০৭ মার্চ ২০২৬, ১৭:৫৩

নোবিপ্রবির সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

নোবিপ্রবির সহকারী অধ্যাপক নাজমুস সাকিব খানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।  © টিডিসি সম্পাদিত

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক নাজমুস সাকিব খানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বিভাগের একাধিক আর্থিক অসঙ্গতির কারণে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ ও ফিল্ড ট্যুর সংক্রান্ত অর্থ নিয়ে জটিলতায় বিভাগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তবে এসব অভিযোগকে হয়রানিমূলক আখ্যা দিয়েছেন অভিযুক্ত শিক্ষক। কোনো পাওনা থাকলে সেটি পরিশোধ করবেন বলেও জানান তিনি।

বিভাগীয় সূত্রে জানা যায়, বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী প্রশাসনের সময় বিভাগীয় চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সহকারী অধ্যাপক নাজমুস সাকিব খানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন খাতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মডারেশনের বিলসহ বিভাগের একাধিক পাওনা তিনি এখনো পরিশোধ করেননি। ফলে শিক্ষকরা ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করে পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানা গেছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক এই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বরাবর অভিযোগত্র দেয় বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর উপাচার্য বরাবর সহকারী অধ্যাপক নাজমুস সাকিবের তদন্ত পূর্বক শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে ১১টি লিপিবদ্ধ অভিযোগ দাখিল করে এবং ৫ কার্যদিবসের মধ্যে দূশ্যমান তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়। তার প্রেক্ষিতে ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. হানিফ মুরাদকে আহ্বায়ক ও ড. আবিদুর রহমানকে সদস্য সচিব করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

নম্বর টেম্পারিং এর অভিযোগের সত্যতা নিরুপনের জন্য একই বছরের ৪ নভেম্বর নোবিপ্রবি উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজওয়ানুল হককে আহ্বায়ক এবং বিজ্ঞান অনুষদের তৎকালীন ডিন ড. আতিকুর রহমান ভুঁইয়া ও পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমকে সদস্য করে পৃথক আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং ৭ কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে অনুরোধ জানানো হয়। 

কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও উভয় কমিটির এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি বলে জানা যায়। এতে করে স্থবির হয়ে পড়ে বিভাগের কার্যক্রম। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগটির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ ও ফিল্ড ট্যুর সংক্রান্ত অর্থ নিয়ে স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আর্থিক বিষয়টি সমন্বয়ের জন্য গত ১ মার্চ অধ্যাপক ড. মো: মহিনুজ্জামনকে আহ্বায়ক করে নতুন আরেকটি কমিটি গঠন করেছে এবং আগামী ৯ মার্চের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

একজন শিক্ষককে নিয়ে পরপর তিনটি কমিটি গঠন করেও অভিযোগসমূহের সুষ্ঠু সমাধান না করতে পারায় জন্ম দিয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী জানান, “নাজমুস সাকিব স্যারের বিরুদ্ধে মার্ক টেম্পারিং, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ব্যতীত অযাচিত মার্ক প্রদান, বিভাগের অর্থ জালিয়াতিসহ সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগ করা হয়। উনার কারণে বর্তমানে আমাদের সেমিস্টার পরীক্ষা যথাসময়ে হচ্ছে না, যা আমাদের একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে। এমনকি উনার অর্থ জালিয়তির কারনে আমাদের ৪র্থ বর্ষের ১ম সেমিস্টারের (৪/১) ফিল্ড ট্যুরে বিভাগ থেকে আমাদের পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তৎকালীন সময়ে দুটি আলাদা আলাদা তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও এখনো কোনো বিচার হয়নি।"

