১৮ মার্চ ২০২৬, ১৯:৩২

রমজানের সংযমে ঈদের আনন্দ: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও প্রত্যাশা

মোফাসেরুল হক তন্ময়, সাবিহা ইসলাম এষা, ফজলে রাব্বি (ওপরে বাম থেকে ডানে), মোহাম্মদ বিন সালাম, রুফাইদা জেরিন ও আরভিন আনাছ (নিচে বাম থেকে ডানে)  © টিডিসি সম্পাদিত

পবিত্র রমজান মাস আত্মশুদ্ধি, সংযম ও মানবিকতার এক অনন্য শিক্ষা নিয়ে আসে, যা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জীবনেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। ক্লাস, পরীক্ষা ও ব্যস্ততার মাঝেও রোজা রেখে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সময় ব্যবস্থাপনার চর্চা শিক্ষার্থীদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। এই মাসে তারা শুধু ধর্মীয় অনুশাসন পালনই করে না, বরং নিজেদের ভেতরের মানসিক ও নৈতিক উন্নয়ন ঘটানোরও চেষ্টা করে।

রমজানের শেষে আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর— যা আনন্দ, ভালোবাসা ও মিলনের এক মহোৎসব। দীর্ঘ এক মাসের ত্যাগ ও সংযমের পর এই দিনটি যেন এক বিশেষ পুরস্কার হিসেবে ধরা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ঈদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো পরিবারে ফিরে যাওয়া, প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং শৈশবের স্মৃতিগুলো আবার নতুন করে অনুভব করা। অন্যদিকে, যারা কোনো কারণে বাড়ি ফিরতে পারে না, তারা বন্ধুদের সঙ্গে মিলেই এই আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়, যা তাদের বন্ধনের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।

ঈদ শুধু ব্যক্তিগত আনন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের শেখায় সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। অনেক শিক্ষার্থীই এই সময়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, যাতে সবার জীবনে ঈদের আনন্দ পৌঁছে যায়। তবে সাম্প্রতিক কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংকট শিক্ষার্থীদের মনে কিছুটা উদ্বেগ সৃষ্টি করলেও তারা আশাবাদী— একটি স্থিতিশীল ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ফিরে আসবে। সব মিলিয়ে, রমজান ও ঈদ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জীবনে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং এটি আত্মউন্নয়ন, পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ঈদ ও রমজান
রমজান মাস আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সময়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য এই মাসটি শুধু রোজা রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিজেদের জীবনকে নতুনভাবে গুছিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ। ক্লাস, পরীক্ষা ও ব্যস্ততার মাঝেও রোজা রেখে ধৈর্য, সময় ব্যবস্থাপনা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা গ্রহণ করা এই সময়ের সবচেয়ে বড় অর্জন।
রমজানের শেষপ্রান্তে আসে পবিত্র ঈদ, যা নিয়ে আসে আনন্দ, ভালোবাসা ও মিলনের বার্তা। দীর্ঘ এক মাসের সংযম ও ত্যাগের পর ঈদ যেন এক অনন্য পুরস্কার। হল কিংবা মেসে থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে বাড়ি ফেরার আনন্দ, পরিবারের সঙ্গে ঈদের নামাজ আদায়, মায়ের হাতের রান্না—সব মিলিয়ে ঈদ হয়ে ওঠে হৃদয়ের গভীর আবেগের নাম।
আবার অনেকেই নানা কারণে পরিবারের কাছে যেতে পারে না; তবুও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিলেই তারা ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেয়। এই সময় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল নিজের আনন্দে নয়, বরং অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই নিহিত।
রমজান আমাদের যে সহমর্মিতা, ত্যাগ ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়, ঈদ সেই শিক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানায়। সকল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর জন্য শুভকামনা—এই রমজান ও ঈদ তাদের জীবনে আনুক শান্তি, সফলতা ও অনুপ্রেরণা। ঈদ মোবারক।

মোফাসেরুল হক তন্ময়
ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ,
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ঈদ: কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার প্রতিচ্ছবি
ঈদ-উল ফিতর আমার কাছে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার এক বিশেষ উপলক্ষ। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ আমাদের জীবনে আসে আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য এবং সংযমের এক সুন্দর বার্তা নিয়ে। এই সময়টি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আত্মসংযমের মাধ্যমে নিজেকে আরও মানবিক ও সহমর্মী করে তোলার গুরুত্ব।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ব্যস্ততা, ক্লাস, পরীক্ষা ও নানা কার্যক্রমের মাঝে ঈদ আমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার একটি মূল্যবান সুযোগ এনে দেয়। অনেক দিন পর বাবা-মা, ভাই-বোন ও আত্মীয়দের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানো এবং ছোট ছোট আনন্দ ভাগ করে নেওয়া— এসব মুহূর্ত ঈদের আনন্দকে আরও গভীর ও অর্থবহ করে তোলে। একই সঙ্গে বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও স্মৃতি ভাগ করে নেওয়াও এই উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে।

ঈদ আমাদের মানবিকতার কথাও মনে করিয়ে দেয়। এই দিনে আমরা চেষ্টা করি আশপাশের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে, যাতে তারাও ঈদের আনন্দে অংশ নিতে পারে। তাই আমার কাছে ঈদ মানে শুধু নতুন পোশাক বা উৎসবের আয়োজন নয়; বরং এটি সহমর্মিতা, কৃতজ্ঞতা এবং সামাজিক বন্ধনের এক উজ্জ্বল প্রতীক। এই মূল্যবোধগুলো যদি আমরা সারা বছর ধরে হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তবেই ঈদের প্রকৃত তাৎপর্য বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হবে।

