শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় ১৮ লাখ, এরপরও যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২% শিক্ষার্থী বেকার থাকেন!
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পেছনে সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করার পরও বেকারত্বের হার বেশি থাকলে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়িয়ে কী লাভ—এমন প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর মাত্র ৯০০ জন গ্র্যাজুয়েট হয়ে বের হয়ে আসছে। আর আমরা বাজেট দিচ্ছি ১২৫ কোটি টাকা। আমি যদি পার ক্যাপিটা এক্সপেন্স পার স্টুডেন্ট বের করি, তাহলে হচ্ছে ইয়ারলি সাড়ে ১৩ লক্ষ টাকা! সাড়ে ১৩ লক্ষ টাকা দিচ্ছে সরকার একটি ছাত্রের পেছনে। সেই সাথে অভিভাবকরাও টাকা দিচ্ছে, তাই নয় কি? পার স্টুডেন্ট পার ইয়ার, পাঁচ বছরের জন্য ন্যূনতম পক্ষে—আমি জানি না, না হলেও ১ লক্ষ টাকা করে একটি সন্তানের পিছনে খরচ হচ্ছে। তো পাঁচ বছরে ৫ লক্ষ, আর সরকার দিচ্ছে সাড়ে ১৩ লক্ষ! এই সাড়ে ১৩ লক্ষ টাকা পার স্টুডেন্ট পার ক্যাপিটা এক্সপেন্স। স্টুডেন্টরা ভাবতে পারেন যে আমাদের দেশ কী পরিমাণ খরচ করছে একটি ছাত্রের জন্য! তারপর যদি ভিসি সাহেবকে জিজ্ঞেস করার পরে তিনি উত্তরে বলেন যে আমার আনেমপ্লয়মেন্ট রেট ৩২%, তাহলে আমাদের এই বাজেট অ্যালোকেশন বাড়িয়ে লাভ কী হলো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে উদ্দেশ করে মন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কতজন বেকার থাকছেন এবং এই হার কীভাবে কমানো যায়, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। তবে বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষায় সরকারি ব্যয়ের বিপরীতে প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন এবং অপচয় রোধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিক্ষায় সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা তুলে ধরতে একটি মাদ্রাসার উদাহরণও দেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ওই মাদ্রাসায় ২০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র দুজন পাস করেছেন। অথচ প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে চার লাখ টাকা এমপিও পায়। সে হিসাবে বছরে ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে মাত্র দুজন শিক্ষার্থী পাস করেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি অর্থের ব্যবহার ও অর্জিত ফলাফল পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষা যেন এমন খাতে পরিণত না হয়, যেখানে সরকার শুধু অর্থ ব্যয় করবে, কিন্তু প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, গবেষণাকে শুধু অ্যাকাডেমিক পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানেও তা কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কার্যকর সংযোগ প্রয়োজন।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব চুক্তি যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। চুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কী ধরনের সুযোগ পেলেন, ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানে কী অগ্রগতি হলো, তা মূল্যায়নের জন্য কার্যকর কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে।
শিক্ষার্থীদের জ্ঞানকে বাস্তব সমস্যা সমাধানে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শুধু সনদ অর্জন করলেই হবে না; অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এআইয়ের দেওয়া তথ্য যাচাই করার মতো নিজস্ব জ্ঞান থাকতে হবে। বিষয় সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না থাকলে এআই ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে।