বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির এমওইউ যেন ফ্যাশনে পরিণত না হয়: শিক্ষামন্ত্রী
ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়ার পারষ্পারিক সম্পর্কের অভিজ্ঞতা নিয়ে আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলবে বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তবে কার্যকর সুফল ছাড়া শুধু শুধু এমওইউ স্বাক্ষর নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। বলেছেন, ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর যেন কোনো ফ্যাশনে পরিণত না হয়।
আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ২০২৬’ উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। অনুষ্ঠানে ‘ইন্ডাস্ট্রি, ক্যারিয়ার অ্যান্ড জব ফেয়ার’ শীর্ষক আলোচনারও আয়োজন করা হয়। এ সময় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমওইউ স্বাক্ষর করে প্রতিষ্ঠানটি।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, এমওইউ স্বাক্ষর যেন কোনো ফ্যাশনে পরিণত না হয়। এক বছর পূর্তি হলে আমরা এই এমওইউ থেকে কী কী অপরচুনিটি পাওয়া গিয়েছে, সেটারও অ্যাকশন প্ল্যান করতে হবে।
ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়ার সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমরা দেখেছি উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রজেক্ট করে ছাত্রছাত্রীরা। পরবর্তীকালে এই প্রজেক্টগুলোকেই বিভিন্ন রকমের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, অর্গানাইজেশন কার্যকরভাবে প্রতিফলিত করে। বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে সফলকাম হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রজেক্টগুলোই। এই জন্যই দেখা যায় উন্নত বিশ্বে যারা গবেষণা করছে, যারা মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী, তাদেরকে তাদের পড়াশোনা শেষ হওয়ার পরপরই কোম্পানিগুলো হায়ার করে নিয়ে যায় এবং তারা তাদেরকে গবেষণার কাজে লাগায়।
ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন চীন সফরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, আমাদের টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের (টি-ভেট) ব্যাপারে চীনের সাথে আমরা কিছু পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কাজ করব এবং মডার্ন টেকনোলজি আমরা এখানে নিয়ে আসব। আটটি বিভাগে এই আটটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটকে আমরা রেপ্লিকা হিসেবে চীনের এই টি-ভেট সেক্টরে কাজ করব। চীনে দেখে এসেছি যে এই ইন্ডাস্ট্রির ভেতরেই পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং এই গবেষণার জন্য, রিসার্চের জন্য নামি-দামি কোম্পানিগুলো রিসার্চারদেরকে গ্র্যাজুয়েশন করার পরেই নিয়ে আসে। ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড একাডেমিয়ার মধ্যে লিংকেজ রেখে সেখানে কাজ করে, তারা গবেষণায় উন্নত হচ্ছে এবং নতুন নতুন ইনোভেশন তারা করছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে বিশ্বময়।
এ সময় গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে আগামী দিনে তারা কী সম্ভাবনা তৈরি করবে দেশের জন্য—তা। ধরুন, টাঙ্গাইলে শাড়ি রয়েছে, তাঁত শিল্প রয়েছে।—সেই শিল্পকে কিভাবে অগ্রণী কাজ করা যায় সেই বিষয়গুলো গবেষণা হবে। হবে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী খাবারের কথা, টাঙ্গাইলের চমচমের কথা রয়েছে। অতএব, এই যে আমাদের পাশের গ্রামে কী ঘটনা ঘটছে, কী হচ্ছে, সেটি নিয়ে বিশ্বমানের রিসার্চ শুরু হতে পারে পাশের একটি গ্রাম থেকে এবং সেটা আমি বিশ্বাস করি এই ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয় করবে।
