ঈদ সীমান্তের বাইরে গিয়েও আমাদের এক করে দেয়
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সফিউল্লাহ খান। ভারতের লখনউ থেকে এসে হাবিপ্রবিতে এগ্রিকালচারে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ ফিজিওলজি অ্যান্ড ইকোলজি বিভাগে মাস্টার্স করছেন। গবেষণার কাজে এ বছর দেশে না ফিরে ক্যাম্পাসেই ঈদ উদযাপন করছেন।
বাংলাদেশে পাওয়া মানুষের আন্তরিকতা, ঈদ উদযাপনের অভিজ্ঞতা নিয়ে সফিউল্লাহ খান কথা বলেছেন ডেইলি ক্যাম্পাস এর সাথে। একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে এ বছর বাংলাদেশে ঈদ উদযাপন করতে কেমন লাগছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিবার থেকে দূরে থাকলেও ঈদ উদযাপন করতে পারছি। ভারতে ফিরে গেলে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হতো, তাই ক্যাম্পাসেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, এটি এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি—উত্তর প্রদেশে পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ মিস করি। কিন্তু এখানে বন্ধুদের সঙ্গে উৎসব উদযাপনও আলাদা আনন্দ দেয়। বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন আমাকে আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক মিলও উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
ভারতে নিজ শহরে সাধারণত ঈদ কীভাবে উদযাপন করা হয়, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার শহরে ঈদ মানেই পরিবার ও একসঙ্গে থাকার আনন্দ। ফজরের নামাজ দিয়ে দিন শুরু করি, এরপর সবাই নতুন পোশাক পরে। নামাজ শেষে সবাই আলিঙ্গন করে শুভেচ্ছা বিনিময় করে এবং ঘরে ফিরে সকালের খাবার খায়।
তিনি বলেন, সাধারণত প্রথমে সেমাই, সঙ্গে মাটন বিরিয়ানি, কাবাব বা নিহারি থাকে। দিনভর আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়া-আসা, ছোটদের ঈদি পাওয়া, আর সন্ধ্যায় পারিবারিক আড্ডা সবই পারিবারিক ভালোবাসায় ভরা।
এ বছর ক্যাম্পাসে ঈদের দিনটি কীভাবে কাটানোর পরিকল্পনা করেছেন, এ বিষয়ে সফিউল্লাহ খান বলেন, ‘ক্যাম্পাসে আমার পরিকল্পনা সহজ কিন্তু আন্তরিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করব, এরপর বন্ধুদের সঙ্গে উদযাপন করব। সম্ভব হলে কিছু বন্ধুর বাসায় গিয়ে সময় কাটাব। বাংলাদেশে ঈদের ঐতিহ্য দেখতে এবং নতুন সাংস্কৃতিক পরিবেশে উৎসব উপভোগ করার জন্য আমি আগ্রহী।’
ঈদের দিনে পরিবারের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ রাখবেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভিডিও কল হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দিনের বিভিন্ন সময়ে ছোট কল এবং সন্ধ্যায় দীর্ঘ আড্ডা হবে। আমরা একে অপরকে ছবি পাঠাই—কে কী খাচ্ছে বা কী পোশাক পরেছে। এভাবেই দূরে থেকেও পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করি।
সফিউল্লাহ খান বলেন, সবচেয়ে বেশি মিস করব বাবা-মা, ভাইবোন এবং আত্মীয়দের উপস্থিতি। নামাজের পর আলিঙ্গন, মায়ের রান্না—বিশেষ করে সেমাই ও বিরিয়ানি সবই মনে পড়বে। ছোটদের ঈদি পাওয়ার জন্য দৌড়াদৌড়ি, আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া এসব আনন্দের মুহূর্ত। এখানে শান্তিপূর্ণ হলেও সেই প্রাণবন্ত পারিবারিক পরিবেশ নেই।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঈদ উদযাপনের পার্থক্য কী মনে হয়েছে? এ প্রসঙ্গে সফিউল্লাহ খান বলেন, উভয় দেশে ঈদের মূল চেতনা একই—নামাজ, কৃতজ্ঞতা, দান-সদকা এবং আনন্দ ভাগাভাগি। তবে ভারতে উদযাপন সাধারণত পারিবারিক, আর বাংলাদেশ এ এটি বেশি কমিউনিটি-ভিত্তিক। খাবার ও কিছু ঐতিহ্যেও পার্থক্য আছে।
আপনার শহরের বিশেষ কোনো ঈদের খাবার বা ঐতিহ্য কি মিস করবেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমার মা যে মাটন বিরিয়ানি এবং সেমাই বানান, তা মিস করব। বিশেষভাবে এলাচ, শুকনো ফল এবং দুধ দিয়ে ঘনভাবে বানানো হয়। মায়ের ভালোবাসায় তৈরি সেই স্বাদ অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।’
আগে কি কখনো ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করেছেন? জানতে চাইলে সফিউল্লাহ খান বলেন, ‘হ্যাঁ, বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের সঙ্গে উদযাপন করেছি। গল্প শোনা, খাবার ভাগাভাগি, বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে মিলন—এগুলো সবসময় সমৃদ্ধি দেয়। গত ঈদে বাংলাদেশের, আফ্রিকার, নেপালের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উদযাপন করেছি। এটি দেখায় ঈদ আমাদের সীমান্ত ছাড়িয়ে একত্রিত করে।’
আরও পড়ুন: স্বপ্নপূরণে ঈদে বাড়ি ফিরছেন না বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী
বাংলাদেশে সবচেয়ে আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে উৎসবগুলো কতটা সামাজিকভাবে উদযাপন করা হয়, তা দেখাটা মজার। পুরো পাড়া একে অপরের সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেয়। নতুন পোশাক, চাঁদ রাতের কেনাকাটা, পিঠা ও সেমাই—সবই প্রাণবন্ত। বাঙালিদের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা অনেকটা ভারতের মতোই মনে হয়েছে।’
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে ঈদের মতো উৎসব কতটা সাহায্য করে, এমন প্রশ্নে সফিউল্লাহ খান বলেন, ‘নিশ্চয়ই সাহায্য করে। একসঙ্গে নামাজ পড়া, রান্না করা, খাবার ভাগ করা সব মুহূর্ত বন্ধুত্বের সেতু তৈরি করে। তখন আমরা শুধু ভারতীয় বা বাংলাদেশি হিসেবে নয়, নতুন দেশে একে অপরের পরিবারের মতো হয়ে যাই। এটি হোমসিকনেস কমায় এবং স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি করে।’
যারা ঈদের সময় ক্যাম্পাসে থাকে, তাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের থেকে কী ধরনের সহযোগিতা আশা করেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিষয়ক দপ্তর উদযাপনের আয়োজন করে, শিক্ষকরা হলে এসে আমাদের সঙ্গে সময় কাটান এবং খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়। এ ধরনের সহযোগিতা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ঈদকে আরও আনন্দময় করে তোলে।’
ঈদ উপলক্ষে বিশেষ বার্তায় সফিউল্লাহ খান বলেন, ‘বাংলাদেশে এসে সবার কাছ থেকে যে আন্তরিকতা পেয়েছি, তা আমাকে মনে করিয়ে দেয় ঈদ আসলে সীমান্তের বাইরে গিয়েও আমাদের এক করে দেয়। ক্যাম্পাসে থাকা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, বাংলাদেশি ভাই-বোন ও শিক্ষক সবাইকে জানাই ঈদ মোবারক। আল্লাহ আমাদের সবার জীবনে শান্তি, আনন্দ ও অসংখ্য বরকত দান করুন।