প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে এক উপজেলায় ৫২ জনে মুসলমান মাত্র তিনজন—স্থানীয়রা যা বলছেন
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলায় হিন্দু-মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় সমান সমান হলেও নিয়োগপ্রাপ্ত ৫২ জনের মধ্যে ৪৯ জনই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। মুসলিম প্রার্থী নিয়োগ পেয়েছেন মাত্র ৩ জন। তবে স্থানীয়রা বলছেন, ওই অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার হার খুবই কম। এ ছাড়া পড়াশোনায় আগ্রহেরও যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহন লাল দাস স্বাক্ষরিত নিয়োগপত্রে এই চিত্র দেখা গেছে। এই নিয়োগপত্রে থাকা তালিকার মধ্যে মুসলমান প্রার্থী রয়েছেন তিনজন। তারা হলেন— সাখাওয়াত হোসেন, সাজ্জাদুর রহমান, আইদুল মিয়া। বাকি ৪৮ জনই হিন্দু ধর্মাবলম্বী।
তালিকা যাচাই করে দেখা গেছে, ৫২ জনের মধ্যে ডাকঘর অনুযায়ী কাদিরগঞ্জে ১০ জন, পাহাড়পুরে ১৩ জন, ঘুঙ্গিয়ারগাঁওয়ে ১০ জন, ব্রজেন্দ্রগঞ্জে ৫ জন, আনন্দপুরে ৬ জন, শ্রীহাইলে ৬ জন, শাল্লায় একজন রয়েছেন। এ নিয়ে ৫১ জন হয়। অপরজনের ঠিকানায় হবিগঞ্জের আজমিরিগঞ্জকে ডাকঘর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ডাকঘরের সবচেয়ে নিকটবর্তী ইউনিয়ন শাল্লা।
তথ্য বলছে, শাল্লা উপজেলার কাদিরগঞ্জ ও আনন্দপুর হবিবপুর ইউনিয়নে, পাহাড়পুর বাহাড়া ইউনিয়নে, শাল্লা ও ঘুঙ্গিয়ারগাঁও শাল্লা সদর ইউনিয়নে এবং ব্রজেন্দ্রগঞ্জ ও শ্রীহাইল আটগাঁও ইউনিয়নে অবস্থিত। এ হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে হবিবপুরের ১৬, বাহাড়ার ১৩, শাল্লা সদরের ১১ এবং আটগাঁও ইউনিয়নের ১১ জন রয়েছেন। নিয়োগ পাওয়া তিন মুসলমান প্রার্থীর মধ্যে দুইজন ব্রজেন্দ্রগঞ্জ এবং অপরজন আজমিরিগঞ্জ ডাকঘর এলাকার।
হিন্দুরা যেমন লেখাপড়ায় মনোযোগী, মুসলমানরা এরকম মনোযোগী না। হিন্দুরা আশেপাশের মাস্টারদের বাসায় লজিং রেখে সন্তানদের যেভাবে পড়ায়, মুসলমানরা সেভাবে পড়ায় না—ছাত্তার মিয়া, চেয়ারম্যান, শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদ
এদিকে ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী শাল্লা উপজেলার ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যা বিশ্লেষণে দেখা যায়, উপজেলার মোট জনসংখ্যার ৫৫.৭৮% মুসলিম, ৪৪.১৯% হিন্দু এবং ০.০৩% অন্যান্য ধর্মাবলম্বী রয়েছেন। ইউনিয়নভিত্তিক ধর্মীয় জনসংখ্যার হিসেবে আটগাঁও ইউনিয়নে ২৭ হাজার ৪২০ জন মুসলিম, ৬ হাজার ৪৬৯ জন হিন্দু ও ৫ জন অন্যান্য; শাল্লা ইউনিয়নে ২০ হাজার ৮৩০ জন মুসলিম, ৫ হাজার ১২ জন হিন্দু ও ১ জন অন্যান্য; বাহাড়া ইউনিয়নে ৭ হাজার ১৪ জন মুসলিম, ২০ হাজার ৯০২ জন হিন্দু ও ৬ জন অন্যান্য এবং হবিবপুর ইউনিয়নে ১০ হাজার ৩৪৪ জন মুসলিম, ১৯ হাজার ৬০০ জন হিন্দু ও ২৪ জন অন্যান্য ধর্মাবলম্বী বাস করেন। ধর্মীয় জনসংখ্যার তালিকায় শাল্লা ও আটগাঁও মুসলিম এবং বাহাড়া ও হবিবপুর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ।
এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বেশ সমালোচনা করছেন কিছু নেটিজেন। এর মধ্যে কিছু পোস্ট বেশ ভাইরালও হয়েছে। তবে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি হলেও নিয়োগে পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে স্থানীয়রা বলছেন, ওই অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহের ঘাটতি রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শাল্লা উপজেলায় মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া খুব বেশিদিন আগের ঘটনা নয়। হাওর অধ্যুষিত এই উপজেলার অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। হিন্দুরা বিভিন্ন পেশা ও চাকরিতে নিয়োজিত থাকলেও মুসলমান জনগোষ্ঠী পুরোপুরি কৃষিপেশায় যুক্ত। একই সাথে জনগোষ্ঠীটির মধ্যে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বোঝাপড়ার ঘাটতি রয়েছে।
শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছাত্তার মিয়া দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, হিন্দুরা যেমন লেখাপড়ায় মনোযোগী, মুসলমানরা এরকম মনোযোগী না। হিন্দুরা আশেপাশের মাস্টারদের বাসায় লজিং রেখে সন্তানদের যেভাবে পড়ায়, মুসলমানরা সেভাবে পড়ায় না।
নিয়োগ পরীক্ষা থেকে ফল প্রকাশ ও প্রজ্ঞাপন—সব কিছু হয় কেন্দ্রীয়ভাবে। লিখিত পরীক্ষাটা শুধু জেলা পর্যায়ে গ্রহণের আয়োজন হয়ে থাকে। এরপরে ভাইভা থেকে সব কিছু হয় ঢাকায়। এখানে জেলা থেকে কোনো কাজ নাই। ফলে ভিন্ন কিছু হওয়ার সুযোগও নাই— মোহন লাল দাস, জেলা শিক্ষা অফিসার, সুনামগঞ্জ
নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, আমি এখানকার হাশিমিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা, কলেজেরও আমি ডোনার। আমি এসব চিন্তা করে স্কুল-কলেজগুলো করেছি। একসময় কলেজে গিয়ে দেখলাম পাঁচটা ছাত্র-ছাত্রীও নাই কলেজে। আমি আরও দুইটা মাদরাসা করেছি। এতদিনে মুসলমান ছাত্র-ছাত্রী ১৫-২০ পার্সেন্ট হয়েছে।
ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা কলেজটা করার আগে এখানে কলেজ ছিল না। এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পরে আমাদের ছাত্ররা ঝরে যেত। অর্থের অভাবে সুনামগঞ্জে গিয়ে পড়তে পারত না। কলেজটা দিয়ে পরে বিএ পর্যন্ত খুললাম। এখন বিশ্ববিদ্যালয়-ইউনিভার্সিটিতে শাল্লার ছাত্র পাওয়া যায়।
প্রাথমিকের নিয়োগ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, নিয়োগ যারা পেয়েছে, তারা সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে পেয়েছে। এখানে অন্য কিছু নাই। কারণ এখানকার শিক্ষাক্ষেত্রে পার্সেন্টেজটা খুবই খারাপ। যে কয়েকজন মুসলমান পরীক্ষা দিয়েছে, পরিচর্যার অভাবে তাদেরও খুব একটা ‘মেধা’ নাই। কারণ মা-বাবা সচেতন না। হিন্দু ছেলেরা যা-ই করুক, পড়াশোনাটা ঠিক রাখে। কিন্তু এখানকার মুসলমান অভিভাবকরা এত সচেতন না।
জেলা শিক্ষা অফিসার মোহন লাল দাস দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সরকার কোনো সময় হিন্দু-মুসলিম কতজন চাকরি পেয়েছে, এই হিসাব করে না। এখানে মেধার ভিত্তিতেই সব কিছু হয়। কারণ নিয়োগ পরীক্ষা থেকে ফল প্রকাশ ও প্রজ্ঞাপন—সব কিছু হয় কেন্দ্রীয়ভাবে। লিখিত পরীক্ষাটা শুধু জেলা পর্যায়ে গ্রহণের আয়োজন হয়ে থাকে। এরপরে ভাইভা থেকে সব কিছু হয় ঢাকায়। এখানে জেলা থেকে কোনো কাজ নাই। ফলে ভিন্ন কিছু হওয়ার সুযোগও নাই।