অনুমোদনের এক বছরেও অনুদান পাননি ১৬৯০ শিক্ষক, পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন
দেশের স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার শূন্য পদে নিয়োগ পাওয়া ১ হাজার ৬৯০ জন শিক্ষক প্রায় এক বছর ধরে সরকারি অনুদানের অপেক্ষায় রয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পরও তাদের অনুদানভুক্ত করা এবং অর্থ ছাড়ের কার্যকর অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুদান না পাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন শিক্ষকরা। এক বছর ধরে বিনা অনুদানে শিক্ষকতা করতে গিয়ে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
শিক্ষকদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, কমিটির সুপারিশ এবং অনুমোদনের মতো প্রশাসনিক ধাপ পেরিয়েও তাদের অনুদান চালু হয়নি। ফলে একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন, অন্যদিকে পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। এর পেছনে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অবহেলাকে দায়ী করছেন তারা।
যদিও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন দেওয়ার পর তালিকায় থাকা শিক্ষকদের বিষয়ে অভিযোগ জমা পড়ে। সেই অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের পর নতুন করে তালিকা হয়েছে। এই তালিকা চূড়ান্ত করতে আগামী সপ্তাহে সভা করবেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
জানতে চাইলে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘প্রার্থীরা আমার কাছে এসেছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পরও কেন তাদের অনুদান ছাড় হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হবে। সরকারি ছুটি শেষে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব। যারা প্রাপ্য তাদের অনুদান দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাড়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অনুদানবঞ্চিত শিক্ষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কোডপ্রাপ্ত প্রায় ৯ হাজার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসার মধ্যে ১ হাজার ৫১৯টি প্রতিষ্ঠান অনুদানভুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক মাসিক ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং সহকারী শিক্ষক ৩ হাজার ৩০০ টাকা অনুদান পেয়ে থাকেন। প্রতি প্রতিষ্ঠানে চারজন করে শিক্ষক হিসাব করলে অনুদানপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭৬ জন। তবে ১৯৯৪ সাল থেকে অনুদান কার্যক্রম চালু হওয়ার পর মৃত্যু, অবসর, পদত্যাগ ও বহিষ্কারসহ বিভিন্ন কারণে অনেক পদ শূন্য হয়ে যায়।
‘প্রার্থীরা আমার কাছে এসেছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পরও কেন তাদের অনুদান ছাড় হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হবে। সরকারি ছুটি শেষে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব। যারা প্রাপ্য তাদের অনুদান দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাড়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’-মুহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন, মহাপরিচালক, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর
২০২৩ সালে ৫৬টি জেলার ১ হাজার ৮৫০টি শূন্য পদ পূরণ করা হয়। কিন্তু বাকি আট জেলায় দীর্ঘদিনেও শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এতে আরও ১ হাজার ৬৯০টি শূন্য পদের শিক্ষকের তথ্য অধিদপ্তর পেয়েছে।
অধিদপ্তরের সাত সদস্যের কমিটি এবং মন্ত্রণালয়ের পাঁচ সদস্যের কমিটির প্রক্রিয়া শেষে এসব শিক্ষককে অনুদান দেওয়ার বিষয়ে ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর আদেশ জারি করা হয়। কিন্তু এরপরও তাদের অনুদান চালু না হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
শিক্ষকরা বলছেন, অনুদানের পরিমাণ খুব বেশি না হলেও প্রান্তিক ও স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য এই অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাসে ৩ হাজার ৩০০ বা ৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে একটি পরিবারের সব ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব না হলেও চাল-ডাল কেনা, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ কিংবা চিকিৎসার মতো জরুরি প্রয়োজনে এই অর্থ কিছুটা হলেও সহায়তা করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই সামান্য আর্থিক সহায়তা থেকেও বঞ্চিত থাকায় শিক্ষকরা আরও অসহায় হয়ে পড়েছেন।
তাদের অভিযোগ, অনেকেই অন্য কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস ছাড়াই শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো, অসুস্থ স্বজনের চিকিৎসা করানো কিংবা ধারদেনা পরিশোধ করতে গিয়ে তাঁদের প্রতিনিয়ত আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
‘নিয়োগ বা তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কিছু অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করা যেতে পারে। যেসব ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেসব ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু অভিযোগের কারণে যাদের নিয়োগ ও কাগজপত্র বৈধ, তাদেরও অনির্দিষ্টকাল অনুদানের বাইরে রাখা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।-মো. রেজাউল হক, মহাসচিব, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা জাতীয় শিক্ষক ঐক্যফ্রন্ট
একদিকে শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজের পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতেই তাদের সংগ্রাম করতে হচ্ছে। অনুদান পাওয়ার আশায় দিনের পর দিন অপেক্ষা করলেও নির্দিষ্ট সময়সীমা বা চূড়ান্ত সমাধান না পাওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে অনুদানবঞ্চিত শিক্ষকদের মধ্যে।
এ বিষয়ে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা জাতীয় শিক্ষক ঐক্যফ্রন্টের মহাসচিব মো. রেজাউল হক বলেন, ‘নিয়োগ বা তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কিছু অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করা যেতে পারে। যেসব ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেসব ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু অভিযোগের কারণে যাদের নিয়োগ ও কাগজপত্র বৈধ, তাদেরও অনির্দিষ্টকাল অনুদানের বাইরে রাখা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।
অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ
অনুদানবঞ্চিত শিক্ষকদের অভিযোগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ থাকার পরও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যকর উদ্যোগের অভাবে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে মাদ্রাসা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ইতিবাচক মনোভাব থাকলেও অনুদান ছাড়ে গড়িমসি করা হচ্ছে।
শিক্ষকদের দাবি, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে এবং অভিযোগগুলো দ্রুত যাচাই করা হলে এত দীর্ঘ সময় ধরে তাদের অনুদানবঞ্চিত থাকতে হতো না।
এটি কেবল অনুদানের অর্থ ছাড়ের প্রশাসনিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১ হাজার ৬৯০টি পরিবারের জীবিকা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা।- মো. মনিরুজ্জামান, মহাসচিব, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা জাতীয় শিক্ষক ঐক্যফ্রন্ট
এ বিষয়ে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা জাতীয় শিক্ষক ঐক্যফ্রন্টের যুগ্ম মহাসচিব মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এটি কেবল অনুদানের অর্থ ছাড়ের প্রশাসনিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১ হাজার ৬৯০টি পরিবারের জীবিকা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে প্রকৃত যোগ্য শিক্ষকদের অনুদান চালুর উদ্যোগ নেবে এবং দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা থেকে তাদের পরিবারগুলোকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান এ শিক্ষক নেতা।
জানতে চাইলে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘১৬৯০ জনের যে তালিকা করা হয়েছিল তা নিয়ে অভিযোগ ছিল। অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্ত করে কিছু শিক্ষককে তালিকা বাদ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আগামী সপ্তাহে সভা করে তালিকা চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। নভেম্বর মাসের মধ্যে শিক্ষকদের অনুদান দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।