২৮ জুলাই ২০২৬, ২০:২৬

অডিট আপত্তির মুখে পড়া প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষকেই ডিআইএর শীর্ষ পদে বসাল মন্ত্রণালয়

অধ্যাপক মো. আফলাতুন  © টিডিসি সম্পাদিত

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) অডিট আপত্তির মুখে পড়া চাঁদপুরের কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ।  সেই অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আফলাতুনকে সংস্থাটির পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ কলেজের অধ্যক্ষকে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানোর সিদ্ধান্ত ঘিরে শিক্ষা প্রশাসনে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

গত ২৩ জুলাই ডিআইএর পরিচালক পদে পদায়ন পান অধ্যাপক মো. আফলাতুন। তাকে এ পদে পদায়নের এক মাস আগে অর্থাৎ জুনের শুরুতে কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজের নানা অনিয়ম নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় ডিআইএ। 

শুধু তাই নয়; এই পদায়নের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতাও লঙ্ঘন করা হয়েছে। কেননা প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান যুগ্ম পরিচালক প্রফেসর মো. ইদ্রিস আলী শিক্ষা ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা। আর পরিচালক হিসেবে পদায়ন পাওয়া আফলাতুন ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা। জ্যেষ্ঠতা ডিঙ্গিয়ে এই পদায়ন ঘিরে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে।

‘শিক্ষা প্রশাসনে সব সময় পরিস্কার লোক আসবে সেটাই প্রত্যাশা করি। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই; এমন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা দরকার। অধ্যক্ষ আফলাতুনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে সেটি যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে এই পদায়ন করে মন্ত্রণালয় অন্যায় করেছে। একটি নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো’—অধ্যাপক মজিবুর রহমান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজটির ৪০ শিক্ষক-কর্মকর্তার মধ্যে ২২ জনের নিয়োগ নিয়ে আপত্তি তুলেছে ডিআইএ। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম থাকায় তাদের কাছ থেকে বেতন-ভাতার ৪ কোটি ৩০ লাখ ২৪ হাজার টাকা ফেরত আনতে বলা হয়েছে। ডিআইএর সুপারিশে বলা হয়, ২০১৮ সালে কলেজটি সরকারিকরণের পর রাজস্ব তহবিল থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণ করায় তাদের গৃহীত সমুদয় অর্থ ফেরত ও বেতন-ভাতা বন্ধ করার জন্য রাজস্ব অফিসে পত্র দেওয়া যেতে পারে।
 
অডিট প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, রেজিস্ট্রেশন ও প্রবেশপত্রের নামে শিক্ষার্থীদের ৫১ লাখ টাকা আত্মসাৎ: কলেজটিতে ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এইচএসসি ও স্নাতক পাস পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রবেশপত্র ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড বিতরণবাবদ জনপ্রতি ৮৫০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। এ সময়ে ৬ হাজার ১০৪ পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রায় ৫১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা গ্রহণ করা হয়। অথচ এ টাকা আদায়ের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বোর্ডের কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ অর্থ আদায় সঠিক হয়নি। এর জন্য দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর্থিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা তৎকালীন অধ্যক্ষের কাছ থেকে সংগ্রহপূর্বক ব্রডশিট জবাবের সঙ্গে প্রেরণের সুপারিশ করেছে ডিআইএ।

তথ্য বলছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী ২৫ হাজার টাকার বেশি কেনাকাটা করতে হলে কোটেশন প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা থাকলেও এই কলেজে তা মানা হয়নি। নিয়ম না মেনেই ভাউচারের মাধ্যমে ১২ লাখ ৩৯ হাজার টাকার কেনাটাকা করা হয়েছে। এতে আবার উন্নয়ন কমিটির কোনো স্বাক্ষর নেই। এই কেনাকাটা সঠিক হয়নি উল্লেখ করে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর্থিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সুপারিশ করেছে ডিআইএ।

