১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:৩৪

শিক্ষাখাতে কর্মসংস্থানের হার: ৩০ শতাংশের বৃত্ত ভাঙতে পারছে না নারীরা

শিক্ষাখাতে নারীর অংশগ্রহণ কম  © এআই ছবি

শিক্ষাখাতকে সাধারণত নারীদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ ও উপযোগী কর্মক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিক্ষকতা ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশায় নারীদের অংশগ্রহণও দীর্ঘদিন ধরে বাড়ছে। তবুও দেশের শিক্ষা খাতের সামগ্রিক কর্মসংস্থানের চিত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন বাস্তবতা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বাড়লেও এ খাতে নারীদের কর্মসংস্থান এখনো এক-তৃতীয়াংশের নিচে। বিপরীতে, মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০ শতাংশই পুরুষের দখলে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর জাতীয় প্রতিবেদনের এমন চিত্র উঠে এসেছে।

শুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের শিক্ষা খাতে মোট অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৯৯১টি। সেখানে কর্মরত ২৪ লাখ ৫৪ হাজার ৭৬৬ জনের মধ্যে পুরুষই ১৭ লাখ ৫ হাজার ৭০৯ জন। বিপরীতে নারী কর্মী ৭ লাখ ৪৯ হাজার ৫৭ জন। অর্থাৎ মোট কর্মসংস্থানের ৬৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ পুরুষের, আর নারীর অংশ ৩০ দশমিক ৫১ শতাংশ। 

শহর-গ্রামেও বড় ব্যবধানে পিছিয়ে নারীরা
শিক্ষা খাতের অর্থনৈতিক ইউনিট ও কর্মসংস্থানের বড় অংশই গ্রামীণ এলাকায়। গ্রামে রয়েছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৬৪টি অর্থনৈতিক ইউনিট। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১৪ লাখ ৩৯ হাজার ৮৩ জনের মধ্যে পুরুষ ৯ লাখ ৭১ হাজার ৩০৮ জন এবং নারী ৪ লাখ ৩২ হাজার ৬৭৫ জন। অর্থাৎ গ্রামীণ শিক্ষা খাতে নারীর অংশ ৩০ দশমিক ৮২ শতাংশ।

শহুরে এলাকায় অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৯২৭টি। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১০ লাখ ৫০ হাজার ৭৮৩ জনের মধ্যে পুরুষ ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৪০১ জন এবং নারী ৩ লাখ ১৬ হাজার ৩৮২ জন। শহরের শিক্ষা খাতে নারীর অংশ ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ। অর্থাৎ শহর ও গ্রাম দুই এলাকাতেই শিক্ষা খাতে নারী কর্মীর অংশ প্রায় ৩০ শতাংশ। গ্রামে নারী কর্মীর অংশ শহরের তুলনায় সামান্য বেশি হলেও ব্যবধান খুবই কম।

শিক্ষার স্তর যত ওপরে, অংশগ্রহণও তত কম
শিক্ষার স্তরভেদে নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের ব্যবধান আরও স্পষ্ট। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি। এ পর্যায়ের ১১ লাখ ৯০ হাজার ১০১ জন কর্মীর মধ্যে নারী ৪ লাখ ২৯ হাজার ২৭৯ জন, অর্থাৎ ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ। পুরুষ ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮২২ জন।

মাধ্যমিক শিক্ষায় নারীর অংশ নেমে এসেছে ২৬ দশমিক ৮৪ শতাংশে। এ পর্যায়ে মোট কর্মী ৮ লাখ ৩৫ হাজার ৫৩২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ লাখ ১১ হাজার ২৫৫ জন এবং নারী ২ লাখ ২৪ হাজার ২৭৭ জন। শুধু সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষার তথ্য ধরলে নারী কর্মীর অংশ ২৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। এ খাতে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ১৩০ জনের মধ্যে পুরুষ ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৬০২ জন এবং নারী ২ লাখ ১৫ হাজার ৫২৮ জন।

কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় নারী কর্মীর অংশ আরও কম। এ খাতে ৪১ হাজার ৪০২ জন কর্মীর মধ্যে নারী মাত্র ৮ হাজার ৭৪৯ জন, যা ২১ দশমিক ১৩ শতাংশ। পুরুষ কর্মী ৩২ হাজার ৬৫৩ জন। উচ্চশিক্ষাতেও নারীর অংশ এক-চতুর্থাংশের নিচে। মোট ২ লাখ ৯ হাজার ৬১৯ জন কর্মীর মধ্যে নারী ৫০ হাজার ৪৩৩ জন, অর্থাৎ ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। পুরুষ ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৮৬ জন।

