স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করবেন? শিক্ষানুরাগীরা আবেদনসহ পুরো প্রক্রিয়া জানুন
বেসরকারি স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অনেককেই বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি, পাঠদানের অনুমতির নিয়ম না জানলে বিড়ম্বনা বাড়ে বহুগুণ। তবে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে খুব সহজেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা যায়। সব নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করলে সহজেই গড়তে পারবেন নিজের পছন্দের বিদ্যাপীঠ। তবে ভুল হলে আপনার স্বপ্ন পূরণ নাও হতে পারে।
জানা গেছে, বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় (৬ষ্ঠ-৮ম শ্রেণি), মাধ্যমিক বিদ্যালয় (৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণি), উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (৬ষ্ঠ-১২ম শ্রেণি) এবং উচ্চ মাধ্যমিক মহাবিদ্যালয় (১১শ-১২ম শ্রেণি) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক নির্ধারিত নির্দেশিকা ও ধারাবাহিকতা অনুসরণ করতে হবে। একটি ধাপ সম্পন্ন না হলে পরবর্তী ধাপের আবেদনই করা যাবে না। ফলে প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে অতিক্রম করতে হবে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক) স্থাপন, পাঠদান ও একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান নীতিমালা-২০২২ (সংশোধিত- ২০২৩) অনুযায়ী, একটি স্কুল বা কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রথমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘স্থাপন’ এর অনুমতি চেয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর আবেদন করতে হবে। এ ধাপ সম্পন্ন হলে পরবর্তী ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘পাঠদান’ এর অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। সবশেষ ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ‘একাডেমিক স্বীকৃতি’ পেতে পুনরায় শিক্ষা সচিব বরাবর আবেদন করার কথা বলা হয়েছে।
প্রথম ধাপ: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন
নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রাথমিক পদক্ষেপ হলো- সংশ্লিষ্ট মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের নিকট থেকে ‘স্থাপন’ লিখিত অনুমতি নেওয়া। তবে বর্তমানে বোর্ড থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া সামগ্রিক প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় আবেদন করতে হবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর।
বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় (৬ষ্ঠ-৮ম শ্রেণি), মাধ্যমিক বিদ্যালয় (৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণি), উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (৬ষ্ঠ-১২ম শ্রেণি) এবং উচ্চ মাধ্যমিক মহাবিদ্যালয় (১১শ-১২ম শ্রেণি) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক নির্ধারিত নির্দেশিকা ও ধারাবাহিকতা অনুসরণ করতে হবে। একটি ধাপ সম্পন্ন না হলে পরবর্তী ধাপের আবেদনই করা যাবে না। ফলে প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে অতিক্রম করতে হবে।
আবেদন জমা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য সরকার নির্ধারিত ফরম-‘ক’ (১) (নিম্ন মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে) বা ফরম-‘ক’ (২) (উচ্চ মাধ্যমিক/মহাবিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে) পূরণ করে শিক্ষা সচিব বরাবর আবেদন জমা দিতে হবে। আবেদনের সাথে আবেদনকারীর পরিচয়, আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) সত্যায়িত অনুলিপি, জমির বিবরণ ও খতিয়ান, প্রস্তাবিত স্থানের মৌজা, খতিয়ান/পর্চা, দাগ নম্বর এবং জমির পরিমাণ সংক্রান্ত দলিলপত্রের অনুলিপি জমা দিতে হবে।
জমির মালিকানা ও স্বত্ব সনদ
