মান নিশ্চিত না করেই ১৭৮৫ কোটি টাকার বই শিক্ষার্থীদের দিয়েছে এনসিটিবি
প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ছাপানো বইয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি)। এ মান নিশ্চিত করতে ইন্সপেকশন এজেন্ট, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) ল্যাবে বইয়ের কাগজের মান পরীক্ষার কথা ছিল। তবে সে কাজ না করেই ১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বই মুদ্রণ ও বাঁধাই করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এ বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারি বিধি ও চুক্তির শর্ত উপেক্ষা করে কাগজের যথাযথ মান যাচাই না করেই বিপুল অঙ্কের এই অর্থ ব্যয় করেছে এনসিটিবি। অথচ সংশ্লিষ্ট বইগুলোর মান যাচাইয়ের জন্য বাধ্যতামূলক পরীক্ষার (টেস্ট) রিপোর্ট সংগ্রহ করেনি সংস্থাটি। সম্প্রতি এনসিটিবির ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের যাবতীয় বিষয় নিয়ে অডিট করেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
সরকারি স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাগজ ও পাঠ্যপুস্তকের মান যাচাইয়ের দায়িত্ব বিএসটিআই ও বিসিএসআইআরের। অথচ সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীদের কাছ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষণ প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়নি। এর ফলে মান নিশ্চিত না করেই বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, যা আর্থিক অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি, এসএসসি ভোকেশনাল, ইবতেদায়ী, দাখিল এবং দাখিল ভোকেশনাল স্তরের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহে মোট ১ হাজার ৭৮৫ কোটি ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৭১ টাকা ব্যয় করা হলেও সেই ব্যয়ের বিপরীতে পাঠ্যপুস্তকের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কোনো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের টেস্ট রিপোর্ট সংরক্ষণ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চুক্তির পিসিসি ক্লজ ৩২.১ অনুযায়ী সরবরাহকৃত বইয়ের নমুনা ইন্সপেকশন এজেন্টের নিজস্ব ল্যাবের পাশাপাশি বিএসটিআই এবং বিসিএসআইআর এর ল্যাবে পরীক্ষা করার কথা ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র ইন্সপেকশন এজেন্টের ল্যাবের কিছু নমুনা টেস্ট রিপোর্ট নথিতে থাকলেও বিএসটিআই ও বিসিএসআইআরের কোনো টেস্ট রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।
এছাড়া ইন্সপেকশন এজেন্টের ওপর ভিত্তি করে বই গ্রহণ করা হলেও ওই এজেন্টের মান যাচাইয়ের আইনগত এখতিয়ার বা অনুমোদন রয়েছে—এমন কোনো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সনদও নথিতে পাওয়া যায়নি। ফলে বইয়ের কাগজ ও মুদ্রণের মান আদৌ নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেছে কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি অডিট অধিদপ্তর।
‘তাদের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। সরকারই এ লাইসেন্স দিয়েছে। পিপিআরএ ইন্সপেকশন এজেন্ট দিয়েই মান যাচাইয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। আমাদের সন্দেহ হলে আামরা মাঝে মাঝে বিসিএসআইআর কিংবা বিএসটির মাধ্যমে মান যাচাই করি।’—প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু, সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) এনসিটিবি
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাগজ ও পাঠ্যপুস্তকের মান যাচাইয়ের দায়িত্ব বিএসটিআই ও বিসিএসআইআরের। অথচ সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীদের কাছ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষণ প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়নি। এর ফলে মান নিশ্চিত না করেই বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, যা আর্থিক অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: স্থগিত এইচএসসি পরীক্ষা নিতে প্রস্তুত বোর্ড, অপেক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে পিসিসি ক্লজ ৩২.১ অনুযায়ী বিএসটিআই ও বিসিএসআইআরের টেস্ট রিপোর্ট সংগ্রহ না করে বই সরবরাহ করায় মানহীন বই সরবরাহের সম্ভাব্য দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণেরও সুপারিশ করেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিটিবি সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘পাঠ্যপুস্তকের মান যাচাইয়ের জন্য ইন্সপেকশন এজেন্ট রয়েছে। তারাই এ কাজটি করে থাকে। বিসিএসআইআর কিংবা বিএসটির মাধ্যমে মাঝে মধ্যে মান যাচাই করা হয়। এটি নিয়মিত করা হয় না।’
ইন্সপেকশন এজেন্টের মান যাচাইয়ের আইনগত অনুমোদন রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘তাদের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। সরকারই এ লাইসেন্স দিয়েছে।’ ট্রেড লাইনসেন্স তো মান যাচাইয়ের সার্টিফিকেট নয়—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘পিপিআরএ ইন্সপেকশন এজেন্ট দিয়েই মান যাচাইয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। আমাদের সন্দেহ হলে আামরা মাঝে মাঝে বিসিএসআইআর কিংবা বিএসটির মাধ্যমে মান যাচাই করি।’