তিনি বলেন, একটি পেপার লিখতে কী পরিমাণ গবেষণা করতে হয়, এখানে গবেষকরা রয়েছেন, তারা জানেন। আমার স্মৃতির মানসপটে রয়েছে, আমি যখন গবেষণা করছিলাম, আমার সুপারভাইজার বলছিল যে যতক্ষণ পর্যন্ত না এক ঘরের এক রুমের প্রিন্টেড পেপারগুলোকে অন্য রুমে সরানো না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত গবেষণার কাজ শেষ হয়নি। অর্থাৎ আমাদের রিম আফটার রিম, কাগজ দিয়ে গবেষণা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এই এক্সপেরিমেন্ট, এই গবেষণা সফলে রূপান্তর করতে হবে, তা না হলে আমরা বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বের এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে আমরা এগোতে পারব না, সে দিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, যেটা মাননীয় চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, শিক্ষার্থীদের জার্নালে লেখা এবং যে সমস্ত জার্নালগুলোর রেটিং ভালো রয়েছে, সেগুলো লেখা—সেগুলো আমাদের এই গবেষণার জন্য অনেক কাজে আমাদের সাহায্য করবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় আমাদের যে রিসার্চ ইন্টিগ্রিটি রয়েছে, সেগুলোকে আমাদের লক্ষ্য করতে হবে এবং এই রিসার্চ মেথডোলজি, ফাইন্ডিংস এবং গবেষণা করে বিশ্ববিদ্যালয়কে উন্নত মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করার একটি ব্যাপক দায়িত্ব রয়েছে আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীপ্রতি অভিভাবক ও সরকারের ব্যয়ের উপাত্ত তুলে ধরে কড়া বক্তব্য দেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের দেশ জনবহুল দেশ। এ দেশে মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। এই সরকার প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে শিক্ষায় সবচেয়ে বেশি বাজেট অ্যালোকেশন করেছে। তার অর্থ এই নয় যে আমরা অপচয় করতে পারি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় করে যাচ্ছি, আমরা শিক্ষার জন্য বাজেট দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হবে, সাথে সাথে আমাদের কস্ট ইফেক্টিভও হতে হবে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর মাত্র ৯০০ জন গ্র্যাজুয়েট হয়ে বের হয়ে আসছে। আর বাজেট আমরা দিচ্ছি ১২৫ কোটি টাকা। আমি যদি পার ক্যাপিটা এক্সপেন্স, পার স্টুডেন্ট আমি যদি বের করি, তাহলে হচ্ছে প্রায় সাড়ে ১৩ লক্ষ টাকা। সাড়ে ১৩ লক্ষ টাকা দিচ্ছে সরকার একটি ছাত্রের পেছনে। সেই সাথে অভিভাবকরাও টাকা দিচ্ছে, তাই নয় কি? পার স্টুডেন্ট, পার ইয়ার, পাঁচ বছরের জন্য ন্যূনতম পক্ষে, আমি জানি না না হলেও ১ লক্ষ টাকা করে একটি সন্তানের পেছনে খরচ হচ্ছে। তো পাঁচ বছরে ৫ লক্ষ, সরকার দিচ্ছে সাড়ে ১৩ লক্ষ—এই সাড়ে ১৮ লক্ষ টাকা পার স্টুডেন্ট, পার ক্যাপিটা এক্সপেন্স প্রতি স্টুডেন্ট।
তিনি বলেন, ভাবতে পারেন যে আমাদের দেশ কী পরিমাণ খরচ করছে একটি ছাত্রের জন্য? তারপর যদি বেরিয়ে ভিসি সাহেবকে জিজ্ঞেস করার পরে তিনি উত্তরে বলেন যে, আমার আনেমপ্লয়মেন্ট রেট ইজ ৩২ পারসেন্ট, তাহলে আমাদের এই বাজেট অ্যালোকেশন, প্রধানমন্ত্রীর যে প্রত্যয় নিয়ে আমাদের বাজেট ২% করে ১ লক্ষ ৩৬ হাজার কোটি টাকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দিয়েছেন, যেই বাজেট ছিল বিগত সরকারের সময়ে জিডিপির ১.৩৯%, তার মধ্যে রূপপুর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ছিল আইসিটি মিনিস্ট্রি—আর এই জায়গায় ক্লিনকাট আমাদের ২% বাজেট দিয়েছেন, সেই বাজেটের সদ্ব্যবহার করা আমাদের একটি দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতএব ভিসি মহোদয়কে আমি অনুরোধ করব এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এলামনাইদেরকে আপনি ট্র্যাকিং করবেন এবং জানার চেষ্টা করবেন এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা বেরিয়েছে তাদের মধ্যে বেকারত্ব কী এবং সেটাকে কিভাবে ইম্প্রুভ করা যায় সেই বিষয়ে আপনাকে সচেষ্ট থাকতে হবে এবং এই বিষয়টি আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশ ক্যান নট এফোর্ড দ্যাট এক্সপেন্সেস বাই দ্য গভমেন্ট। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এই পরিমাণ খরচ সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় না।
শিক্ষা এমন বিলাসিতা যেন না হয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু দিয়েই যাবে কিন্তু সেই জায়গায় অনরিটার্ন সরকার পাবে না, তা যেন না হয়, সে দিকে আমাদের সকলের গুরুত্ব রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কথা হচ্ছে—আমরা খরচ করব, বাট এভরি নিকেল অ্যান্ড ডাইম শুড বি কাউন্টেবল এবং এটা যেন ওয়েস্টেজ না হয়, সে দিকে লক্ষ্য রেখে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আগামী দিনের জন্য তৈরি করতে হবে।