জামায়াতের প্রতীক দাঁড়িপাল্লার ছবি, যে ভুলে সংশোধনের মুখে মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো ২০ লাখ বই
একটি প্রতীকের ভুলে সংশোধনের মুখে পড়েছে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ের প্রায় ২০ লাখ কপি। বইটির ‘উপাত্ত ও তথ্য’ অধ্যায়ে জ্ঞানের পিরামিডে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ও নির্বাচনী প্রতীকের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় ছাপার কাজ বন্ধ রেখে মাঠপর্যায়ে পাঠানো বই সংগ্রহ করে সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে এনসিটিবি। এতে বাড়তি ব্যয় ও সময়ের চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানো নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বইয়ে জ্ঞানের চার স্তর যেভাবে সাজানো
শিক্ষার্থীদের উপাত্ত থেকে তথ্য, তথ্য থেকে জ্ঞান, আর জ্ঞানের সর্বোচ্চ স্তরে প্রজ্ঞা এ ধারাবাহিকতাকে পিরামিডের আদলে বোঝাতে চেয়েছে এনসিটিবি। ফলে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে পিরামিডের একটি ছবি যুক্ত করা হয়। বইটির ‘উপাত্ত ও তথ্য’ পাঠে জ্ঞানের এই চারটি স্তর নিচ থেকে ওপরের দিকে সাজানো হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়টি সহজ করতে প্রতিটি স্তরের আলাদা প্রতীকও ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ডেটা বা উপাত্তের স্তরে রয়েছে গোলাকার ঘড়ির মতো প্রতীক। ইনফরমেশন বা তথ্যের স্তরে রয়েছে পরমাণু বা নেটওয়ার্কের মতো দেখতে একটি প্রতীক। নলেজ বা জ্ঞানের স্তরে মানুষের মস্তিষ্কের প্রতীক। উইজডম বা প্রজ্ঞা’র স্তরে রয়েছে দাঁড়িপাল্লার প্রতীক।
যেভাবে এলো প্রজ্ঞার প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’
প্রাচীন ইংরেজি শব্দ উইজডম (Wisdom)। এই শব্দের মূল বাংলা অর্থ হলো ‘প্রজ্ঞা’। কিন্তু ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ে উইজডমের স্তরে এর বাংলা অর্থ লেখা হয় ‘বুদ্ধি’। তখন এর প্রতীক ছিল দাঁড়িপাল্লা। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে ‘বুদ্ধি’র প্রতীকে পরিবর্তন নিয়ে আসে এনসিটিবি। সেই ‘দাঁড়িপাল্লা’ সরিয়ে যুক্ত করা হয় ‘মস্তিষ্ক’ এর প্রতীক ব্যবহার করা হয়। পরে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই পরিমার্জনের সময় কমিটি ‘বুদ্ধি’র পরিবর্তে ‘প্রজ্ঞা’ লেখার সুপারিশ করে। কিন্তু প্রতীক একই অর্থাৎ মস্তিষ্ক রাখতে বলা হয়। কিন্তু এতেই বাধে বিপত্তি। ‘বুদ্ধি’র পরিবর্তে ‘প্রজ্ঞা’ লেখা হলেও প্রতীক হিসেবে মস্তিষ্ক রাখা হয় নি। সেখানে ফের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক দেওয়া হয়। ফলে প্রজ্ঞা স্তরের প্রতীক হয়েছে ‘দাঁড়িপাল্লা’।
গ্রাফিক্স ডিজাইনারের ভুল, দাবি এনসিটিবির
প্রজ্ঞা স্তরের প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ থাকার বিষয়টি গ্রাফিক ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের ত্রুটি বলে দাবি এনসিটিবির।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম শওকত আলী খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, উইজডমের বাংলা শব্দার্থ ‘বুদ্ধি’ হয় না। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে এবং ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও উইজডমের বাংলা শব্দার্থ ‘বুদ্ধি’ লেখা হয়ে এসেছে। তাই আমাদের পরিমার্জন কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ২০২৭ সালে বাংলায় ‘বুদ্ধি’র পরিবর্তে ‘প্রজ্ঞা’ লেখা হবে। গ্রাফিক্স ডিজাইনাররাও ‘বুদ্ধি’র পরিবর্তে ‘প্রজ্ঞা’ লিখেছে। কিন্তু প্রতীকটি পরিবর্তন করে দিয়েছে। অথচ পরিমার্জন কমিটির সুপারিশ ছিল শুধু বাংলায় ‘প্রজ্ঞা’ শব্দটি সংশোধন করা, প্রতীক পরিবর্তন করা নয়।
তিনি আরও বলেন, গ্রাফিক ডিজাইনাররা সম্ভবত গুগলে ছবি খুঁজতে গিয়ে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে ব্যবহৃত প্রতীকটি পেয়েছেন। সে কারণে তাঁরা পুরোনো ছবিটি ব্যবহার করেছেন। তারা বিষয়টির গভীরতা বুঝতে পারেন নি হয়তো।
