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইফতার—যেখানে সারাদিনের সংযমের পর সবাই একসাথে বসে খাবার ভাগাভাগি করে নেয়।
ছোটবেলার একটি স্মৃতি মনে করে তিনি বলেন, “প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার ক্লাসে আমিই ছিলাম একমাত্র হিন্দু শিক্ষার্থী। তখন আমি অবাক হয়ে দেখতাম যে আমার সকল মুসলিম বন্ধুরা কত আন্তরিকতার সঙ্গে রোজা পালন করে। সময়ের সঙ্গে আমি আরও উপলব্ধি করতে পারি যে রোজা রাখা শুধু একটি ধর্মীয় অনুশীলন নয়, বরং এটি ধৈর্য, আত্মসংযম ও শৃঙ্খলার এক অনন্য উদাহরণ।”
মুসলিম শিক্ষার্থী জেবা ফারিহার কাছে রমজান মাস রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সমন্বয়ে গঠিত এক পবিত্র সময়। প্রথমে পরিবারের বাইরে থেকে রমজান কাটানোর বিষয়টি তাকে কিছুটা কষ্ট দিলেও পরে হলের সহপাঠীদের মধ্যেই তিনি আরেকটি পরিবারের অনুভূতি খুঁজে পান। তিনি বলেন, “হলের সবাই মিলে একসাথে সাহরি করা, ইফতার পরিকল্পনা করা এবং গোল হয়ে বসে ইফতার করার মুহূর্তগুলো আমার কাছে বিশেষ আনন্দের। সিনিয়র, জুনিয়র এবং ব্যাচমেট—সবাই যেন একে অপরের আপন হয়ে ওঠে এই সময়টাতে। বিশেষ করে যখন ভিন্ন ধর্মের সহপাঠীরাও সেই আড্ডা ও ইফতারে অংশ নেয়, তখন আমাদের আনন্দ যেন আরও বেড়ে যায়।”
তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পর আসে আনন্দের দিন ঈদুল ফিতর। ঈদের সকাল মানেই নতুন পোশাক পরে পরিবারের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়, সালামি, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া এবং আনন্দ ভাগাভাগি করা। শৈশবের সেই স্মৃতিগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঈদগাহে যাওয়া, আড্ডা, নানা রকম খাবার আর উৎসবের উচ্ছ্বাস। কাজী নজরুল ইসলামের 'ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ' গানটির মতোই ঈদ আমাদের মনে আনন্দ জাগিয়ে তোলে।"
সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী সুব্রত কুমার পালের কাছে রমজান মাসের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো হলের বন্ধুদের সঙ্গে একসাথে ইফতার করার মুহূর্তগুলো। তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই পরিবার থেকে আমি শিখেছি যে সকল ধর্মের মানুষকে সম্মান করতে হবে এবং মিলেমিশে থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে এসে আমি সেই শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পেয়েছি।”
তিনি জানান, প্রায় প্রতিদিনই তার বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার করার সুযোগ হয়। একসাথে বসে খাওয়া, গল্প করা ও আড্ডা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়ে ওঠে। তার মতে, ভিন্ন ধর্মের মানুষ একসাথে থেকে একে অপরের বিশ্বাসকে সম্মান করার মধ্যেই প্রকৃত সম্প্রীতির সৌন্দর্য নিহিত।
খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী ওফেলিয়া অংকিতার মতে, যেকোনো উৎসব সবাই মিলে উদযাপন করলে তার আনন্দ আরও বেড়ে যায়। রমজান মাসে বন্ধুদের উৎসাহ ও আনন্দ তাকে সবসময়ই মুগ্ধ করে। তিনি বলেন, “ছোটবেলায় প্রায়ই বন্ধুদের বাসায় ইফতারে যাওয়ার সুযোগ হতো। সবাই মিলে একসাথে বসে ইফতার করা, গল্প করা ও হাসি-আড্ডার মুহূর্তগুলো আমার কাছে খুবই আনন্দের ছিল। বন্ধুদের এই আন্তরিকতা ও দাওয়াতের সংস্কৃতি আমাকে সবসময়ই স্পর্শ করে।”
তার মতে, ধর্ম ভিন্ন হলেও একে অপরের উৎসবের আনন্দে অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। ঈদের সময় মুসলিম বন্ধুদের কাছ থেকে দাওয়াত পাওয়া যেমন স্বাভাবিক, তেমনি অনেক সময় নিজেরাও বন্ধুদের দাওয়াত করে থাকেন। তিনি বলেন, “মাঝে মাঝে ঈদের সময় আমার বাবা-মা তাঁদের মুসলিম বন্ধু ও সহকর্মীদের ঈদের দাওয়াতে আমাদের বাসায় আমন্ত্রণ জানান। এতে আমরা সবাই মিলে এক সুন্দর মুহূর্ত উপভোগ করি।”
অন্যদিকে মুসলিম শিক্ষার্থী আবিদ হাসানের কাছে রমজান মানেই পরিবারকে ঘিরে থাকা অসংখ্য স্মৃতি। তিনি বলেন, “ছোটবেলায় সেহরিতে ওঠার জন্য আমি ও আমার বোন অনেক সময় রাত জেগে থাকতাম। কখনো দাবা খেলে, কখনোবা গল্প করে। ইফতারের সময় পরিবারের সবাই একসাথে বসে খাওয়ার মুহূর্তগুলোও আমার কাছে খুব প্রিয়।”
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে তিনি রমজান ও ঈদের আনন্দ বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করার নতুন অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ইফতার আয়োজন—কেন্দ্রীয় ইফতার, হলের ইফতার, বিভাগের ইফতার কিংবা বিভিন্ন ক্লাবের আয়োজন—এসবের মাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়গুলো তার কাছে বিশেষ আনন্দের। ঈদের দিনটিও তার কাছে আলাদা অনুভূতির। তিনি বলেন, “ফজরের নামাজের পর ঈদের জামাতের প্রস্তুতি, নতুন পোশাক পরে ঈদগাহে যাওয়া, পরিবার-আত্মীয়দের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়, সালামি নেওয়া—এসব মুহূর্তই ঈদের আনন্দকে পূর্ণতা দেয়। পরে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, ঘুরে বেড়ানো এবং একসাথে সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে আমার দিনটি হয়ে ওঠে আরও আনন্দময়।”