কোন কাজে কত নারী
শিক্ষা খাতের বিভিন্ন উপখাতের তথ্যেও নারী-পুরুষের ব্যবধান স্পষ্ট। ‘অন্যান্য শিক্ষা’ খাতে মোট ২ লাখ ১২ হাজার ৪৩১ জন কর্মীর মধ্যে নারী ৪৩ হাজার ৪৫ জন, অর্থাৎ ২০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এ খাতে পুরুষ কর্মী ১ লাখ ৬৯ হাজার ৩৮৬ জন।এর মধ্যে ‘অন্যান্য শিক্ষা, শ্রেণিবহির্ভূত’ বা ৮৫৪৯ কোডের খাতে ২ লাখ ২ হাজার ১৬৫ জনের মধ্যে নারী ৪০ হাজার ৭৫৩ জন। নারী কর্মীর অংশ ২০ দশমিক ১৬ শতাংশ।

সাংস্কৃতিক শিক্ষায় নারী কর্মীর অংশ তুলনামূলক বেশি হলেও তা এক-তৃতীয়াংশের নিচে। এ খাতে ৭ হাজার ১৫৯ জনের মধ্যে নারী ১ হাজার ৮৯১ জন, অর্থাৎ ২৬ দশমিক ৪১ শতাংশ। পুরুষ ৫ হাজার ২৬৮ জন। ক্রীড়া ও বিনোদন শিক্ষায় নারী কর্মীর অংশ সবচেয়ে কমগুলোর একটি। ৩ হাজার ১০৭ জনের মধ্যে নারী মাত্র ৪০১ জন, অর্থাৎ ১২ দশমিক ৯১ শতাংশ। পুরুষ ২ হাজার ৭০৬ জন।

অন্যদিকে শিক্ষা সহায়তামূলক কার্যক্রমে ৭ হাজার ৮৩ জন কর্মীর মধ্যে নারী ২ হাজার ২৩ জন। এ খাতে নারীর অংশ ২৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং পুরুষ ৫ হাজার ৬০ জন।

স্থায়ী প্রতিষ্ঠানেও দখল পুরুষদের
শিক্ষা খাতের মোট ২ লাখ ৯৮ হাজার ৯৯১টি অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে স্থায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৭৯২টি। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৪ লাখ ১৮ হাজার ৬২৬ জনের মধ্যে পুরুষ ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৩০২ জন এবং নারী ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৩২৪ জন।

স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের গ্রামীণ অংশে ১৩ লাখ ৮৬ হাজার ৩৪৭ জন কর্মরত। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ৯ লাখ ৬০ হাজার ৮৯ জন এবং নারী ৪ লাখ ২৬ হাজার ২৫৮ জন। শহরের স্থায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১০ লাখ ৩২ হাজার ২৭৯ জনের মধ্যে পুরুষ ৭ লাখ ২২ হাজার ২১৩ জন এবং নারী ৩ লাখ ১০ হাজার ৬৬ জন।

অন্যদিকে অস্থায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৫ হাজার ৩২০ জনের মধ্যে পুরুষ ৩ হাজার ৭০৬ জন এবং নারী ১ হাজার ৬১৪ জন। এসব প্রতিষ্ঠানে নারীর অংশ ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানেও পুরুষের আধিক্য
পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানে নারী-পুরুষের ব্যবধান আরও বড়। শিক্ষা খাতের পূর্ণকালীন কর্মীদের মধ্যে পুরুষ ১২ লাখ ৫৬ হাজার ৭২০ জন এবং নারী ৫ লাখ ৭০ হাজার ১২৩ জন। খণ্ডকালীন কর্মীদের মধ্যে পুরুষ ৭১ হাজার ২৩০ জন এবং নারী ২৮ হাজার ৭৭৭ জন। শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করছেন ৭৪ হাজার ৬৯ জন পুরুষ ও ৩৪ হাজার ৪২ জন নারী। এ ছাড়া খণ্ডকালীন ও অন্যান্য ধরনের কর্মসংস্থানেও পুরুষের সংখ্যা নারীদের চেয়ে বেশি।

শিক্ষিত হলেও কর্মস্থলে অংশগ্রহণ কেন কম
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নিরাপত্তাহীনতাও নারীদের কর্মসংস্থানে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বেসরকারি ও ক্ষুদ্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা এবং পারিবারিক দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করার সুযোগের ঘাটতি নারীদের জন্য বাড়তি বাধা তৈরি করছে।

নারী অধিকারকর্মীদের মতে, শুধু নারীর শিক্ষার হার বাড়ালেই কর্মসংস্থানে বৈষম্য কমবে না। শিক্ষিত নারীদের শ্রমবাজারে প্রবেশের পাশাপাশি তাঁদের ধরে রাখার উপযোগী পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বেসরকারি ও ক্ষুদ্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় এনে নারী কর্মীদের নিরাপদ, স্থিতিশীল ও টেকসই কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মহিলা পরিষদের সভাপতি  ডা. ফওজিয়া মোসলেম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, 'নারীদের জন্য অবশ্যই অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সব নারী কর্মজীবিদের জন্য সুবিধাজনক আইন রাখা প্রয়োজন। তাহলেই কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে। দেশও সমৃদ্ধ হবে।'