০৩ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৫৪

শিক্ষকদের বদলিতে ‘সমস্তর’ শর্ত শিথিলের দাবি

লোগো  © ফাইল ছবি

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম শুরু হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছিল শিক্ষকদের মাঝে। কিন্তু বদলি নীতিমালায় ‘সমস্তর’ শর্ত যুক্ত হওয়ায় সেই স্বস্তি অনেকটাই হতাশায় পরিণত হয়েছে। একই পদ, একই বিষয় ও সমযোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধু প্রতিষ্ঠানের স্তর ভিন্ন হওয়ায় নিজ জেলা বা উপজেলার কাছাকাছি প্রতিষ্ঠানে বদলির জন্য আবেদন করতে পারছেন না অনেক শিক্ষক।

এ অবস্থায় বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি নীতিমালা-২০২৬ (সংশোধিত)-এর ৩.৩ ধারায় থাকা ‘সমস্তর’ সংক্রান্ত শর্ত শিথিল বা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা।

শিক্ষকদের দাবি, বদলির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের স্তরের চেয়ে শিক্ষকের পদ, বিষয়, যোগ্যতা ও এনটিআরসিএ সনদের বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একই পদে ও একই বিষয়ে কর্মরত একজন শিক্ষককে শুধু প্রতিষ্ঠানের স্তরভেদের কারণে বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা বাস্তবসম্মত নয়।

শিক্ষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে মাত্র ১৩ হাজার ৬৭৮টি বদলির আবেদন পড়েছে। তাদের দাবি, এটি মোট শূন্যপদের মাত্র ১৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক শূন্যপদ থাকলেও ‘সমস্তর’ শর্তের কারণে প্রায় ৮৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ শূন্যপদের বিপরীতে আবেদন করার সুযোগ তৈরি হয়নি।

শিক্ষকদের ভাষ্য, বিষয়টি শুধু একটি প্রশাসনিক শর্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকা অসংখ্য শিক্ষকের ব্যক্তিগত জীবন ও মানবিক কষ্ট।

রাবেয়া খাতুন নামে এক শিক্ষক বলেন, ‘আমরা উচ্চ মাধ্যমিক থেকে স্নাতক কলেজে যাওয়ার সুযোগ চাই না, কিংবা পদোন্নতির কোনো সুবিধাও চাই না। আমরা শুধু একই পদে, একই বিষয়ে নিজ এলাকার কাছাকাছি একটি প্রতিষ্ঠানে বদলি হতে চাই। অথচ একই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধু ‘সমস্তর’ শর্তের কারণে সেই সুযোগও পাচ্ছি না।’

শিক্ষকদের অন্যতম যুক্তি, এনটিআরসিএর শিক্ষক নিবন্ধন সনদে নির্দিষ্ট বিষয় ও পদের যোগ্যতার কথা উল্লেখ থাকে। সনদে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের যোগ্যতার কথা উল্লেখ থাকলেও বর্তমান বদলি নীতিমালায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কয়েকটি উপ-স্তরে ভাগ করা হয়েছে।

শিক্ষকদের দাবি, নিয়োগের সময় একই নিবন্ধন সনদের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পদ ও বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও বদলির সময় নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ ও স্নাতক কলেজের মতো স্তরভেদ তৈরি করায় একই পদ ও বিষয়ের শিক্ষকরা আলাদা হয়ে যাচ্ছেন।

তাদের প্রশ্ন, নিয়োগের সময় যে যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, বদলির সময় একই যোগ্যতাকে কেন যথেষ্ট হিসেবে বিবেচনা করা হবে না?

শূন্যপদ থাকলেও আবেদন করার সুযোগ নেই
শিক্ষকদের অভিযোগ, অনেক শিক্ষক নিজ উপজেলা বা জেলায় নিজের বিষয় ও সমপদের একাধিক শূন্যপদ দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানের স্তর বর্তমান কর্মস্থলের স্তরের সঙ্গে না মেলায় তাঁরা আবেদনই করতে পারছেন না।

