বিসিএস ১৬ ব্যাচের ‘দখলে’ শিক্ষা প্রশাসন, পদায়নে উপেক্ষিত জ্যেষ্ঠতা
সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ দেখভালের দায়িত্ব মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ওপর। মাউশিসহ শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ১৬তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের ব্যাপক আধিক্য লক্ষ্য করা গেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন কলেজে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদে পদায়নের ক্ষেত্রেও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে জুনিয়র কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা ক্যাডারের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে পদায়নের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ কর্মজীবনের মূল্যায়নের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট ব্যাচের কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা প্রশাসনে এক ব্যাচের এমন আধিক্য থাকায় প্রশাসনে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছ, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ১৪তম ব্যাচের অধিকাংশ কর্মকর্তা অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) গেলেও এখনও প্রায় ২০০ কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অধিকারী হলেও শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের উপস্থিতি খুবই সীমিত।
বর্তমানে মাউশির মহাপরিচালক থেকে শুরু করে অধিদপ্তরের ছয়টি উইংয়ের পরিচালক—সবাই ১৬তম ব্যাচের কর্মকর্তা। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহী, বরিশাল, চট্টগ্রামসহ প্রায় সবগুলো শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান পদেও ১৬তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের দেখা গেছে। ব্যতিক্রম কেবল ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড এবং জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) মহাপরিচালকের ক্ষেত্রে। এ দুটি পদে শিক্ষা ক্যাডারের ১৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন।
এছাড়া সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজগুলোর অধ্যক্ষ পদেও ১৬তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের প্রাধান্য রয়েছে। সরকারি কলেজগুলোর মধ্যেও ঢাকা কলেজ, সরকারি বাংলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে ১৪তম ব্যাচের অধ্যাপকদের উপেক্ষা করা হয়েছে। এছাড়াও শিক্ষা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় দপ্তর, শিক্ষা বোর্ড, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ কলেজগুলোতে একই ব্যাচের কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক পদায়ন একটি ‘ব্যাচকেন্দ্রিক প্রশাসনিক বলয়’ তৈরি করছে; যা ভবিষ্যতে নিরপেক্ষ প্রশাসনের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক ও মাউশি ডিজি অধ্যাপক ড. সোহেল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বদলি বা পদায়নের সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয়। মন্ত্রণালয় যাকে যোগ্য মনে করে, তাকেই পদায়ন দেয় এবং আগামীতে দেবে। আমি যেহেতু শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক; তাই শিক্ষা ক্যাডারে যারা আসবে, তারা সবাই আমার লোকই হবে।’
কলেজ প্রশাসনেও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষার অভিযোগ
শুধু শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর নয়, বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিয়োগেও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি ঢাকা কলেজের উপাধ্যক্ষ হিসেবে বিসিএস ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই কলেজেই ১৪তম ব্যাচের ছয়জন, ১৬তম ব্যাচের ১৪ জন এবং ১৭ ও ১৮তম ব্যাচের আরও ১৩ জন কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন।
একইভাবে কবি নজরুল সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ২২তম ব্যাচের কর্মকর্তা। অথচ ওই কলেজেও ১৪তম ব্যাচের ৫ জন, ১৬তম ব্যাচের ১০ জন এবং ১৭ ও ১৮তম ব্যাচের আটজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন।
এছাড়া ইডেন মহিলা কলেজ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি সা'দত কলেজ, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, সরকারি কেশব চন্দ্র কলেজ, মাদারীপুর সরকারি কলেজ, রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, টঙ্গী সরকারি কলেজ, সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ, আযম খান সরকারি কমার্স কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ, আনন্দ মোহন কলেজ এবং মুক্তাগাছা শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ পদে পদায়নের ক্ষেত্রেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করা হয়েছে।
শুধু কলেজগুলোতেই নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক পদেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির সদ্য সাবেক পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলামকে সরিয়ে নতুন পরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয় কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো: আফলাতুনকে। অধ্যাপক মো: আফলাতুন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা। অথচ একই দপ্তরে যুগ্ম পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন ১৮ তম ব্যাচের অধ্যাপক মো. ইদ্রিস আলী। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে অধ্যাপক ইদ্রিস আলীকে মাউশির ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়।
শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি চাকরিতে পদায়নের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। তবে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, কর্মমূল্যায়ন এবং জ্যেষ্ঠতাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা উচিত। একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকারী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের মূল্যায়ন করা হয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, স্বচ্ছ ও লিখিত মানদণ্ড ছাড়া ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের পদায়ন প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষিত হলে শিক্ষা প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। জুনিয়র কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব মেনে নিতে অনীহা দেখা দিলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাচভিত্তিক বিভাজন ও গ্রুপিং তীব্র হয়ে নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে নীতি বাস্তবায়ন, তদারকি ও সংকট ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে বদলি ও পদায়নের ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত। সরকারি কলেজের শিক্ষক বদলি-পদায়ন নীতিমালায় নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও আবেদন পদ্ধতি অনুসরণের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে পদায়নের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসনিক পদায়নে সরকার যোগ্যতা, দক্ষতা ও প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে পারে; এটি স্বীকৃত নীতি। তবে একই সঙ্গে যদি ধারাবাহিকভাবে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে বঞ্চিত হন এবং শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলো নির্দিষ্ট একটি ব্যাচের ‘দখলে’ চলে যায় তাহলে পদায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে। এ কারণে পদায়নের ক্ষেত্রে স্পষ্ট, লিখিত ও যাচাইযোগ্য মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি করতে হবে এবং সে অনুযায়ী পদায়ন করতে হবে। তাহলে বিতর্ক কমে আসবে।