সাবিহা ইসলাম এষা
সেশন: ২০২২–২৩
এগ্রিকালচার অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

শৈশবের আনন্দ থেকে দায়িত্ববোধে— ঈদের বদলে যাওয়া রূপ
ঈদ মানেই আনন্দ, ভালোবাসা আর মিলনের উৎসব। ছোটবেলায় ঈদের আনন্দটা ছিল একেবারেই আলাদা। ঈদের আগের রাতে চলত বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ফাটানো, ঘুরে বেড়ানো ও নতুন কাপড় লুকিয়ে রাখা— যেন কেউ দেখে না ফেলে। সকালে ঈদের নামাজে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, সবার বাসায় গিয়ে সেমাই আর মিষ্টি খাওয়া— এসব ছোট ছোট মুহূর্তেই ছিল ঈদের আসল আনন্দ। আর সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল সালামি পাওয়া। বড়দের সালাম করে যে কয়েকটা টাকা পেতাম, সেটাই তখন মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঈদ উদযাপনের ধরন কিছুটা বদলে গেছে। এখন ঈদ মানে শুধু নিজের আনন্দ নয়; বরং পরিবারের আনন্দ, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করা এবং সবার খোঁজ নেওয়া। ছোটবেলায় আমরা শুধু আনন্দ উপভোগ করতাম, আর এখন সেই আনন্দের সঙ্গে দায়িত্ব ও ভালোবাসার গভীরতাও অনুভব করি। আগে সালামি পেতাম, আর এখন পাওয়ার চেয়ে দেওয়ার রীতিটাই বেশি।

ঈদ আমার কাছে শুধু একটি দিনের উৎসব নয়; এটি আমাদের জীবনে ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং ঐক্যের একটি বার্তা নিয়ে আসে। আমরা যেন সবাই মিলে হাস্যোজ্জ্বল একটি দিন কাটাতে পারি এবং পরবর্তী দিনগুলোতেও সুখে ও শান্তিতে একসঙ্গে থাকতে পারি— এই কামনা করি।
এই ভালোবাসা আর আনন্দই হোক আমাদের ঈদের প্রকৃত পরিচয়।

ফজলে রাব্বি
নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্স অনুষদ
সেশন: ২০২০–২১

ঈদ: ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও আনন্দের মহোৎসব
মুসলমানদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হলো ঈদ-উল ফিতর। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে দিনটি উদযাপিত হয়। পড়ালেখা বা কাজের প্রয়োজনে আমাদের অনেকেই পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব থেকে দূরে থাকি। ফলে ঈদের দিনটি কেবল আনন্দের উৎসব নয়; বরং প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার এক বড় উপলক্ষ।

ঈদের দিন সকালে ধনী-গরিব সবাই নিজেদের সাধ্যমতো নতুন পোশাক পরে এক কাতারে ঈদের সালাত আদায় করে। এরপর শুরু হয় পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় ও আনন্দ ভাগাভাগি। এদিন সেমাই, পায়েস, জর্দা, বিরিয়ানির মতো বিভিন্ন বাহারি খাবারের আয়োজন করা হয়। ছোটরা বড়দের কাছ থেকে সালামি পায়, আত্মীয়-স্বজনরা একে অপরের বাসায় যায়। ধনীরা জাকাত ও ফিতরা প্রদান করে। এসব কিছু আমাদের ভ্রাতৃত্ব, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার বন্ধনকে আরও মজবুত করে তোলে। ঈদের এই আনন্দ আমাদের সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। সবাইকে ঈদ মোবারক।

মোহাম্মদ বিন সালাম
ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

উদ্বেগের মাঝেও শান্তিপূর্ণ ক্যাম্পাস ও ঈদের প্রত্যাশা
ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব, যা আমাদের জীবনে আনন্দ, সম্প্রীতি ও নতুন আশার বার্তা নিয়ে আসে। একজন পবিপ্রবি শিক্ষার্থী হিসেবে ঈদকে ঘিরে আমার অনুভূতি সবসময়ই গভীর ও বিশেষ। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির পাশাপাশি প্রিয় ক্যাম্পাস ও বন্ধুদের সঙ্গে এই উৎসবের স্মৃতিও আমাদের শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে সাম্প্রতিক সময়ের ডিগ্রি নিয়ে চলমান অস্থিরতা আমাদের মনে কিছুটা উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। একটি শান্ত, স্থিতিশীল ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ছাড়া উৎসবের আনন্দও পুরোপুরি অনুভব করা যায় না। তাই আমরা আশা করি, খুব দ্রুত এই পরিস্থিতির সমাধান হবে এবং সবার মাঝে স্বস্তি ফিরে আসবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আমার আন্তরিক অনুরোধ— চলমান সমস্যাগুলোর দ্রুত ও কার্যকর সমাধান করে পবিপ্রবি বরিশাল ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক, যাতে ঈদের আনন্দ আরও অর্থবহ ও পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। পবিত্র ঈদের এই আনন্দঘন মুহূর্তে সবার প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ঈদ সবার জীবনে বয়ে আনুক শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি ও অফুরন্ত কল্যাণ।

রুফাইদা জেরিন
লেভেল ৩, সেমিস্টার ২
এএনএসভিএম অনুষদ, পবিপ্রবি

ঈদ: সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করার আহ্বান
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আমি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ঈদ মোবারক। ঈদ আমাদের মাঝে নিয়ে আসে আনন্দ, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা। এই পবিত্র দিনে সবাই যেন পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বন্ধনে আবদ্ধ হই— এই প্রত্যাশা করি। ঈদের আনন্দ সবার জীবনে বয়ে আনুক শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধি। সবাইকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা।

আরভিন আনাছ
ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়