১৯ আগস্ট ২০২৬, ১৯:০৮

তদন্তে সহকর্মী শিক্ষিকাকে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত, রেহাই মিলল বিএনপির নারী এমপির ডিও লেটারে

নারী এমপি সুরাইয়া জেরিন ও ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরী  © টিডিসি সম্পাদিত

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সহকর্মী এক শিক্ষিকাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্ক (ধর্ষণ) স্থাপন, পরে তা অস্বীকার এবং অভিযোগকারী ও তার সন্তানকে হত্যার হুমকির অভিযোগের প্রমাণ মিললেও শেষ পর্যন্ত বিভাগীয় শাস্তি থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন এক সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক। এই অব্যাহতির নেপথ্যে বড় ভূমিকা রাখার অভিযোগ উঠেছে বগুড়া-জয়পুরহাটের সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিনের  বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, সুরাইয়া জেরিন অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষে সাফাই গেছে একটি আধা-সরকারি (ডিও) চিঠি পাঠান মন্ত্রণালয়ে। চিঠিতে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে তিনি ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উল্লেখ করেছেন। পরে মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তদন্ত প্রতিবেদনসহ ওই ডিও লেটার বিবেচনায় নিয়েই বিভাগীয় মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়া শিক্ষকের নাম ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরী। বর্তমানে তিনি জয়পুরহাট সরকারী কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তবে ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনাটি তিনি যখন বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজে কর্মরত ছিলেন তখনকার বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে  ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভুক্তভোগী নারী তৌহিদুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কিছু ছবি প্রমাণ হিসেবে সংযুক্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবার লিখিত অভিযোগ করেন। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা বিষয়ক শাখার উপসচিব শাহিনা পারভিন অভিযোগ তদন্ত করে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তৎকালীন মহাপরিচালককে অনুরোধ করেন। 

অভিযোগের তদন্ত চলাকালীনই ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরীকে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ হাজী আবদুল বাতেন সরকারি কলেজে বদলি করা হয়েছিল। সেখান থেকে পরবর্তীতে জয়পুরহাট সরকারি কলেজে বদলি হয়ে আসেন তিনি।

গত ১৭ আগস্ট বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি পান  ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরী। তাকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব (শৃঙ্খলা) মো. আব্দুল জলিল মজুমদার।

এর আগে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ব্যক্তিগত শুনানীতে অংশগ্রহণ করেন তৌহিদুল আলম চৌধুরী। ওই শুনানী তার জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় পরবর্তীতে বিষয়টি অধিক তদন্ত করতে একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। ওই তদন্ত কর্মকর্তা গত ৬ জুলাই এ ‍সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনেও ড. গাজী তৌহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অংশিক প্রমাণিত বলে উল্লেখ করা হয়। এরপর তাকে কোনো শাস্তি না দিয়েই বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এর আগে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে নৈতিক চরিত্র স্খলনের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩ (খ) বিধি অনুযায়ী অসদাচরণের অভিযোগে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়।

ড. গাজীকে অব্যাহতি দেওয়া প্রজ্ঞাপনেও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রমাণ মেলার কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ড. গাজী তহিদুল চৌধুরী সরকারি আজিজুল হক কলেজে কর্মকালীন জেসমিন আক্তার নামে এক নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা শহরে নিয়ে এসে কাজী ছাড়া শুধু হুজুর দিয়ে বিয়ে করেন; যা পরবর্তীতে তিনি অস্বীকার করেন। তিনি জেসমিন আক্তার ও তার ছেলেকে হত্যার হুমকি প্রদান করেন; যা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে প্রমাণিত হয় এবং তিনি নৈতিক চরিত্র স্খলনের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী অসদাচরণ এর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়।

পরবর্তীতে শোকজের জবাব দেন ড. গাজী এবং ব্যক্তিগত শুনানীতে অংশগ্রহণ করেন। শুনানীতে প্রদত্ত বক্তব্য সন্তোষজনক না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৭(২)(ঘ) অনুযায়ী তদন্তের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা বিস্তারিত তদন্ত শেষে গত ৬ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আংশিক প্রমাণিত হলেও বগুড়া জয়পুরহাটের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিনের আধা-সরকারি পত্রে উল্লেখ করেছেন অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। বিভাগীয় মামলার অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী, তদন্ত প্রতিবেদন, সংসদ সদস্যের আধা-সরকারি পত্র এবং বিভাগীয় মামলার প্রাসঙ্গিক রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় তাকে সতর্ক করে বিভাগীয় মামলার দায় হতে অব্যাহতি দেওয়া হলো।’ 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নিরীক্ষা ও আইন) মো: মাহবুবুল হক পাটোয়ারী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এমপির ডিও লেটারে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট প্রসিডিউর রয়েছে। সেই প্রসিডিউর অনুযায়ী অভিযুক্তকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ড. গাজী তহিদুল চৌধুরীর ক্ষেত্রে কী হয়েছে তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব হচ্ছে না।’

ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় ডিও লেটার পাঠানোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে বগুড়া-জয়পুরহাটের সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিনের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে কল দেওয়া হলে ফুয়াদ নামে একজন ফোন রিসিভ করে জানান ‘এমপি মহোদয় চীফ হুইপের রুমে রয়েছে।’ ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরীর পক্ষে সুরাইয়া জেরিন ডিও লেটার পাঠিয়েছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ফুয়াদ জানান, ‘বিষয়টি আমি জানি, ম্যাডাম ডিও লেটার পাঠিয়েছিলেন।’

ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরীর পক্ষে সুরাইয়া জেরিন ডিও লেটার পাঠিয়েছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সংসদ সদস্যের বক্তিগত সহকারী ফুয়াদ জানান, ‘বিষয়টি আমি জানি, ম্যাডাম ডিও লেটার পাঠিয়েছিলেন।’

ড. গাজী তৌহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ
ভুক্তভোগী নারীর লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি বগুড়া শহরে এক সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন। ২০২২ সালে একটি অনুষ্ঠানে ড. গাজী মো. তৌহিদুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এরপর থেকে দু’জনের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তৌহিদুল আলম তাঁকে দ্বিতীয় স্ত্রী করার প্রস্তাব দেন এবং বগুড়া শহরের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন।

ভুক্তভোগী নারী অভিযোগ করেন, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তৌহিদুল আলম বগুড়ায় এবং ঢাকায় নিয়ে গিয়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাঁকে ‘ধর্ষণ’ করেন। একপর্যায়ে বিয়ের জন্য চাপ দিলে, তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং সম্পর্ক অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী নারী।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরীর ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।