শিক্ষকদের সিকিউরিটি-মর্যাদা-সচ্ছলতার একটাই রাস্তা জাতীয়করণ
শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অরাজক অবস্থা কাটিয়ে উঠতে শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া। বুধবার (১৪ অক্টোবর) দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অভিযোগ করেন, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের সম্পৃক্ত না করায় শিক্ষা খাতের বিভিন্ন উদ্যোগ থমকে যাচ্ছে এবং হ য ব র ল পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এ সময় তিনি ৭০০ কোটি টাকার প্রাক্কলন দিয়ে দ্রুত শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ এবং এমপিওভুক্তির জোরালো দাবি জানান।
শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণের দাবি এবং এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া বলেন, শিক্ষকদের মূল দাবিটাই ছিল জাতীয়করণ। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমানে যে অরাজক অবস্থা—শিক্ষকদের চাকরির সিকিউরিটি নাই, সামাজিক মর্যাদা নাই, আর্থিক সচ্ছলতা নাই; এটা থেকে বের হওয়ার একটাই রাস্তা শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ।
এমপিওভুক্ত এবং নন-এমপিও শিক্ষকদের বৈষম্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষকদের একটা গ্রুপ জাতীয়করণ হবে, আরেকটা অংশ নন-এমপিও থাকবে, এটা তো হতে পারে না। নন-এমপিও কারা? যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বীকৃতি ও টাকা দিচ্ছে; আবার নন-এমপিও যারা, শিক্ষকরা টাকা পাচ্ছেন না, কিন্তু স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ঠিকই সরকার থেকে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। একই ক্রাইটেরিয়ায় চলে এই স্কুলগুলো, একই সিলেবাসে পড়ায়, তারা কেন পাবে না?
প্রধানমন্ত্রী বরাবর শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির আবেদন ও আশাবাদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি ৫ অক্টোবর এটা তুলে ধরেছি। আমি আশাবাদী যে হয়তো কিছুটা সময় লাগলেও এই শিক্ষকরা এমপিওভুক্ত হতে পারবেন।
জাতীয়করণের জন্য যে অর্থ প্রয়োজন তার হিসাব দিয়ে অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ২০২৫ সালে আমি একটা হিসাব দিয়েছিলাম, ২০০ কোটি টাকা হলে আমরা জাতীয়করণ করতে পারি। এর আগে ২০১০ সালের ১২ মে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে যে হিসাবটা আমি দিয়েছিলাম—মাত্র ৮০ কোটি টাকার প্রয়োজন ছিল। ৮০ কোটি টাকা সরকারকে দিতে হতো না, সরকারের ৮০ কোটি টাকা সাশ্রয়ই হতো। অর্থাৎ আমাদেরকে সরকার যে টাকাটা দেয়, ৮০ কোটি টাকা আরও কম দিতে হবে, এটা ছিল। ২০২৫ সালে ২০০ কোটি। এখন এসে আমি হিসাব করে দেখলাম যে ৭০০ কোটি টাকার প্রয়োজন। যে স্কেল আসবে, স্কেল অনুযায়ী কিন্তু আরও একটু বাড়তে পারে। সেই হিসাবটা ধরে হিসাব দিয়েছি।
উদ্যোগ নেওয়ার পরও শিক্ষা খাতে কাজ থমকে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, থমকে গিয়েছে কারণ মন্ত্রী আসে, মন্ত্রী যায়; সচিব আসে, সচিব যায়; তাদেরকে বুঝাতে আবার সময় লাগে। কারণ আমরা তো শিক্ষক, আমরা এটা জানি। কিন্তু যারা আসে, আমাদের উপরে যাদেরকে বসিয়ে দেওয়া হয়, এরা তো শিক্ষক না। তখন এদেরকে আবার আমাদের পড়াতে হয়, বুঝাতে হয় যে এটা এভাবে এভাবে হবে আর কি। আমাদের কপাল খারাপ, কপাল মন্দ যে এই বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর জন্য যে পলিসি করা দরকার, সে পলিসিতে আমরা এখনো যেতে পারছি না।
শিক্ষকদের পলিসি মেকিং বা নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় যুক্ত না করার অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি জানান, বর্তমানে যা যা হচ্ছে, শিক্ষকরা কিছুই জানে না। শিক্ষকদের সাথে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করা ছাড়া আপনি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে পারবেন না। এটা আসলে কোনোভাবেই সম্ভব না। কিন্তু শিক্ষকদেরকে ইনভলভ করা হচ্ছে না, কারণ কী? শিক্ষকরা ইনভলভ হলে খুঁটিনাটি অনেক কিছু শিক্ষকরা জানতে পারবে। সেজন্য হয়তো শিক্ষকদেরকে ইনভলভ করা হচ্ছে না। যেখানে ২০০১ থেকে ২০০৬ যে বিএনপির সরকার ছিল, তখন যেকোনো ডিসিশন মেকিংয়ে আমাদেরকে ডাকা হতো। কিন্তু আট মাসে কোনো ডিসিশন মেকিংয়ে কোনো শিক্ষককে ডাকা হয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতির পরিণতি ও সরকারের অবস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, সেটা হ য ব র ল অবস্থা হবে। হ য ব র ল অবস্থা হয়ে তারা চায় না যে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাটা বাস্তবায়ন হোক। অবশ্যই সেটা ক্ষতিকর। দেশের জন্য ক্ষতিকর।
শিক্ষকদের বদলির ফল দ্রুত প্রকাশ করা উচিত
বেসরকারি স্কুল-কলেজে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলির ফল দ্রুত প্রকাশ করা উচিত বলেও মত প্রকাশ করেছেন অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, গত ৮ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে শিক্ষকদের বদলির বিষয়টি জানিয়েছি। বদলির জন্য নারী শিক্ষকদের ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে। চাকরি করে রাঙামাটি, বাড়ি হলো দিনাজপুর। একজন নারী শিক্ষকের জন্য এতদূরে চাকরি করা কষ্টকর।
অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া আরও বলেন, বদলির সাথে আর্থিক কোনো বিষয় জড়িয়ে নেই। পদ শূন্য রয়েছে, আপনি বদলি করে দিন। নারীরা সুন্দরভাবে চাকরি করতে পারে, সংসার করতে পারে। আমি মনে করি তাদের এটা ন্যায় দাবি এবং খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের বদলির ফল প্রকাশ করা দরকার।