‘যারা প্রশ্নবিদ্ধ বা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন না করাই সমীচীন। ডিআইএ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম নিয়ে কাজ করে। এখন যার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, তাকেই যদি ওই সংস্থার শীর্ষ পদে বসানো হয়, তাহলে তিনি দুর্নীতিকে আরও প্রশ্রয় দেবেন বলেই আমার মনে হয়’—অধ্যাপক মজিবুর রহমান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষক পরিষদের নিজস্ব সভায় উপস্থিতির জন্য শিক্ষক-কর্মচারী কর্তৃক বিধিবহির্ভূতভাবে ৪ লাখ ৭১ হাজার টাকা সম্মানী হিসেবে অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আপ্যায়ন বাবদ ১৮ লাখ টাকা বেশি খরচ হয়েছে। লাইব্রেরি খাত থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে ৫০ হাজার টাকা সম্মানী প্রদান করা হয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও উৎসব উদযাপনে সম্মানী হিসেবে অবৈধভাবে ৪ লাখ ২৭ হাজার টাকা নিয়েছেন তারা। প্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডির সভা উপলক্ষে গভর্নিং বডির সদস্যরা বিধিবহির্ভূতভাবে সম্মানী নিয়েছেন আরও কয়েক লাখ টাকা। এ ছাড়া অফিস সহকারী বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে একই কাজের জন্য দুবার সম্মানী গ্রহণ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অটো পাস পরীক্ষার্থীদের অব্যয়িত ১৮ হাজার টাকা সম্মানী আকারে বিতরণ করা হয়েছে। এর বাইরে ঢাকায় যাতায়াত বাবদ অস্বাভাবিক খরচ করা হয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শাড়ি, পাঞ্জাবি ও কাপড় ক্রয় বাবদ অনিয়মিতভাবে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে বলে উঠে এসেছে ডিআইএর তদন্তে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অডিদপ্তর যার বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, তাকেই প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ পদে বসানোয় অনিয়ম আরও বাড়বে। এ ধরনের পদায়নের ঘটনা শিক্ষা প্রশাসনে বিরল। বিষয়টি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া বলে অভিমত তাদের।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘শিক্ষা প্রশাসনে সব সময় পরিস্কার লোক আসবে সেটাই প্রত্যাশা করি। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই; এমন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা দরকার। অধ্যক্ষ আফলাতুনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে সেটি যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে এই পদায়ন করে মন্ত্রণালয় অন্যায় করেছে। একটি নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো।’

এ শিক্ষাবিদ আরও বলেন, ‘যারা প্রশ্নবিদ্ধ বা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন না করাই সমীচীন। ডিআইএ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম নিয়ে কাজ করে। এখন যার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, তাকেই যদি ওই সংস্থার শীর্ষ পদে বসানো হয়, তাহলে তিনি দুর্নীতিকে আরও প্রশ্রয় দেবেন বলেই আমার মনে হয়।’

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আফলাতুনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেককে কল করা হলে তিনি একটি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন।

ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলামকে সরানো হলো যে কারণে
সম্প্রতি রাজধানীর মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল কলেজ, সিটি কলেজ, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ, মোহাম্মদপুর আল হেরা কলেজ, ধনিয়া কলেজ, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ফরিদপুরের ভাঙ্গার ইকামতে দ্বীন মডেল মাদ্রাসাসহ আলোচিত একাধিক প্রতিষ্ঠান তদন্ত করে ডিআইএ।

এসব প্রতিষ্ঠানে হওয়া অনিয়ম নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২ হাজার ১০০ জাল সনদধারী শিক্ষককে শনাক্ত করে তাদের বেতন-ভাতা বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছিল। এতে কেউ কেউ পরিচালকের উপর সংক্ষুব্দ থাকতে পারেন বলে জানা গেছে। 

এ বিষয়ে ডিআইএ থেকে বদলি হওয়া পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাকে কী কারণে সরানো হয়েছে, সেটি বলতে পারছি না।’