এদিকে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে এই স্তরে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক কিভাবে যুক্ত হলো তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান নি এই কর্মকর্তা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমি তো চলতি বছরের ২০ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এ বিষয়ে জানা নেই।
জানা গেছে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসেই আওয়ামী লীগ সরকারের চালু করা নতুন শিক্ষাক্রম বাদ দিয়ে দেয়। ২০১২ সালের পুরোনো শিক্ষাক্রমেও ফিরে যায়। যেহেতু পট পরিবর্তন ছিল ২০২৪ সালের আগস্টে। সুতরাং সে সময় ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই পরিমার্জন করা হয়েছে।
ছাপানো বই সংশোধনে বাড়তি ব্যয়ের শঙ্কা
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের প্রায় ৩৮ লাখ কপি ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ লাখ কপি ছাপাশেষে মাঠপর্যায়ে পাঠানো হয়ে গেছে। সেগুলো সংগ্রহ করে সংশোধন করতে হবে। ফলে এটি একটি বড় ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু প্রতীক পরিবর্তনের জন্য বই ফেরত আনা, সংশোধন করা এবং পুনরায় বিতরণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরিবহন, শ্রম ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় হতে পারে।
এনসিটিবির সদস্য আবু নাসের টুকু দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে দাঁড়িপাল্লার প্রতীক যুক্ত হয়েছে। বিষয়টি জানার পর মাঠপর্যায়ে চলে যাওয়া বই ফিরিয়ে এনে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখের মতো বই মাঠ পর্যায়ে চলে গেছে। সেগুলো আমরা ফেরত আনছি। এরপর সংশোধন করে দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে ব্যয়ের বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হচ্ছে।
এদিকে মুদ্রণমালিকদের ভাষ্য, এতগুলো বইয়ের ছাপা, বাঁধাই ও সরবরাহের কাজ শেষ হওয়ার এ পর্যায়ে বই ফেরত এনে সংশোধন করতে হলে বাড়তি খরচ ও সময় লাগবে। তবে এ প্রক্রিয়ায় মোট কত টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে সেটিও জানা যায়নি।
দায় কার?
প্রতীকটি অনিচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন হয়েছে এমন দাবি এনসিটিবির। এমন পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ে পাঠানো বই সংগ্রহ করে সংশোধন ও পুনর্বিতরণ করতে হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছানো আরও কঠিন হতে পারে। ফলে একটি প্রতীক পরিবর্তনের মতো বিষয় কীভাবে পাঠ্যবইয়ের একাধিক পর্যালোচনা ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত মুদ্রণ পর্যন্ত পৌঁছাল সেই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। শব্দ সংশোধনের সুপারিশ থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতীক অপরিবর্তিত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার ছিল সেই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় নি। তবে কর্মকর্তারা দায় দিচ্ছেন একে অপরকে।
এনসিটিবি সদস্য আবু নাসের টুকু জানিয়েছেন, বইয়ের বিষয়বস্তু ও প্রতীক নির্ধারণের কাজ পাঠ্যক্রম বিশেষজ্ঞদের। তাঁর দায়িত্ব মূলত মুদ্রণসংক্রান্ত কাজ দেখা।
অন্যদিকে এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, আমি এ বিষয়ে কথা বলার জন্য অনুমোদিত কর্মকর্তা নই। আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন যেমন চেয়ারম্যান, সদস্য (টেক্সটবুক) এবং সদস্য (শিক্ষাক্রম)। তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম শওকত আলী খান বলেন, শিক্ষাক্রমের সদস্য হিসেবে পাঠ্যবইয়ের পুরো বিষয়টি দেখতে হয় আমাকে। বইয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই ও পর্যালোচনার কাজ হলেও ভুলটি শনাক্ত করা যায়নি। বইগুলো ভ্যালিডেশন, রিভিউ, ইংরেজি সংস্করণসহ আরও কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে। সব পর্যায়ে থাকার পরও কারও চোখে পড়েনি।
এর ব্যাখ্যায় তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ‘প্রজ্ঞা’ শব্দটি ঠিক করা হয়েছে কি না সেদিকেই হয়তো বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। ফলে প্রতীকের বিষয়টি যথাযথভাবে খেয়াল করা হয়নি। এখন সফট কপিতে যেসব ভুল ধরা পড়েছে, সেগুলো সংশোধন করে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়েছে।