এমপিওভুক্ত শিক্ষকের চেয়ে খণ্ডকালীনের বেতন বেশি, বিসিএসআইআর স্কুলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতার চেয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বেশি দেওয়াসহ বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, খণ্ডকালীন শিক্ষকদের জাতীয় বেতন কাঠামোর আদলে বৈশাখী ভাতা ও ঈদ বোনাসও দেওয়া হচ্ছে। এতে নিয়মিত এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও খণ্ডকালীন শিক্ষকদের মধ্যে বেতন-ভাতায় ব্যাপক বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি বিসিএসআইআরে স্কুল অ্যান্ড কলেজের নানা অনিয়ম নিয়ে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) একাধিক অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। জমা হওয়া অভিযোগ এবং প্রতিষ্ঠানটির একাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষকের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি বিষয়ে তদন্ত চলছে। তবে সার্বিক অনিয়ম নিয়ে এখনো তদন্ত শুরু হয়নি। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অভিযোগ জমা দিলে তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির অষ্টম গ্রেডের একজন সিনিয়র শিক্ষক জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী প্রায় ৩২ হাজার ৩৯০ টাকার বেসিকে বেতন পান। ১০ শতাংশ কর্তনের পরে এমপিও অংশ ৩২ হাজার ৩০০ টাকা উত্তোলন করেন। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তহবিল থেকে তাকে প্রায় ৪৬ হাজার ৭৯৯ টাকা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে এমপিও এবং প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া অর্থ মিলিয়ে মাসে প্রায় ৭৯ হাজার টাকা সিনিয়র শিক্ষকদের দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, একজন অষ্টম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তার বেতন-ভাতা সাধারণত প্রায় ৪৮ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে হওয়ায় একই গ্রেডের এমপিওভুক্ত শিক্ষক প্রতিষ্ঠান থেকে অতিরিক্ত অর্থ পেলে তা সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এ খাতে প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ও বেড়েছে।
অষ্টম গ্রেডের একজন সিনিয়র শিক্ষক জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী প্রায় ৩২ হাজার ৩৯০ টাকার বেসিকে বেতন পান। ১০ শতাংশ কর্তনের পরে এমপিও অংশ ৩২ হাজার ৩০০ টাকা উত্তোলন করেন। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তহবিল থেকে তাকে প্রায় ৪৬ হাজার ৭৯৯ টাকা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে এমপিও এবং প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া অর্থ মিলিয়ে মাসে প্রায় ৭৯ হাজার টাকা সিনিয়র শিক্ষকদের দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের খণ্ডকালীন শিক্ষকদের অতিরিক্ত বেতন-ভাতা দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, খণ্ডকালীন শিক্ষিকা শিউলি আক্তারের নিয়োগের সময় মাসিক বেতন ছিল ৭ হাজার টাকা। পরে তা ১৫ হাজার টাকা করা হয়। চলতি বছরে তা বাড়িয়ে ২২ হাজার টাকা করা হয়েছে। একইভাবে অধিকাংশ খণ্ডকালীন শিক্ষকের বেতন ১৫-১৬ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২২ হাজার টাকা করা হয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অনেকেরই প্রতিষ্ঠান হতে প্রদত্ত বেতন ৭৫০০ থেকে ১৫০০০ এর মধ্যে।
শুধু বেতন নয়, খণ্ডকালীন শিক্ষকদের জন্য চলতি বছর রেজুলেশনের মাধ্যমে বৈশাখী ভাতা ও ঈদ বোনাস চালুর অভিযোগও উঠেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিএডবিহীন খণ্ডকালীন শিক্ষকদের ২ হাজার ৫০০ টাকা বৈশাখী ভাতা ও ১২ হাজার ৫০০ টাকা ঈদ বোনাস এবং বিএডধারী শিক্ষকদের ৩ হাজার ২০০ টাকা বৈশাখী ভাতা ও ১৬ হাজার টাকা ঈদ বোনাস দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তহবিল হতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা খণ্ডকালীন শিক্ষকের ভাতার কয়েকগুন কম।
শুধু তাই নয়; ম্যানেজিং কমিটিতে অভিভাবক সদস্যপদ বহাল রাখা, নিয়মিত সভার জন্য বিধিবহির্ভূত সম্মানী প্রদান, নীতিমালা অনুসরণ না করে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ, দ্বৈত স্কেলে বেতন-ভাতা প্রদান, গাইড বই কোম্পানির কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেওয়া, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আর্থিক অনিয়ম এবং এনটিআরসিএর শূন্য পদের তথ্য না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জাফর উল্লাহর বিরুদ্ধে।