এ বিষয়ে বর্তমান বিভাগীয় চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. গোলাম মোস্তফা বলেন, “বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান নাজমুস সাকিবকে বারবার চিঠি দেওয়ার পরও পরীক্ষা আয়োজন সংক্রান্ত কোন বিল পরিশোধ করেনি। এতে বিভাগে নতুন করে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিভাগের নিজস্ব একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী অন্তত ৩টি ব্যাচের (৫-৩, ৫-১ এবং ২-১) চলমান সেমিস্টার পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার টার্গেট থাকলেও দূভাগ্যবশতঃ শেষ করা যাচ্ছে না। বিগত প্রশাসনের সময় অর্থের অসঙ্গতির অভিযোগ দেখিয়ে বিল আটকে রাখা হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এখনো কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।”

এছাড়াও একটি চেকের টাকা জালিয়াতির কথা উল্লেখ করে গোলাম মোস্তফা বলেন, দায়িত্ব ছাড়ার সময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক অবৈধভাবে একটি চেকের মাধ্যমে দেড় লাখ টাকা বিভাগীয় একাউন্ট থেকে উত্তোলন করেন। যা বারংবার চিঠি, ই-মেইল কিংবা ফোনে যোগাযোগ করা হলেও এখনো সুরাহা করা হয়নি। এছাড়া তার সময়ে বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ফিল্ড ট্যুরের অর্থ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। হিসাব বহির্ভূত আরও কিছু আর্থিক অসঙ্গতি রয়েছে বলেও জানান তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সহাকারী অধ্যাপক নাজমুস সাকিব বলেন, “আমার বিরুদ্ধে ২০১৮-১৯, ১৯-২০, ২০-২১, ২১-২২, ২৩-২৪ সহ কয়েকটি শিক্ষাবর্ষের আর্থিক বিষয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ আমি চেয়ারম্যান ছিলাম শুধু মাত্র দুটি শিক্ষাবর্ষে। ওই সময়ে ড. গোলাম মোস্তফা, ড. আব্দুল মোমিন সিদ্দিকী এবং অধ্যাপক আনিসুজ্জামান রিমন চেয়ারম্যান ছিলেন কিন্তু তাদের হিসাব সমূহ সমন্বয় না করে শুধু আমার কারণেই এসব হিসাব আটকে আছে বলে দোষারোপ করা হচ্ছে। আমি বলেছি এসব হিসাব যথাযথভাবে সমন্বয়ের পর কোন টাকা পাওনা হলে আমার বেতন থেকে কেটে নিক তাও বিভাগের কাজ যেন আটকে না থাকে।"

এছাড়াও দেড় লক্ষ টাকার চেকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকের মতামতের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ইন্সট্রুমেন্ট কেনার জন্য দেড় লক্ষ টাকার একটি চেক তুলেছিলাম। আমি বর্তমান চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা স্যারকে বিষয়টি জানালেও তিনি বলেন ডিপার্টমেন্টে নাকি কোন কিছুই নেই। আমি তাও বলেছি, যদি কোন টাকা আমার থেকে পাওনা থাকে তাহলে আমি বিভাগে এসে কাগজপত্র দেখে আমার থেকে পাওনা হলে সেটা পরিশোধ করে দিব। কিন্তু এভাবে কোনকিছু না শুনেই হয়রানিমূলক আচরণ করার কোন মানেই হয় না।"

এ বিষয়ে গঠিত সর্বশেষ তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো: মহিনুজ্জামান জানান, শুধুমাত্র আর্থিক বিষয়টি সমন্বয় করার জন্য এই কমিটি গঠিত হয়েছে। আমরা আগামী রবিবার এ নিয়ে বসে সিদ্ধান্ত জানাবো। এর আগের তদন্ত কমিটিগুলো কোনো রিপোর্ট দিয়েছে কিনা সে বিষয়ে আমি সঠিক বলতে পারবো না। 

আর্থিক অসঙ্গতি ও অন্যান্য বিষয়ে জানতে চাইলে নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাঈল বলেন, নাজমুস সাকিব খানের বিরুদ্ধে আর্থিক অসঙ্গতি অভিযোগ আসলে আমরা একটি ৩ সদস্যদের কমিটি করে দেই। কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।