০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:৪৪

প্রতিষ্ঠানের কক্ষে গরু পালন, রশিদ ছাড়া টাকা আদায় ও অর্থ আত্মসাৎ— দায়মুক্তি দিল মন্ত্রণালয়

ড. মো: লোকমান ভূঞাঁ  © এ আই সম্পাদিত ছবি

নোয়াখালী সরকারি কলেজের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক ড. মো: লোকমান ভূঞাঁর বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষ দখল করে গরু পালন, প্রতিষ্ঠানের গাছ বিক্রির টাকা আত্মসাৎ, সহকর্মীকে মারধরসহ একাধিক অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছিল গঠিত তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে অভিযোগ উঠেছে, মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে প্রমাণিত অভিযোগ থেকে মুক্তি পেয়েছেন তিনি। বর্তমানে এ শিক্ষক ফেনীর ফুলগাজী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নোয়াখালী সরকারে কলেজে থাকাকালীন দাপটের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন লোকমান ভূঞাঁ। পাবলিক পরীক্ষার হলে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বহিরাগতদের প্রবেশে সহায়তা করেছেন; সরকারি গাছ কর্তন ও বিক্রি করে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। একই সঙ্গে কলেজের সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে ইজারা, সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং এক সহকর্মীর দিকে উত্তেজিত হয়ে তেড়ে যাওয়ার অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে একাধিক ব্যক্তি লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। এরপরও তাকে দায়মুক্তি দেওয়ার ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব অতিরিক্ত সচিব (নিরীক্ষা ও আইন অনুবিভাগ) দেলোয়ারা বেগম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। মাত্র শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেছি। এই মুহূর্তে এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারছি না।’

জানা গেছে, লোকমান ভূঞাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর সেনবাগ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এ কে এম সেলিম চৌধুরী এবং একই কলেজের প্রভাষক আবুল কালাম আজাদের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি বেশ কয়েকদিন ধরে তদন্ত করে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে সাক্ষীদের জবানবন্দি, লিখিত বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ, বিভিন্ন নথিপত্র এবং সরেজমিন পরিদর্শনের তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে সে সবই মন্ত্রণালয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড. লোকমান হোসেন ভূঞাঁ ছাত্রনেতা পরিচয়ধারী বহিরাগতদের নিয়ে পাবলিক পরীক্ষার হলে প্রবেশ করতেন। এ বিষয়ে অভিযোগকারী আব্দুর রাজ্জাক তদন্ত কমিটিকে একটি ভিডিও ফুটেজও দেন।অভিযোগকারী দাবি করেন, বহিরাগতরা পরীক্ষার হলে ঢুকে নির্দিষ্ট পরীক্ষার্থীদের নকল সরবরাহ এবং তাদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার জন্য কক্ষ পরিদর্শকদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন।

কলেজের কক্ষে চারটি গরু
নোয়াখালী সরকারি কলেজে দায়িত্ব পালনকালে লোকমান ভূঞাঁ কলেজের পুরাতন ক্যাম্পাসের কক্ষে দীর্ঘদিন চারটি গরু পালন করেছেন। বিষয়টি স্বীকারও করেছেন ড. লোকমান। তার দাবি, করোনাকালীন সময়ে কলেজ মসজিদের মোয়াজ্জিনের অসহায় পরিবারকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে মানবিক কারণে তিনি গরু পালনে সহযোগিতা করেছিলেন।

তবে তদন্ত কমিটি তার এ ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়, গরুগুলো মোয়াজ্জিনকে দান করা হয়নি এবং ড. লোকমান নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি গরুর দুধ নিতেন। অভিযোগের পর গরু বিক্রি করে পাওয়া অর্থও তিনি গ্রহণ করেছেন।

কলেজের সহকারী কর্মচারী মন্টু চন্দ্র নাথ বলেন, ড. লোকমানের নির্দেশে মোয়াজ্জিন মিজানুর রহমানের মাধ্যমে চারটি গরু কলেজের কক্ষে পালন করা হতো।  কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া প্রায় তিন বছর সরকারি কলেজের কক্ষ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন ড. লোকমান।

