১৮ মার্চ ২০২৬, ১১:৫৭

ক্যাম্পাসের হলে রোজা পালন, মায়ের কাছে ফেরা-ই যেন স্বস্তি

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়  © সংগৃহীত

পবিত্র রমজান মাসে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) যেন অন্য এক রূপে ধরা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক চাপ, পড়াশোনার মধ্যে আবাসিক হলগুলোতে থেকে ইবাদত ও দৈনন্দিন জীবনযাপন করা অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠে। সাহরি ও ইফতারের সীমাবদ্ধতা, খাবারের মান ও সময়ের অসামঞ্জস্যতা এর মধ্যে আবার বিভিন্ন পরীক্ষা পাশাপাশি পরিবারের সান্নিধ্যের অভাব- সব মিলিয়ে একধরনের অস্বস্তি কাজ করে এখানকার শিক্ষার্থীদের মাঝে।

এমন বাস্তবতায় অনেক শিক্ষার্থী রমজানের প্রায় মাঝামাঝি সময় থেকেই বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন। যারা যেতে পারেননি সরকারি আদেশ জারি হবার পর থেকে তাদের মধ্যেও দ্রুত বাসায় ফেরার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, বাসায় থেকে রমজান পালন করা অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক ও মানসিকভাবে প্রশান্তিদায়ক। পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে ইফতার করা, সাহরিতে পছন্দের খাবার পাওয়া, হলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় খাবার নিয়ে, পুষ্টিকর খাবারের অভাব মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং ধর্মীয় পরিবেশে সময় কাটানো এসবই তাদের কাছে বাড়তি আনন্দ যোগ করে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই অবস্থায় পরিবারের কাছেই ফেরাই একমাত্র স্বস্তি।

ফজিলাতুন্নেছা জোহা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী নুসরাত মিম বলেন, রমজানে হল ও বাসার অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। হলে থাকতে হলে পড়াশোনা, ক্লাস ও পরীক্ষার ব্যস্ততার মাঝেই নিজের ইফতার–সাহরি নিজেকেই ম্যানেজ করতে হয়। অনেক সময় বাইরে থেকে কিনে বা নিজের বানানো খাবার খেতে হয়, যেগুলোতে সেই স্বাদ বা তৃপ্তি থাকে না- অনেকটা প্রয়োজনের তাগিদেই খাওয়া। সব কাজ নিজে করতে হওয়ায় বিশ্রামের সুযোগও কম থাকে। রুমমেটদের সঙ্গে ইফতার করলেও পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়ার যে আনন্দ, সেটার ঘাটতি অনুভূত হয়।

তিনি আরও জানান, সাহরিতে প্রায়ই ঠান্ডা খাবার খেতে হয়, আর হলের একঘেয়ে খাবার ও প্রোটিনের ঘাটতিও একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তার ওপর পানি বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য লাইনে দাঁড়ানোর ঝামেলাও থাকে। অন্যদিকে, বাসায় রমজান অনেকটাই স্বস্তির। ইফতার ও সাহরিতে গরম, পছন্দের খাবার সহজেই পাওয়া যায়, বিশেষ করে মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ আলাদা আনন্দ দেয়। প্রতিদিন খাবারে ভিন্নতা থাকে, কোনো লাইনে দাঁড়ানোর ঝামেলা বা খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকে না। সবচেয়ে বড় বিষয়, পরিবারের সঙ্গে একসাথে ইফতার করার আনন্দ রোজার অনুভূতিকে আরও পূর্ণ করে তোলে। সব মিলিয়ে হলে রমজান মানে নিজ দায়িত্বে টিকে থাকা, আর বাসায় রমজান মানে স্বস্তি, তৃপ্তি ও পরিবারের উষ্ণতা।

ফজিলাতুন্নেছা জোহা হলের শিক্ষার্থী মার্জিয়া সাদেক মেহুলী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের রমজান আর নিজের বাসার রমজান দুটির অভিজ্ঞতা একদমই ভিন্ন। হলের জীবনে প্রথম রমজান মাস পাওয়া ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। এখানে সিনিয়র-জুনিয়র ও ব্যাচমেটদের সাথে একসাথে ইফতার করার আনন্দটা সত্যিই অন্যরকম। সবাই মিলে বসে ইফতার করা, হাসি আড্ডা এসব মুহূর্তগুলো মনে রাখার মতো। 

