১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:৫৪

১১ লাখ পাস, কলেজে আবেদন ১০ লাখ: এসএসসির বাকি দেড় লাখ শিক্ষার্থী গেল কোথায়?

এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা  © সংগৃহীত

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ফল প্রকাশের পর উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পছন্দের কলেজে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে। তবে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েও এখনো প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করেনি। ফলে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেও এসব শিক্ষার্থী কোথায় যাচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সারা দেশে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য সরকারি-বেসরকারি কলেজগুলোতে রয়েছে ২৫ লাখের বেশি আসন। বিপরীতে চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬২ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ সব উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও বিপুলসংখ্যক আসন খালি থেকে যাবে। সংখ্যায় যা প্রায় ১৫ লাখ। আবার পাস করা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এখনো ভর্তির আবেদন না করায় অনেক কলেজে শিক্ষার্থী সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬২ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের মধ্যে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা—এই তিন বিভাগে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে ৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৩০ জন। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেও এখনো ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৩২ জন শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়নি। অর্থাৎ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনো শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো উচ্চমাধ্যমিকে যাওয়ার জন্য আবেদন করেনি।

একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পছন্দের বড় একটি অংশ রাজধানী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পরিচিত কলেজগুলো। ফলে একই সময়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দুই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। একদিকে রাজধানীসহ বড় শহরের নামি কলেজগুলোতে নির্দিষ্ট কয়েকটি আসনের জন্য বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী আবেদন করছে। পছন্দের কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে অনেক মফস্বল ও গ্রামের কলেজে আসন অনুযায়ী শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না।

শিক্ষার্থী সংকটের কারণে এসব কলেজের অনেক আসন প্রতিবছরই খালি থেকে যায়। এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং একাদশে ভর্তির আবেদনকারীর সংখ্যা বিবেচনায় নিলে এসব কলেজে সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তবে এসব শিক্ষার্থীর সবাই যে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়েছে, এমনটি বলার সুযোগ নেই। তাদের কেউ অন্য কোনো শিক্ষাব্যবস্থায় যেতে পারে, কেউ কারিগরি বা মাদ্রাসা শিক্ষায় যুক্ত হতে পারে, আবার কেউ অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তির পরিকল্পনা করতে পারে। একইভাবে আর্থিক সংকট, পারিবারিক সমস্যা কিংবা অন্যান্য কারণে কেউ পড়াশোনা থেকেও ছিটকে যেতে পারে। কিন্তু এই দেড় লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে ঠিক কতজন কোন পথে যাচ্ছে, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় নি ।

দারিদ্রতাসহ নানা সমস্যা রয়েছে। কেউ কেউ দারিদ্রতার কারণে হয়তো পড়াশোনা করতে পারে না। আবার কেউ কেউ পুলিশসহ অন্যান্য সরকারি চাকরিতে চলে যায়। কেউ বা আবার পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে প্রবাসে চলে যায়। তবে বড় একটা অংশ পলিটেকনিক, ম্যাটস বা অন্যান্য কারিগরি শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে চলে যায়। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে নিকটবর্তী প্রতিষ্ঠান না থাকার কারণে হয়তো পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। অনেক মেয়ে বাল্য বিবাহে আবদ্ধ হবার কারণেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না।

নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক জামালপুরের একটি বেসরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলেন, আমরা প্রতিবছর এসএসসি ফল প্রকাশের পর একাদশে ভর্তি নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তায় থাকি। আশপাশের বিদ্যালয়গুলোতে পাসের হার কম থাকায় সম্ভাব্য শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে গেছে। আবার যারা পাস করে বা ভালো ফলাফল করে, তাদের একটি অংশ রাজধানীতে বা জেলা শহরের ভালো কলেজে যেতে চায়। গ্রামের কলেজে শিক্ষার্থী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মী সোহেল রানা বলেন, আমাদের দেশে বাল্যবিবাহ, দারিদ্রতাসহ নানা সমস্যা রয়েছে। কেউ কেউ দারিদ্রতার কারণে হয়তো পড়াশোনা করতে পারে না। আবার কেউ কেউ পুলিশসহ অন্যান্য সরকারি চাকরিতে চলে যায়। কেউ বা আবার পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে প্রবাসে চলে যায়। তবে বড় একটা অংশ পলিটেকনিক, ম্যাটস বা অন্যান্য কারিগরি শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে চলে যায়। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে নিকটবর্তী প্রতিষ্ঠান না থাকার কারণে হয়তো পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। অনেক মেয়ে বাল্য বিবাহে আবদ্ধ হবার কারণেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না।

কলেজে ভর্তির আবেদন না করার বিষয়ে রাষ্ট্রের তদারকির ঘাটতি উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, প্রথম কথা হলো, ভর্তি আবেদন না করা শিক্ষার্থীরা কী করবে, তা রাষ্ট্র জানতে চেয়েছি কি না—আমাদের কি জানার জন্য কোনো টেস্টিং সিস্টেম আছে? তা নেই। এনআইডি কার্ড বা রোল নম্বরের বিপরীতে তারা এখন কোথায় আছে, তার একটি ডাটাবেজ থাকা প্রয়োজন ছিল।

তিনি আরও বলেন, ভর্তি না হওয়া শিক্ষার্থী যদি পলিটেকনিকে যায়, কর্মসংস্থানে যোগ দেয় কিংবা বিদেশে চলে যায়- সেটির সঠিক ডাটাবেজ থাকা উচিত। কিন্তু শিক্ষার এই সামগ্রিক বিষয় নিয়ে কাজ না করে কেবল দায়সারাভাবে রুটিন কাজ চালানো হচ্ছে। লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ফেল করা কিংবা পাশ করার পর কলেজে ভর্তি না হওয়া নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তদারকি নেই। 

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে এই অধ্যাপক বলেন, আমাদের মূলত প্রয়োজন ছিল একটি সঠিক শিক্ষা দর্শন নির্ধারণ করা এবং তার আলোকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা। অথচ বর্তমানে এমপি-মন্ত্রীদের চাহিদামতো কথায় কথায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে কিংবা কাছের ও সুপারিশপ্রাপ্ত স্কুলগুলোকে জাতীয়করণ করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক, ডাটাবেজ বা গবেষণালব্ধ প্রমাণ ছাড়াই স্মার্ট বোর্ড বা তৃতীয় ভাষা শেখানোর মতো বিষয় আনা হচ্ছে, যা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি বিশৃঙ্খল বা ‘খিচুড়ি, অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো—একটি শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করে প্রথমে সঠিক শিক্ষা দর্শন নির্ধারণ করা এবং তার আলোকে একটি সামগ্রিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা। সেই নীতিমালার ভিত্তিতেই ঠিক করতে হবে কোন শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে, কতগুলো প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ও বিষয় কী হবে এবং দেশের প্রয়োজন ও জব মার্কেটের চাহিদা অনুযায়ী কীভাবে শিক্ষার্থী তৈরি করা হবে। কোনো সামগ্রিক নীতিমালা ছাড়াই আমরা বর্তমানে কাজ করে যাচ্ছি। এ ধরনের সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।