নামমাত্র মূল্যে পুকুর-জমি ইজারা
নোয়াখালী সরকারি কলেজের পুকুর ও চাষের জমি কম মূল্যে ইজারা দেওয়ার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে। ড. লোকমানের বক্তব্য ছিল, পুরাতন ক্যাম্পাসের পুকুরে ব্যক্তিমালিকানার অংশ থাকায় সেটি ইজারা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে নতুন ক্যাম্পাসের পুকুর ও কৃষিজমি সরকারি নিয়ম মেনেই ইজারা দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত কমিটি বলেছে, পুরাতন পুকুরের ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানার বিষয়টি সত্য এবং নতুন ক্যাম্পাসে ইজারা দেওয়ার নথিও রয়েছে। তবে কয়েক একর জমিসহ বড় একটি পুকুর তিন বছরের জন্য মাত্র ৭৫ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়ায় সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। এক সাক্ষীর বক্তব্যে ইজারার অঙ্ক এক লাখ টাকা বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইজারা মূল্যের বিষয়ে তদন্ত নথিতে অসঙ্গতিও দেখা যায়।

সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ
ড. লোকমানের বিরুদ্ধে সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও করেন একাধিক শিক্ষক। সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবুল হাসানের লিখিত জবানবন্দিতে দাবি করা হয়, শিক্ষক পরিষদের সভায় ড. লোকমান সিনিয়র সহকর্মীদের বক্তব্যে কর্কশ ভাষায় বাধা দিতেন এবং বিভিন্ন সহকর্মীর সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন।

অভিযোগকারী আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেন, ড. লোকমান তার দিকে তেড়ে এসে থাপ্পড় মারেন। তবে তিনি হাত দিয়ে তা ঠেকিয়ে দেন। ড. লোকমান এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আব্দুর রাজ্জাক তার কথোপকথন ভিডিও করছিলেন। এতে উত্তেজিত হয়ে তিনি ভিডিও ধারণ বন্ধ করার জন্য তার দিকে এগিয়ে যান মাত্র।

তদন্ত কমিটির পর্যালোচনায় বলা হয়, ভিডিও ফুটেজ ও সাক্ষ্য অনুযায়ী ড. লোকমান উত্তেজিত হয়ে আব্দুর রাজ্জাকের দিকে তেড়ে গিয়েছিলেন। তার ডান হাতও ওঠানো হয়েছিল। কিন্তু হাতটি মোবাইল ফোনে নাকি মুখে লেগেছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কোনো সাক্ষীও সরাসরি থাপ্পড় মারার বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও গুরুতর অভিযোগ
তদন্ত প্রতিবেদনে ড. লোকমানের বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগের উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে কলেজ প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ, ছাত্রনেতাদের ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, অবৈধ ভর্তি-বাণিজ্য, রশিদ ছাড়া টাকা আদায়, ভুয়া ভাউচারে অর্থ আত্মসাৎ এবং চাঁদা দাবির মতো অভিযোগও রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, ড. লোকমান প্রায় ২৪ বছর নোয়াখালী সরকারি কলেজে কর্মরত থাকায় সেখানে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাববলয় তৈরি করেছিলেন। ছাত্রনেতাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ
ড. মো: লোকমান ভূঞাঁকে দায়মুক্তি দেওয়ার পেছনে আওয়ামী ঘরানার এক যুগ্মসচিব এবং এক উপসচিবের নাম সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, এই দুই কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই অভিযোগের প্রমাণ থাকার পরও দায়মুক্তি পেয়েছেন ড. লোকমান। এক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড. মো: লোকমান ভূঞাঁ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘একটি চক্র ইচ্ছাকৃতভাবে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিল। যার সবই মিথ্যা।’ অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্ত কমিটি প্রমাণ পেল কীভাবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘তদন্ত কমিটির লোকজন আমার বিপক্ষে কাজ করেছে। সেজন্য তারা ভুল প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্মসচিব ও এক উপসচিবকে ম্যানেজ করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যাদের কথা বলছেন, তাদের আমি চিনি না। ম্যানেজের প্রশ্নই আসে না।’