তবে বাসার রমজানের আমেজ একেবারেই আলাদা। বাসায় মায়ের হাতে রান্না, পরিবারের সবাই মিলে সেহরি ও ইফতার করার যে অনুভূতি তা হল জীবনে পাওয়া যায় না। বাসায় সবকিছু নিজে থেকে গুছিয়ে করতে হয় না, মা নিজেই সব যত্ন করে করেন। হলের জীবনে সেই মায়ের যত্নটা খুব বেশি করে মিস করা হয়। আবার হলে বেশিরভাগ সময় বাইরের খাবার কিনে খেতে হয়, যা বাসার খাবারের মতো তৃপ্তি দেয় না। সব মিলিয়ে, হলের রমজান স্বাধীনতা ও বন্ধুত্বের স্মৃতি তৈরি করে, আর বাসার রমজান ভালোবাসা ও আপনজনদের উষ্ণতায় ভরপুর থাকে।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হলের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান উর্মি বলেন, বাসায় রমজান সবসময়ই আনন্দের। বিশেষ ব্যাপার হচ্ছে মায়ের হাতের সুস্বাদু রান্না যা হলে পাওয়া সম্ভব না।হলে ইফতারি করতে হয় সাধারণ ভাত,সবজি,মাছ, মাংস দিয়ে। মনমতো ইফতারি করতে হলে বাইরে থেকে কিনে খেতে হয়। আবার বাসায় পরিবারের সবাই মিলে ইফতারি করা হয় যা আনন্দের। হলে কিছু শিক্ষার্থী ডাইনিং এ ইফতার করে,কেউ নিজে রান্না করে খাই। ফলে তেমন আনন্দ থাকে না। একইসাথে রমজানে পড়াশোনা করা কষ্টকর। বাসায় থাকলে নিজের খাবারের কোনো চিন্তা থাকে না,মা বাবা সবকিছু প্রস্তুত রাখেন, এতে পড়াশোনা করতে সুবিধা হয়।কিন্তু হলে যদি খাবারের মিল না নিতে পারি তাহলে চিন্তা করতে হয়,বাইরে থেকে কিনে খেতে হয় নয়তো রান্না করে নিতে হয়।এজন্য পড়াশোনা করা কষ্টকর হয়। বাসায় সবকিছুর সুবিধা তো আছেই। হলে তেমন সুবিধা না থাকলেও খরচ কম হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী এভাবেই মানিয়ে নেয়।'

জননেতা আব্দুল মান্নান হলের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান ফুয়াদ বলেন, পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করে স্বপ্ন পূরণের আশায় বাসা ছাড়লাম, শুরুতে সবকিছুই অনেক মুক্তসাধীন লাগলেও রমজান মাস আসলে বুঝা যায় কতটা বড় স্যাক্রিফাইস করেছি। পরিবার থেকে দূরে থেকে এই সময়ে আসলে কিছুই ভালো লাগে না। মায়ের হাতের ইফতার, পরিবারের সবার সাথে মিলে সেহেরি, এলাকার বন্ধুরা মিলে তারাবির পর আড্ডা সবকিছুই মনে করিয়ে দেয় বাসা থেকে এতো দূরে এসে ভার্সিটির হলে থাকার বাস্তবতা।

তিনি আরও বলেন, এখন মনে হতে পারে তাহলে হলে থাকলে শুধু খারাপ লাগাই কাজ করে? এতো কিছুর পরও হলে থাকার কিছু ভালো লাগা আমার আছে। প্রায় প্রতিদিনই ইফতার পার্টি প্রতিটা হলকে করে রাখে উৎসব মুখর। সিনিয়র জুনিয়রদের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকায় প্রতিদিনই বলতে গেলে ইফতারের দাওয়াত থাকবেই। কখনো বন্ধুরা কখনো সিনিয়র জুনিয়র মিলে একসাথে রুমে বসে মুরিমাখা খাওয়া আর রাতে হলের সামনে ক্রিকেট খেলাতো আছেই। সবকিছুই এই রমজান মাসে পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্টটা কিছুটা হলেও ভুলে থাকতে দেয়।'