ম্যানেজিং কমিটির সদস্যপদ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাকা শিক্ষা বোর্ড অনুমোদিত কমিটিতে অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে ড. শাহ জামালকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তার সন্তান ওই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করত। পরে সন্তান অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে গেলেও গত ছয় মাস যাবত তিনি কমিটিতে বহাল ছিলেন এবং ম্যানেজিং কমিটির মিটিংএ উপস্থিত থেকে হস্তক্ষেপ করেছেন।
ম্যানেজিং কমিটির সভা আয়োজনের ক্ষেত্রেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিটি সভায় আয়োজন করতে প্রায় ৪০থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সম্মানী ও আপ্যায়ন বাবদ প্রতিষ্ঠানের সাধারণ তহবিল থেকে ব্যয় করা হয়েছে। অথচ প্রবিধান অনুযায়ী কমিটির সভায় অংশগ্রহণের জন্য সম্মানী বাবদ ভাতা দেওয়ার সুযোগ নেই।
খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুসরণ না করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক খণ্ডকালীন শিক্ষককে পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে এবং চলতি বছরের এপ্রিল থেকে রেজুলেশনের মাধ্যমে তাদের উচ্চহারে বেতন দেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকের নিয়োগ পরীক্ষাও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে করা হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে দুইজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক থাকার পরেও একই বিষয়ে পাঁচজন খন্ডকালীন শিক্ষকের বেতন বাড়িয়ে ব্যানবেইসে যুক্ত করে স্বপদে পদে বহাল রাখা হয়েছে। যেখানে মানবিক শাখায় সব মিলিয়ে ৫০ জন শিক্ষার্থীও নেই।
এ ছাড়া ২০২৫ সালে একটি গাইড বই কোম্পানির কাছ থেকে প্রায় ৩ লাখ টাকা এবং ২০২৬ সালে আরেকটি গাইড বই কোম্পানির কাছ থেকে ৩.৫ লাখ টাকার বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, শিক্ষক তহবিল গঠনের নামে এসব অর্থ নেওয়া হলেও এর ব্যবহার ও হিসাব স্বচ্ছ নয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট গাইড বই কিনতে বাধ্য করা এবং ওই বই অনুসরণ করে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরির নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটা ও হিসাব-নিকাশ নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিভিন্ন কেনাকাটায় ভুয়া বিল-ভাউচার ব্যবহার করে অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যদের কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়াই হিসাব সম্পন্ন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্র, ব্যাংক হিসাব, বিল-ভাউচার ও রেজুলেশন পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আরও খবর: মাদ্রাসা শিক্ষকদের বদলি আবেদনের নোটিশে যা আছে
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাতী শাখার এক শিক্ষক বলেন, ‘খণ্ডকালীন শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি এবং চাকরিতে দীর্ঘায়িত করার জন্য এনটিআরসিএ ই-রিকুইজিশনে ৭ম গণ বিজ্ঞপ্তিতে শূন্য পদের তথ্য না দিয়ে কৃত্রিম শিক্ষক সংকট তৈরি করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। প্রতিটি শ্রেণিতে অনুমোদনবিহীন শাখা চালু রাখা হয়েছে। প্রতিটি শাখায় ৫৫ জন করে শিক্ষার্থী থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ শাখাতে কাম্য শিক্ষার্থী নেই। তবে একাধিক শাখা বহাল রেখে এর মাধ্যমে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।’
দিবা শাখার আরেক শিক্ষক বলেন, 'শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্থ মূলত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা। সেখানে বেতন-ভাতা, নিয়োগ, গাইড বই, কমিটির সভা কিংবা কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাই। বিশেষ ধারায় কমিটি হওয়ায় ইলেকশনের প্রয়োজন হয় না, কমিটির সকল সদস্য সিলেকশনে হয়; তাই সবকিছু প্রতিষ্ঠান প্রধান নিজের মতো করে সাজিয়ে নিতে পারেন। কাউকে তোয়াক্কাও করেন না। বিষয়গুলো সঠিকভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তদন্ত হলে সব বেরিয়ে আসবে।’
বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজে হওয়া অনিয়মের বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাফর উল্লাহর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে অভিযোগগুলো লিখে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিরুদ্ধে জমা হওয়া অভিযোগ এখনো আমার দপ্তরে আসেনি। আসলে এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’