জমি দান বা হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রাপ্ত হলে নিঃশর্ত রেজিস্ট্রিকৃত দলিল এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক প্রদত্ত স্বত্ব ও মালিকানা সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে। ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে নোটারি পাবলিকের সম্মুখে সম্পাদিত নির্ধারিত ফরম-‘ক’ (৩) অনুযায়ী অঙ্গীকারনামা দাখিল করতে হবে।
প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানের চতুর্দিকে অবস্থিত নিকটবর্তী অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দূরত্ব উল্লেখ করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কর্তৃক প্রদত্ত দূরত্ব সনদও জমা দিতে হবে। এলাকা/থানা পরিসংখ্যান কর্মকর্তার নিকট থেকে সংগৃহীত এলাকাভিত্তিক ন্যূনতম জনসংখ্যার সনদপত্র। প্রতিষ্ঠানটির ধরন (বালক/বালিকা/সহশিক্ষা), স্তর এবং পাঠদানের মাধ্যম (বাংলা/ইংরেজি ভার্সন) স্পষ্টাক্ষরে উল্লেখ করতে হবে।
স্থাপনের প্রাথমিক শর্তাবলী
সিটি কর্পোরেশন, শিল্প এলাকা ও ১ম শ্রেণির পৌরসভার ক্ষেত্রে নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিকের জন্য ১ কিমি; উচ্চ মাধ্যমিক (স্কুল ও কলেজ/মহাবিদ্যালয়)-এর জন্য ২ কিমি। মফস্বল এলাকার ক্ষেত্রে নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিকের জন্য ২ কিমি; উচ্চ মাধ্যমিক-এর জন্য ৪ কিমি।
এলাকার ন্যূনতম জনসংখ্যা
নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১০ হাজার জন। উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের (৬ষ্ঠ-১২ম) ক্ষেত্রে ৬৫ হাজার (পঁয়ষট্টি হাজার) জন। উচ্চ মাধ্যমিক মহাবিদ্যালয়ের (১১শ-১২ম) ক্ষেত্রে ৭৫ হাজার (পঁচাত্তর হাজার) জন। তবে ভৌগোলিক সুবিধা, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা, হাওড়-বাওড়, দ্বীপ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে নীতিমালার বিশেষ বিবেচনায় শর্ত শিথিল করা যায়।
সরেজমিন পরিদর্শন ও অনুমোদন
শিক্ষা সচিব বরাবর আবেদনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা বা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে সরেজমিনে পরিদর্শনে যাবেন। পরিদর্শনকারী কর্মকর্তা ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে পরিদর্শন সম্পন্ন করে ইউএনওর মতামতসহ বোর্ডে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। পরবর্তীতে প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রদান বা আবেদন মঞ্জুর করা হবে। মঞ্জুরি কমিটির সুপারিশের পর বোর্ড সভায় এটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হবে।
দ্বিতীয় ধাপ: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের অনুমতি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি পাওয়ার পর জমির নামজারি, ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আসবাবপত্র প্রস্তুত করে ‘পাঠদান’-এর অনুমতি নিতে হয়। এ ধাপের জন্য অবকাঠামো ও জমিসংক্রান্ত শর্তাবলী পূরণ করতে হবে। জমি নিজস্ব নামে থাকা বাধ্যতামূলক, সংস্থার নামে জমি হস্তান্তর ও নামজারি সম্পন্ন করতে হবে। ভাড়াকৃত ভবনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হয় না।
ন্যূনতম জমির পরিমাণ
মফস্বল এলাকার নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ০.৫০ একর; মাধ্যমিকে ০.৭৫ একর; উচ্চ মাধ্যমিকে ১.০০ একর। ১ম শ্রেণির পৌরসভার ক্ষেত্রে নিম্ন মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে ০.৩০ একর; মাধ্যমিকে ০.৫০ একর; উচ্চ মাধ্যমিকে ০.৭৫ একর। সিটি কর্পোরেশন এলাকার নিম্ন মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে ০.২০ একর; মাধ্যমিকে ০.২৫ একর; উচ্চ মাধ্যমিকে ০.৩৫ একর জমি থাকা আবশ্যক।
অবকাঠামো, কম্পিউটার ও লাইব্রেরি সুবিধা
নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৩টি শ্রেণিকক্ষ, ১টি শিক্ষক/অফিস কক্ষ, ১টি লাইব্রেরি, ৩টি টয়লেট, ১টি কমন রুম; মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে ৫টি শ্রেণিকক্ষ, ২টি অফিস কক্ষ, ১টি লাইব্রেরি, ৪টি টয়লেট, ২টি কমন রুম; উচ্চ মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব ও আলাদা ওয়াশরুম থাকতে হবে। অন্যান্য আবশ্যিক অবকাঠামোর মধ্যে খেলার মাঠ (মফস্বলে), সুপেয় পানি, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের চলাচলের জন্য র্যাম্প সুবিধা থাকতে হবে।
আইসিটি ও বই সংস্থান
নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ৪টি কম্পিউটার ও ১ হাজারটি বই। মাধ্যমিকের ৬টি কম্পিউটার ও ২ হাজার বই। উচ্চ মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে ১৫টি পর্যন্ত কম্পিউটার ও ৩ হাজারটি বই থাকতে হবে।
সাধারণ ও সংরক্ষিত তহবিল
প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে স্থায়ী আমানত (FDR) বজায় রাখতে হয়। নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ তহবিল ১ লাখ এবং সংরক্ষিত তহবিল ২ লাখ টাকা। মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে সাধারণ তহবিল দেড় লাখ এবং সংরক্ষিত তহবিল ৩ লাখ টাকা। উচ্চ মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে সাধারণ তহবিল ২ লাখ এবং সংরক্ষিত তহবিল ৪ লাখ টাকা।
তৃতীয় ও শেষ ধাপ পরিদর্শন ও পাঠদানের চূড়ান্ত অনুমতি
নির্ধারিত ফরম ‘খ’ পূরণ করে পাঠদানের অনুমতির আবেদন জমা দিতে হবে। বোর্ড কর্তৃক পুনরায় সরেজমিন পরিদর্শন শেষে মঞ্জুরি কমিটির সুপারিশে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হবে। পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর ব্যানবেইস (BANBEIS) হতে EIIN (Educational Institute Identification Number) ও বোর্ড থেকে কোড সংগ্রহ করতে হবে। পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি কার্যকরী ‘ব্যবস্থাপনা কমিটি বা ম্যানেজিং কমিটি’ গঠন করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি লাভ
পাঠদানের অনুমতি মেলার পর নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত সফলভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের পর ‘অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতির’ আবেদন করতে হয়।
আরও পড়ুন: প্রাথমিকের ১৪ হাজার শিক্ষকের প্রশিক্ষণ নিয়ে যা জানা যাচ্ছে
আবেদনের পূর্বশর্ত ও সময়সীমা
পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার ১ থেকে ৩ বছরের মধ্যে নির্ধারিত ফরম-‘গ’ পূরণ করে আবেদন করতে হবে। শ্রেণিভিত্তিক ন্যূনতম মোট শিক্ষার্থী থাকতে হবে। এক্ষেত্রে মফস্বলের নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৯০ জন, মাধ্যমিকে ১৫০ জন, উচ্চ মাধ্যমিকে ৩২০-৪২০ জন। সিটি কর্পোরেশন ও জেলা সদরের ক্ষেত্রে নিম্ন মাধ্যমিকে ১২০ জন, মাধ্যমিকে ২০০ জন, উচ্চ মাধ্যমিকে ২৫০-৪৫০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে।
পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা
প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট পাবলিক পরীক্ষায় (জেএসসি/এসএসসিিএইচএসসি) নিয়মিত অংশগ্রহণ করতে হবে। মফস্বল এলাকায় পাবলিক পরীক্ষায় ন্যূনতম ৩০ জন পরীক্ষার্থী এবং গড়ে অন্তত ৫০% পাসের হার অর্জন করতে হবে। জেলা সদর ও সিটি কর্পোরেশন এলাকায় পাসের হার যথাক্রমে ৫৫% এবং ৬০% হতে হবে।
জনবল ও শিক্ষক নিয়োগ
প্রতিষ্ঠানটিকে অবশ্যই সরকার অনুমোদিত শিক্ষক-কর্মচারী জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। এনটিআরসিএ কর্তৃক নিবন্ধিত ও সুপারিশকৃত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকদের নিয়োগ প্রদান করতে হবে।
স্বীকৃতি মঞ্জুরি ও নিয়মিত নবায়ন
পরিদর্শন প্রতিবেদন ও পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হলে প্রাতিষ্ঠানিক একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। একাডেমিক স্বীকৃতির মেয়াদ থাকে তিন বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ছয় মাস পূর্বে আবেদন করে স্বীকৃতি নবায়ন করা বাধ্যতামূলক।