বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ, আদালতের আদেশের পরও হয়নি বিরোধের অবসান
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার বোয়ালিয়া জে. এম. মাধ্যমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল, গাছপালা কেটে বিক্রি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নতুন ভবনের সেফটি ট্যাংক নির্মাণের নামে জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার আউলিয়াপুর এলাকার আক্কেল আলী হাওলাদার, কুলসুম বেগম ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের দাবি, জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত একাধিক নথি এবং আদালতের আদেশ থাকা সত্ত্বেও বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে হয়রানি বন্ধ হয়নি।
অভিযোগকারী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বোয়ালিয়া মৌজার এসএ ২০৯৩ ও ২০৯৪ নম্বর দাগের জমি নিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। এর মধ্যে এসএ ২০৯৩ নম্বর দাগে তাদের রেকর্ডভুক্ত জমির পরিমাণ ১৪ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং এসএ ২০৯৪ নম্বর দাগে ২০ দশমিক ৯২ শতাংশ। তাদের দাবি, অনলাইন খতিয়ান, নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন করের কাগজপত্রেও সংশ্লিষ্ট জমির মালিকানার তথ্য রয়েছে।
আক্কেল আলী হাওলাদার ও কুলসুম বেগমের পরিবারের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের পেছনে পর্যাপ্ত জায়গা থাকা সত্ত্বেও এসএ ২০৯৪ নম্বর দাগে তাদের গাছপালার বাগানের মধ্যে সেফটি ট্যাংক নির্মাণ করা হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, এভাবে নির্মাণকাজ চালানো হলে তাদের জমির একটি অংশ স্থায়ীভাবে দখলে চলে যেতে পারে এবং গাছপালার ক্ষতি হবে।
পরিবারটির দাবি, নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত জমি এবং সেফটি ট্যাংক নির্মাণের স্থান সরেজমিনে পরিমাপ করে রেকর্ড ও দলিল অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করা হোক। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে তাদের লাগানো গাছপালা কাটা ও বিক্রি করা হয়েছে। নিজেদের গাছপালা বিক্রি করতে গেলেও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও তার সহযোগীরা মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন।
বোয়ালিয়া মৌজার এসএ ২০৯৩ ও ২০৯৪ নম্বর দাগের জমি নিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। এর মধ্যে এসএ ২০৯৩ নম্বর দাগে তাদের রেকর্ডভুক্ত জমির পরিমাণ ১৪ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং এসএ ২০৯৪ নম্বর দাগে ২০ দশমিক ৯২ শতাংশ। তাদের দাবি, অনলাইন খতিয়ান, নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন করের কাগজপত্রেও সংশ্লিষ্ট জমির মালিকানার তথ্য রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে সেটি যথাযথ হয়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ভূমি অফিসের তদন্ত প্রতিবেদন ভুক্তভোগীদের পক্ষে
রঙ্গশ্রী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো. এনামুল হক তালুকদারের স্বাক্ষরিত একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বোয়ালিয়া মৌজার বিভিন্ন দাগে বাদীপক্ষের সম্পত্তি থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি বরিশালের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ১১৮৬/২০২৪ (বাকেরগঞ্জ) নম্বর এমপি মামলার তফসিলভুক্ত সম্পত্তি সরেজমিনে তদন্তের পর প্রস্তুত করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনায় বাদীপক্ষের নামে ১৮০২ নম্বর নতুন খতিয়ান সৃজনের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে মোট জমির পরিমাণ ২ দশমিক ১০৭১ একর। ওই খতিয়ানের আওতায় এসএ ২০২১, ২০৯৩, ২০৯৪, ২০৯৫, ২০৯৬ ও ২০৯৭ নম্বর দাগে সম্পত্তি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তদন্তের সময় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী এসএ ২০৯৩ ও ২০৯৪ নম্বর দাগের বাদীপক্ষের প্রাপ্য জমি তাদের দখলে ছিল, যদিও এর আগে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দখলে থাকার কথাও বলা হয়েছে। অন্যদিকে, এসএ ২০৯৫ নম্বর দাগে বিদ্যালয়ের মাঠ দৃশ্যত বিদ্যালয়ের দখলে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে কাগজপত্র চাওয়া হলে তারা কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি বলেও উল্লেখ রয়েছে।
সমঝোতার চেষ্টা করেও সমাধান না পাওয়ার অভিযোগ
অভিযোগকারী পরিবারের দাবি, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধ মেটাতে তারা দীর্ঘদিন ধরে সমঝোতা ও মীমাংসার চেষ্টা করে আসছেন। কিন্তু কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। তারা আরও দাবি করেন, চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে পরে অন্য ব্যক্তিদের অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেওয়া হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রাণনাশের হুমকি এবং মিথ্যা মামলায় জড়ানোর অভিযোগও তুলেছেন তারা।
পরিবারটির ভাষ্য, জমি নিয়ে বিরোধের কারণে তারা বিভিন্ন সময় মামলা-মোকদ্দমার আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের দাবি, ২০২৫ সালের ১৪৪/১৪৫ ধারাসংক্রান্ত একটি মামলায় তারা অনুকূল আদেশ পেয়েছেন।
নতুন করে ১৪৪/১৪৫ ধারায় নোটিশ
প্রাপ্ত নোটিশের তথ্য অনুযায়ী, এমপি মামলা নম্বর ১০১১/২০২৬ (বাকেরগঞ্জ) এবং ২০২৬ সালের ৩০ জুলাইয়ের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে উভয় পক্ষকে বিরোধপূর্ণ সম্পত্তিতে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪/১৪৫ ধারার উল্লেখ রয়েছে। এতে আদেশ অমান্যকারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
আরও খবর: তিন গেজেটের একটি হয়েছে, বাকি দুটোর প্রজ্ঞাপন হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও অটোম্যাটিক পাওয়ার কথা
ন্যায্য সমাধান চান জমির দাবিদার পরিবার
আক্কেল আলী হাওলাদার ও তার পরিবার সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, ভূমি অফিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বিরোধপূর্ণ জমির সঠিক সীমানা নির্ধারণ, মালিকানার কাগজপত্র যাচাই, নির্মাণকাজের স্থান পরিদর্শন এবং আইন অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছেন।
তাদের বক্তব্য, বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বা শিক্ষার্থীদের স্বার্থের বিরোধিতা করা তাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং নিজেদের রেকর্ডভুক্ত জমির অধিকার ও গাছপালা রক্ষা করাই তাদের দাবি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বোয়ালিয়া জে এম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইদ্রিসুর রহমান স্বপন বলেন, ‘জায়গাটা স্কুলের সীমানার মধ্যে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে, এজন্য ভবন নির্মাণ করতে সমস্যা নেই।’
জায়গাটা যে বিদ্যালয়ের এমন কোনো কাগজপত্র আপনাদের কাছে রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘আছে।’ কাগজটি দেখতে চাইলে তিনি জানান, ‘দেখি, আপনাকে পাঠানো যায় কিনা।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বোয়ালিয়া জে এম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আলি জিন্নাহ রথি বলেন, জমির দাবি করা দুই পক্ষ আদালতে মামলা করেছে। আদালতে মামলা চললেও ওই জায়গায় কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না, এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। সেজন্য সেখানে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।’