শিক্ষা ক্যাডার সমিতিতে নজিরবিহীন নয়ছয়: নথিপত্র গায়েব, ভুয়া বিলে কোটি টাকার অনিয়ম
বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারদের সবচেয়ে বড় সংগঠন ‘বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি (বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন)’-এর অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ভয়াবহ অনিয়ম, ব্যাপক হিসাব কারচুপি এবং কোটি টাকার আর্থিক অসংগতির বিষয়টি সামনে এসেছে। সমিতির ২০১৬ থেকে ২০২৩ মেয়াদকালের অডিট ও অভ্যন্তরীণ পরিদর্শন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ভাউচার ছাড়াই লাখ লাখ টাকা তোলা হয়েছে, গায়েব করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ক্যাশ বই ও স্টক রেজিস্টার। এমনকি সাধারণ শিক্ষকদের চাঁদার টাকায় ব্যক্তিগত ফ্রিজ কেনা এবং একই ব্যক্তির খাবারের বিল দুইবার দেখিয়ে টাকা তোলার মতো নজিরবিহীন দুর্নীতিও হয়েছে।
২০২৪ সালে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার সমিতি বিগত কয়েক বছরের অডিট কার্যক্রম পরিচালনা করে এস অনিয়মের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটির বর্তমান কমিটির সদস্যরা। প্রফেসর এস এম মাহবুবুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত ৩ সদস্যের কমিটি এই অডিট কার্যক্রম পরিচালনা করে। অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সমিতির অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ন্যূনতম স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও হিসাববিজ্ঞানের স্বীকৃত নীতিমালা মানা হয়নি।
শিক্ষকদের স্বায়ত্তশাসিত এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনে যেভাবে কোটি টাকার হিসাবহীনতা ব্যয় ও ভুয়া ভাউচারের তথ্য মিলেছে, তাতে সারাদেশের শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের মাঝে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিচার দাবি করছেন সদস্যরা।
জানতে চাইলে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান সদস্য সচিব প্রফেসর ড. মো. মাসুদ রানা খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাাসকে বলেন, ‘২০১৩ থেকে ২০১৬ সালে আমরা যখন দায়িত্বে ছিলাম, তখন ১ কোটি ৮ লাখ টাকা রেখে এসেছিলাম। দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় বিল-ভাউচারসহ জমা দিয়েছিলাম। তবে ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কী হয়েছে তা বলতে পারছি না। তবে এই সময় যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে অভিযোগ ওঠা বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করছি।’
৩০ লাখ টাকার হদিস নেই, নথিপত্র গায়েব
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬ হতে ২০২২ মেয়াদের অডিটে বিশেষ তহবিল (মামলা) হতে মোট ৩৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা উত্তোলন করা হলেও মাত্র ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকার খরচের বিবরণ দেওয়া হয়। বাকি ৩০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা খরচের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা নথি অডিট কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হয়নি।
এ ছাড়া সমিতির মূল আয়-ব্যয় বিবরণী, ব্যাংক সংক্রান্ত চেক রেজিস্টার, কেনাকাটার স্টক রেজিস্টার, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক টাকা প্রাপ্তির রশিদ এবং বকেয়া চাঁদার বিস্তারিত হিসাব বিবরণী অডিট কমিটির কাছে জমা না দিয়ে গায়েব করার অভিযোগ করা হয়েছে অডিট রিপোর্টে।
মামলার তহবিলে ৪৬ লাখ টাকার অনিয়ম
মামলা পরিচালনার জন্য সমিতির পৃথক বিশেষ তহবিল থাকা সত্ত্বেও সেই খরচ মেটানো হয়েছে সাধারণ তহবিল থেকে। মামলা পরিচালনার নামে সাধারণ তহবিল থেকে ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ করা হলেও তার পেছনে কোনো অনুমোদিত রিকুইজেশন বা প্রয়োজনীয় কার্যবিবরণী ছিল না। তাছাড়া মামলা পরিচালনার জন্য শিক্ষকদের কাছ থেকে ওঠা চাঁদা প্রাপ্তির কোনো সঠিক হিসাবও অডিট কমিটি পায়নি।
অনিয়ম ও দুর্নীতির ৬ তথ্য
অডিট প্রতিবেদনে সমিতির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ১৬টি ভয়াবহ অসংগতি ও ফাইন্ডিংস তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল ব্যবহার করে শওকত হোসেন নামে এক ব্যক্তির ব্যক্তিগত নামে ফ্রিজ ক্রয় করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত সম্পূর্ণ ভাউচারবিহীন অবস্থায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে কোষাধ্যক্ষ কর্তৃক নাসিরুল আজম বাপ্পিকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং কাজী হাসান ও নাজমুল নামে দুই ব্যক্তিকে ৩ হাজার টাকা করে নগদ দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয়ত ২০২৩ সালের ২১ জুলাই নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির দুপুরের খাবারের বিল একই ভাউচারে দুইবার দেখানো হয়েছে, যার পরিমাণ ১৫ হাজার ৯০০ টাকা এবং ফটোকপি বাবদ ১ হাজার ৫০ টাকা।
চতুর্থত ২০২২ সালের এপ্রিল ও মে; এই দুই মাসের ক্যাশ বুকের কোনো হিসাবই পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া অধিকাংশ ভাউচারে কাটাকাটি, ওভাররাইটিং ছিল এবং তারিখ গায়েব করে রাখা হয়েছে।
পঞ্চম অনিয়ম হিসেবে সমিতির মহাসচিব এবং কোষাধ্যক্ষ পৃথকভাবে হিসাব সংরক্ষণ করায় দুই জনের হিসাবে ব্যাপক অমিল দেখা গেছে। যার ফলে সুষ্ঠুভাবে হিসাব নিরীক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
৬ষ্ঠ অনিয়ম হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, খরচের কোনো বিল-ভাউচারে ভ্যাট পরিশোধ করা হয়নি এবং সরকারি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও রেভিনিউ স্ট্যাম্প লাগানো হয়নি। কর্মচারীদের বেতন ও বোনাসের বিলেও কোষাধ্যক্ষ ও সম্পাদকের স্বাক্ষর ছিল না।
অডিট কমিটি তাদের সুপারিশে জানিয়েছে, প্রতিটি বিল ও ভাউচারে অবশ্যই নিয়ম মেনে যথাযথ কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর থাকতে হবে। ২৫ হাজার বা তার তদূর্ধ্ব সকল খরচের ক্ষেত্রে নগদের বদলে বাধ্যতামূলকভাবে চেকের মাধ্যমে লেনদেন নিশ্চিত করতে হবে।ক্যাশ বই ও আয়-ব্যয় বিবরণী তৈরিতে হিসাববিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। তবে বিগত ২০১৬-২০২৩ পর্যন্ত সংগঠনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা এটি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।