শিক্ষা বাজেট অস্পষ্ট, বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই: শিক্ষা অধিকার সংসদ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বাজেট বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট ও যথাযথ পরিকল্পনার অভাব এবং বরাদ্দের বিশাল অংকের হিসাব অস্পষ্ট থাকায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শিক্ষা অধিকার সংসদ।
আজ শুক্রবার (১২ জুন) সংগঠনের সদস্য সচিব মোঃ শাহনেওয়াজ খান চন্দন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। এছাড়াও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তা জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রত্যাশাকে স্বাগত জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংগঠনটি বলছে, প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে ১ লক্ষ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাকে সরকার জিডিপির ২ শতাংশ বলছে। তবে এই পুরো বরাদ্দ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সরকারের শিক্ষা সংক্রান্ত দুই মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৪৬ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ৫৭ হাজার ৩০২ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের জন্য ১৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। সংগঠনটির প্রশ্ন— "বাকি ১৪ হাজার কোটি টাকা কোথায় ব্যয় হবে?" এই বিপুল পরিমাণ অর্থের হিসাব বাজেটে স্পষ্ট নয়।
সংগঠনটি মনে করে, বরাদ্দের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর সঠিক বাস্তবায়ন। তারা হুশিয়ারি দিয়ে বলে, কেবল বরাদ্দ বাড়িয়ে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, যদি না প্রতিটি স্তরের বৈষম্য (শহর-গ্রাম, পাহাড়-সমতল, পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চল) দূর করা যায়।
শিক্ষা বাজেটের ওপর দেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণ ও ‘জেন-জি’ প্রজন্মের ৩৫০ জন গবেষক ও শিক্ষার্থীর মতামত নিয়ে শিক্ষা অধিকার সংসদ সম্প্রতি একটি জরিপ পরিচালনা করে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কর্তৃক জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বাজেট বক্তৃতার কিছু দূরদর্শী পদক্ষেপের সাথে এই জরিপের প্রত্যাশার কিছুটা মেলবন্ধন পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে শিক্ষা অধিকার সংসদ।
জরিপে অংশ নেওয়া ৬২.৩% শিক্ষার্থী শিক্ষা খাতে জিডিপির ন্যূনতম ৫% বরাদ্দের দাবি জানিয়েছিলেন, যা সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারে স্থান পেয়েছে। এছাড়া, ৫৪.৩% তরুণ গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং ৫০% তরুণ কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান। সরকারের ঘোষিত “ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব”, ডিজিটাল লাইব্রেরি, এডু-আইডি, রোবটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শিক্ষার অন্তর্ভুক্তিকে তারা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনে সময়োপযোগী বলে আখ্যা দিয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৫৩.৪% তরুণ ভৌত অবকাঠামোর চেয়ে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ ও সম্মানজনক বেতনকে অগ্রাধিকার দিলেও এবারের বাজেটে শিক্ষকদের আলাদা বেতন-ভাতার কোনো ইঙ্গিত নেই। পাশাপাশি, শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে অধিক বরাদ্দের দাবি জানালেও বাজেটে তার সঠিক প্রতিফলন ঘটেনি।
বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের বড় অংশই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭.৭% তরুণের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা ছিল ‘দুর্নীতি ও অপচয়’ এবং ৫৬.৯% তরুণ ‘সঠিক পরিকল্পনার অভাব’কে প্রধান দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। শিক্ষাঙ্গনে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন দেখতে দেশের সচেতন ছাত্রসমাজ সতর্ক দৃষ্টি রাখবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
বাজেট পাসের পূর্বে সংগঠনের পক্ষ থেকে ৩টি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করা হয়েছিলো। দাবিগুলো হলো, সুষম বণ্টন: ‘মিড-ডে মিল’ ও উপবৃত্তি দ্বিগুণ করার ক্ষেত্রে বরাদ্দের একটি বড় অংশ সুষমভাবে বণ্টন করা। জাতীয় গবেষণা তহবিল: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মৌলিক গবেষণা ও এআই শিক্ষার জন্য বরাদ্দের ন্যূনতম ১০% সুনির্দিষ্ট করে একটি ‘জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল’ (এনআরআইএফ) গঠন করা। স্বাধীন অডিট সেল: বরাদ্দের শতভাগ স্বচ্ছতা ও সামাজিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নাগরিক সমাজ ও তরুণ গবেষকদের অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বাধীন ‘বাজেট বাস্তবায়ন ও সামাজিক অডিট সেল’ গঠন করা।
শিক্ষায় বিনিয়োগ মানেই জাতির ভবিষ্যতে বিনিয়োগ; তাই শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রেখে বিভিন্ন শিক্ষা প্রকল্প গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে সরকারকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দেখাতে হবে বলে পরামর্শ দিয়েছে সংগঠনটি।