ঈদুল ফিতর নিয়ে রাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের ভাবনা
উপলক্ষ্য যাই হোক না কেন, যান্ত্রিক জীবনের আবর্তে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে ছুটি শব্দের অর্থ হলো এক পশলা প্রশান্তির বৃষ্টি। যার মধ্যে অন্যতম একটা মধুর সময় দরজায় কড়া নাড়ছে আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন উপলক্ষ্যে। একাডেমিক ক্যালেন্ডারের কঠোর শাসন, অ্যাসাইনমেন্টের স্তূপ আর পরীক্ষার দুশ্চিন্তাকে ছুটি দিয়ে এই উৎসব যেন তাদের কাছে শিকড়ের টানে ফেরার এক পরম উপলক্ষ্য।
বিশেষ করে যারা উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে প্রিয়জন ছেড়ে দূরে অবস্থান করেন, তাদের কাছে ঈদের আনন্দ মানেই তপ্ত রোদে বা ভিড় ঠেলে বাড়িতে ফেরার সেই রোমাঞ্চকর ক্লান্তি। তবে সমসাময়িক বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদের সংজ্ঞা কেবল নতুন পোশাক বা রসনা বিলাসেই সীমাবদ্ধ নয়, এর গভীরে মিশে থাকে শৈশবের স্মৃতিচারণ, বর্তমানের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চিত কিন্তু উজ্জ্বল এক স্বপ্নের হাতছানি।
ঈদকে সামনে রেখে রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের এমনই কিছু অনুভূতির কথা তুলে ধরেছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী লাবিবা হাসিব জানান, `ঈদ অর্থই পরিবারের সবাই একসাথে হওয়া, অনেক অনেক গল্প, আড্ডা দেওয়া আর শপিং! চাঁদরাতে চাঁদ দেখার অপেক্ষা, ঈদের দিন সকালে সেমাই আর সালামি- সবকিছু ছোটবেলার কথা মনে করিয়ে দেয়।বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত জীবনের মাঝে এই ঈদের বহুপ্রত্যাশিত ছুটি আর পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়া ঈদের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আর প্রতিবেশীদের সুখ-দুঃখের ও ভাগীদার হওয়া, তাদের পাশে থাকা এগুলো তো ঈদের আরেকটি বিশেষ দিক।সবার ঈদ সুন্দর কাটুক। সবাইকে ঈদ মোবারক।'
অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক তাহিম বলেন, `রাবিপ্রবির প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে এটি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ঈদ। রমজানের শুরুতে ক্যাম্পাসে থেকে এবার একেবারে নতুন এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ক্যাম্পাসে থাকার সময় প্রায় প্রতিদিনই একেকটি ইফতার প্রোগ্রাম ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে যেমন ইফতার করেছি, তেমনি বড় ভাইদের স্নেহ ও আন্তরিকতায় তাদের সাথেও ইফতার করার সুযোগ পেয়েছি, যা আমার কাছে ভীষণ ভালো লেগেছে। এসব মুহূর্ত ক্যাম্পাসজীবনের প্রতি এক ধরনের মায়া তৈরি করেছে। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে পরিবারের অভাবটা প্রায়ই অনুভব করেছি। ঈদের ছুটিতে সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে বাবা-মা ও প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। সব মিলিয়ে এবারের ঈদ আমার জীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই ঈদ সবার জীবনে বয়ে আনুক শান্তি, সুখ ও নিরাপদে প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়ার আনন্দ।'
ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মশিউর রহমান জানান, `ঈদ আমাদের জীবনে এক টুকরো স্বস্তি নিয়ে আসে। ক্লাস, পরীক্ষা আর ক্যাম্পাস জীবনের চাপের মাঝে এই উৎসবটা যেন একটুখানি প্রশান্তি। আমাদের কাছে ঈদ মানে শুধু নতুন পোশাক বা আনন্দ নয়, বরং পরিবার, শেকড় আর আপন মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার এক গভীর টান। এই সময়টাতে বাড়ির খাবার, মায়ের স্নেহ, আর আপনজনদের হাসিমুখ, সবকিছুই নতুন করে প্রাণে সজীবতা এনে দেয়। ঈদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যত দূরেই থাকি না কেন, আমাদের আসল শক্তি আর শান্তি লুকিয়ে আছে নিজের আপন মানুষগুলোর খুশিতে।'
ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী মো মেহেদী হাসান জানান, `ঈদুল ফিতর শুধু একটি উৎসব নয়, এটি এক মাসের সিয়াম সাধনার পর শান্তি, তৃপ্তি ও আনন্দের এক বিশেষ মুহূর্ত। বছরের দীর্ঘ সময় জুড়ে ক্লাস, পরীক্ষা, এসাইনমেন্ট, টিউশন আর ব্যস্ততার চাপে নিজেকে যান্ত্রিক মনে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত জীবনে আমরা যেন ধীরে ধীরে নিজের শিকড় থেকে দূরে সরে যাই। কিন্তু ঈদের ছুটি যেন সেই চক্র ভেঙ্গে দেয় এবং আবার আমাদের টেনে নেই সেই আপন ঠিকানায়। ঈদের এই ছুটির সময়টাতে পরিবারের সাথে কিছু মুহূর্ত কাটানো, মা-বাবার সান্নিধ্য পাওয়া, পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা হওয়া, স্কুলের ব্যাচের ইফতার মাহফিল এবং ঈদের কেনাকাটা করা সবকিছু মিলিয়ে ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পায়। সবশেষে, এই আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি ঘরে আর সবার ঈদ কাটুক প্রিয়জনদের সাথে নিরাপদ ও ভালবাসায় ভরা পরিবেশে এবং সবার স্বপ্ন নিরাপদে বাড়ি ফিরুক সেই প্রত্যাশা রাখছি।'
ফিশারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্সেস টেকনোলোজি বিভাগের শিক্ষার্থী আনিকা বলেন, `ঈদ আমার কাছে ছোটবেলা থেকেই অনেক আনন্দের একটি দিন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হওয়ার পর এটাই আমার প্রথম ঈদ। প্রতিবছরের মতো এবারও পরিবারের সবার সঙ্গে ঈদ পালন করবো। এবারের ঈদে প্রথমবার নিজের টিউশনের জমানো টাকা দিয়ে পরিবারের জন্য কেনাকাটা করতে পেরে এক অন্যরকম আনন্দ অনুভব করছি। নতুন পোশাক, আম্মুর রান্না করা মজাদার খাবার আর সালামি দেয়া-নেয়া নিয়ে খুনসুটি সব মিলিয়ে দিনটি আমার অনেক খুশির সাথে কাটে। আমি সৌভাগ্যবান যে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও বাবা-মায়ের সাথে থাকতে পারছি, যদিও আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব দূর থেকে এসে এখানে থাকছে। এই ঈদে তাদের কথা খুব মনে পড়বে। সবাইকে ঈদ-উল-ফিতরের অনেক শুভেচ্ছা।'