বিশেষ করে জেলা শহরের অনেক কলেজে ডিগ্রি (পাস) কোর্স চালু থাকলেও সেই স্তর এমপিওভুক্ত না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো বদলির ক্ষেত্রে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে শিক্ষকরা জানান। ফলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এসব প্রতিষ্ঠানে একই বিষয় ও পদে শিক্ষকতার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেবল এমপিও কাঠামোর স্তরভেদের কারণে বদলির ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষকদের উদাহরণ হিসেবে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার রামপাল কলেজ ও কেরানীগঞ্জের নয়াবাজার ডিগ্রি কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানে ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম থাকলেও এমপিও কাঠামোর কারণে বদলির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্তর নির্ধারণে ভিন্নতা তৈরি হচ্ছে।
পূর্ববর্তী নীতিতে ছিল না ‘সমস্তর’ শর্ত

শিক্ষকদের আরেকটি দাবি, ২০২৪ সালে জারি করা বদলি-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন এবং ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জারি করা বদলি নীতিমালায় ‘সমস্তর’ শর্তের উল্লেখ ছিল না। সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনে নতুন করে এই শর্ত যুক্ত হওয়ায় এর আইনগত ও প্রশাসনিক ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

তাদের মতে, একই পদ, একই বিষয় ও একই যোগ্যতার শিক্ষককে শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের স্তরের পার্থক্যের কারণে বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার আগে বিষয়টির বাস্তব প্রভাব পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

শিক্ষকরা আরও বলছেন, চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তিতে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নতুন করে আবেদন করার সুযোগ বন্ধ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন বা বদলির জন্য নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় রাখা হয়েছিল। ফলে কর্মরত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের ধারণাটি নতুন নয়।

পরিবার থেকে দূরে থাকা শিক্ষকদের মানবিক কষ্ট
বদলির আবেদনকারীদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে নিজ জেলা বা পরিবারের কাছ থেকে দূরে চাকরি করছেন। কেউ প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কর্মস্থলে যান, আবার কেউ সপ্তাহ বা মাসের পর মাস পরিবার থেকে দূরে থাকেন। সন্তানদের পড়াশোনা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনা কিংবা পারিবারিক নানা দায়িত্ব সামলানো তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।

শিক্ষকদের দাবি, তাদের অনেকেই বহু বছর ধরে বদলির অপেক্ষায় ছিলেন। বদলি কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর তাঁরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন। কিন্তু ‘সমস্তর’ শর্তের কারণে সেই প্রত্যাশা পূরণের সুযোগও অনেকের সামনে সীমিত হয়ে গেছে।

আমিনুল ইসলাম নামে এক শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের পরিবার আছে, সন্তান আছে, বৃদ্ধ বাবা-মা আছেন। চাকরির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরিবার থেকেও আমরা যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি। আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না। শুধু একই পদ, একই বিষয় ও একই স্কেলে নিজের এলাকার কাছাকাছি বদলির সুযোগ চাই।’

‘সমস্তর’ শর্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান
শিক্ষকদের মতে, বদলির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের স্তরভেদের পরিবর্তে শিক্ষক কোন পদে কর্মরত, কোন বিষয়ে পাঠদান করছেন এবং এনটিআরসিএ সনদ অনুযায়ী তার যোগ্যতা কী—এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে শূন্যপদগুলোর কার্যকর ব্যবহারও সম্ভব হবে।

তারা বলেন, এতে কোনো শিক্ষককে উচ্চতর পদে পদায়ন বা অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হবে না; বরং একই পদ, একই বিষয় ও সমস্কেলে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।

এ কারণে শিক্ষকসমাজের পক্ষ থেকে ‘বেসরকারি শিক্ষক বদলি নীতিমালা-২০২৬ (সংশোধিত)’-এর ৩.৩ ধারায় থাকা ‘সমস্তর’ সংক্রান্ত শর্ত প্রয়োজনীয় সংশোধন বা শিথিল করে এনটিআরসিএ নিবন্ধন সনদ অনুযায়ী একই পদ, বিষয় ও সমস্কেলে যোগ্য শিক্ষকদের অধিকতর বিস্তৃত পরিসরে আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

শিক্ষকদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার পর চালু হওয়া বদলি কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও মানবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের এই দাবিটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

এ বিষয়ে জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিক কল দেওয়া হলেও তারা কেউই ফোন রিসিভ করেননি।