১৬ দিনের ছুটিতে মাভাবিপ্রবি, নাড়ির টানে বাড়ি ছুটছেন শিক্ষার্থীরা
জ্বালানি সংকটের কারণে জরুরি ভিত্তিতে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (মাভাবিপ্রবি) বন্ধ ঘোষণা হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ১৬ দিনের ছুটিতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন। ৯ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত স্থগিত হওয়া একাডেমিক কার্যক্রম ও সেমিস্টার পরীক্ষার কারণে ক্যাম্পাস ছেড়ে ছাত্রছাত্রীরা পরিবার ও গ্রামীণ জীবনের কাছাকাছি পৌঁছানোর আনন্দে তাড়িত।
গত ৮ মার্চ (রবিবার) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক অফিস আদেশে বিশ্ববিদ্যালয়টি জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
অফিস আদেশে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশনার আলোকে ৯ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম, অফিস, ক্লাস ও চলমান সেমিস্টার পরীক্ষা বন্ধ থাকবে। তবে এ সময়ের মধ্যে আবাসিক শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো খোলা থাকবে বলে জানিয়েছেন হল কর্তৃপক্ষ।
স্থগিত হওয়া সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. মোস্তফা রহমান জানান, ৯ মার্চ থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত সব পরীক্ষা স্থগিত এবং বাদ বাকি পরীক্ষাগুলো ইদের ছুটি শেষে অনুষ্ঠিত হবে, পরীক্ষার তারিখ পরবর্তীতে জানিয়ে দেওয়া হবে।
এ অবস্থায় বিভিন্ন বিভাগের চলমান সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র চাপ, হতাশা ও চরম অসন্তোষ দেখা দেয়। তবে রমজানে দ্রুত বাড়ি ফেরার বিষয়টি সুনিশ্চিত হওয়ায় অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
বন্ধ ঘোষণার পর গত ৯ মার্চ (সোমবার) থেকেই শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করতে দেখা যায়। তবে আজ থেকে ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে চলমান বাস সময়সূচীগুলোতে ব্যাগ হাতে শিক্ষার্থীদের হিড়িক পড়তে দেখা গেছে। দীর্ঘ জাকজমকহীন ও পরিবারবিহীন রমজান পালন করার পরে সবাই নিজ নিজ গন্তব্যে নাড়ির টানে বাড়িতে ফিরছেন।
বাড়ির পথে ছুটে চলা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বাড়ি ফেরার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের ২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী আফিফ বিন সায়েদ বলেন, ‘ঈদে বাড়ি যাওয়া মানে স্রেফ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়; এটি হলো স্মৃতির আঙিনায় ফিরে আসা। নাগরিক জীবনের ইট-পাথরের ক্লান্তি পেছনে ফেলে আমরা যখন গ্রামের ধুলোমাখা পথে দাঁড়াই, তখন প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাই। পরিবেরর অকৃত্রিম ভালোবাসার সান্নিধ্য আমাদের সবটুকু অবসাদ ধুয়ে দেয়। হারানো শৈশবকে বন্ধুদের আড্ডায় খুঁজে পাওয়া আর পরিবারের সঙ্গে ঈদের চাঁদ দেখার যে আনন্দ, তা অন্য কোনো উপায়েই সম্ভব নয়। পরীক্ষা শেষে তাই বাড়ি ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে খুবই খুশি।’
অর্থনীতি বিভাগের ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী মনজিলা আকতার বলেন, ‘দীর্ঘদিন অতিবাহিত করার পর বাড়ি ফিরে যাওয়ার যে সুপ্ত অনুভূতি, সেটা প্রকাশ করার মতো সুন্দরতম ভাষা আমার জানা নেই। গ্ৰামের প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা আমিটা যখন এই কোলাহল পরিবেশে এসে হঠাৎ থমকে যাই, সবকিছু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। পড়ন্ত বিকেলে মনে পরে যায় বাড়ি ফেরার সেই চিরচেনা পথগুলো। সেই পুরোনো ঘর, রাস্তার ধারের প্রতিটা গাছ যেন বলে ওঠে আমি তোমার অপেক্ষায় ছিলাম। ছুটিতে বাড়ি ফেরার কথা মনে ভাসলেই মনটা প্রফুল্ল হয়ে ওঠে, ঠিক তার বিপরীতে সীমিত সময় শেষ করে ইট পাথরের শহরে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবলেই মন বিষাদে ভরে ওঠে। এতো বিষাদের মধ্যে ও শেষ সময়ে বলতে ইচ্ছা করে আমি আবার আসিব ফিরে তোমার টানে।’
ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী রেজভী খান বলেন, ‘ঈদ মানেই আনন্দ আর সেই আনন্দের পূর্ণতা প্রিয় মানুষদের সান্নিধ্যে। পরীক্ষা আর ক্যাম্পাসের যান্ত্রিক ব্যস্ততা পেছনে ফেলে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরে মায়ের হাতের রান্না ও প্রিয়জনদের হাসিমুখের যে তৃপ্তি, তা শব্দে বোঝানো কঠিন। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে এই আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগই ঈদকে সার্থক করে তোলে। সবার যাত্রা নিরাপদ হোক এবং ইদ বয়ে আনুক অনাবিল প্রশান্তি। ইদ মোবারক!’
একই বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী নসিবুর রহমান বলেন, ‘ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে শহরে কর্মরত, অধ্যয়নরত অসংখ্য মানুষ পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যায়। সরকারি নানান উদ্যোগে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ কমাতে যাতায়াত ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল করা, ভাড়ায় বিশেষ ছাড় এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিভাগীয় বাস সার্ভিস চালু করা প্রয়োজন।’
বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী আরজিনা আক্তার নিপা বলেন, ‘পরিবার ছেড়ে ক্যাম্পাস লাইফে রমজান কাটানোর একাকিত্ব ও আম্মার হাতের রান্নার অভাববোধ করেছি, হলের বন্ধুদের সঙ্গে মিলেমিশে ইফতার-সাহরি ভাগাভাগি করার নতুন আনন্দ আর ব্যস্ততার মধ্যে নিজেকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার এক মিশ্র অনুভূতি শেষে এখন বাড়ির পথে হাঁটছি। মনে বেশ আনন্দ হচ্ছে।’
অর্থনীতি বিভাগের ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী নিশাত সালসাবিল বলেন, ‘মুসলিমদের জন্য এই মাসটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মাহে রমজানে মনটা অন্যরকম ভালো লাগায় ভরে যায়। ইবাদতেও শান্তি পাই, ভেতরটা যেন আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। যদিও বা সেমিস্টার ফাইনালের জন্য এত দিন বেশ চাপ অনুভুত হয়েছে। অন্যদিকে খুব তাড়াতাড়ি বাসায় যাওয়ার আনন্দও কাজ করছে। ঈদ তো সামনেই… সব মিলিয়ে মনটা এখন অন্য রকম এক অনুভূতিতে ভরা।’
উল্লেখ্য, এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়টির অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টির সব কার্যক্রম ১২ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করার কথা থাকলেও সরকারের জরুরি আদেশে ৯ মার্চ থেকেই বন্ধ ঘোষণা করা হয় (২৪ মার্চ পর্যন্ত)।