৩০ জুন ২০২৬, ১৯:৫৬

জাল রেজুলেশনে ইবতেদায়ি শিক্ষক থেকে দাখিল মাদ্রাসার সুপার, নীতিমালা লঙ্ঘন করে দুই পদে চাকরি

বরখাস্ত হওয়া সুপার রেজাউল করিম  © এআই জেনারেটেড ছবি

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ইউনুছ খাদিজিয়া বালিকা দাখিল মাদ্রাসার সাবেক সুপার মো. রেজাউল করিমের নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকা, জাল রেজুলেশনের মাধ্যমে পদোন্নতি, একই সঙ্গে দুটি পদ দখল এবং দীর্ঘদিন ধরে নীতিমালা বহির্ভূতভাবে বেতন উত্তোলনের মতো অনিয়মের মাধ্যমে তিনি সুপার পদ দখল করে ছিলেন।

মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের তথ্য বলছে, ১৯৯০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত রেজুলেশন অনুযায়ী মো. রেজাউল করিমকে আলিম পাস যোগ্যতায় অতিরিক্ত শিক্ষক হিসেবে নেওয়া হয়। পরে তৎকালীন সুপার রুহুল আমিনের স্বাক্ষরিত নিয়োগপত্র অনুযায়ী ১৯৯১ সালের ৩ আগস্ট তিনি ইবতেদায়ি সহকারী মৌলভী হিসেবে যোগদান করেন।

নথি অনুযায়ী, রেজাউল করিম ১৯৮৮ সালে আলিম, ১৯৯০ সালে ফাজিল এবং নিয়মিত ছাত্র হিসেবে ১৯৯২ সালে কামিল পাস করেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, আলিম পাস যোগ্যতায় নিয়োগপ্রাপ্ত একজন ইবতেদায়ি শিক্ষক কীভাবে পরে দাখিল স্তরের শিক্ষক এবং শেষ পর্যন্ত সুপার পদে নিয়োগ পেলেন।

‘কোনো জাল রেজুলেশন তৈরির ঘটনা ঘটেনি।  সব নিয়ম মেনেই প্রতিষ্ঠান আমাকে নিয়োগ দিয়েছে।’ নীতিমালা লঙ্ঘন দুই পদে চাকরি করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি দুই পদে চাকরি করলেও বেতন নিয়েছি একটি পদে। এটি নেওয়া যায় বলে নিজের মনগড়া ব্যাখ্যাও দেন রেজাউল’—সাবেক সুপার রেজাউল করিম

অভিযোগকারী শিক্ষকরা বলছেন, ১৯৯৮ সালের ২১ নভেম্বরের একটি রেজুলেশনের মাধ্যমে রেজাউল করিমকে দাখিল জুনিয়র মৌলভী পদে পদোন্নতি দেখানো হয়। কিন্তু মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা একেএম আবুল হোসাইনের ভাষ্য, ওই রেজুলেশনটি জাল। তার দাবি, ১৯৯৫ সালের জনবল কাঠামো অনুযায়ী ইবতেদায়ি শিক্ষককে দাখিল স্তরে পদায়নের কোনো সুযোগ ছিল না। একই রেজুলেশনে পদোন্নতি পাওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও অপর শিক্ষক মো. ছায়েদুল ইসলাম এখনো দাখিল জুনিয়র মৌলভী পদেই কর্মরত এবং ১৫ নম্বর বেতন কোডে বেতন পাচ্ছেন। অন্যদিকে রেজাউল করিমও শিক্ষক হিসেবে একই কোডে বেতন উত্তোলন করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে তৎকালীন সুপার রুহুল আমিন সাময়িক বরখাস্ত হলে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মো. আব্দুস সাত্তারকে ভারপ্রাপ্ত সুপার করা হয়। তিনি দায়িত্ব পালন করতে অপারগতা প্রকাশ করলে ২০০৮ সালে জ্যেষ্ঠতার ক্রম উপেক্ষা করে ইবতেদায়ি সহকারী মৌলভী রেজাউল করিমকে ভারপ্রাপ্ত সুপারের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের ২০১০ সালের ২৫ জুলাই তারিখের আদেশ অনুযায়ী, বোর্ডের আপিল অ্যান্ড আরবিট্রেশন কমিটি সাবেক সুপার রুহুল আমিনকে চাকরি থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১০ তারিখে রেজাউল করিম নিজেই ভারপ্রাপ্ত সুপার হিসেবে স্বাক্ষর করে একটি রেজুলেশনের মাধ্যমে নিজেকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে অন্য একজনকে ভারপ্রাপ্ত সুপারের দায়িত্ব দেন। চার দিন পর নিয়োগ বোর্ড তাকে সুপার পদে নিয়োগ দেয় এবং তিনি সুপার হিসেবে যোগদান করেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একাধিক নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে। ২০১০ সালের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় বলা হয়েছে, একই ব্যক্তি একই সময়ে একাধিক পদে থাকতে পারবেন না। কিন্তু রেজাউল করিম একদিকে সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও অন্যদিকে ইবতেদায়ি সহকারী মৌলভী পদের ১৫ নম্বর বেতন কোডেই বেতন উত্তোলন করে আসছেন।

‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে দেখব। যদি অনিয়ম হয়ে থাকে তাহলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে’—প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান, চেয়ারম্যান, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড

নীতিমালা অনুযায়ী, সুপার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগকালীন শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচ্য হবে এবং সমগ্র শিক্ষাজীবনে একটি তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য। তবে রেজাউল করিমের শিক্ষাজীবনে দুটি তৃতীয় বিভাগ রয়েছে। পাশাপাশি তিনি যখন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান, তখন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল কেবল আলিম পাস। অথচ সুপার পদে নিয়োগের জন্য কামিল ডিগ্রি এবং দাখিল স্তরে অন্তত ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক ছিল। এই দুটি শর্তের কোনোটি পূরণ না করলেও রেজাউল করিমকে সুপারের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এমপিও নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত সাবেক সুপার রুহুল আমিনের নাম এমপিওতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। অর্থাৎ তার নাম কর্তন না করেই ২০১০ সালে রেজাউল করিমকে সুপার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সুপার পদে নিয়োগ পাওয়ার পরও দীর্ঘদিন এমপিওতে সুপার পদবি ও ৭ নম্বর বেতন কোড সংযুক্ত করতে না পেরে তিনি পূর্বের সহকারী মৌলভী পদের ১৫ নম্বর কোডে বেতন উত্তোলন অব্যাহত রাখেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগ, পদোন্নতি ও বেতন সংক্রান্ত এসব অসংগতি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হলে মাদ্রাসার প্রশাসনিক অনিয়মের প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।

ইউনুছ খাদিজিয়া বালিকা দাখিল মাদ্রাসার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সুপার রফিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ইবতেদায়ি শিক্ষক থেকে দাখিল মাদ্রাসার সুপার হওয়ার কোনো সুযোগ না থাকলেও সাবেক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নাসরিন এবং কমিটির লোকজনের যোগসাজনে সুপার পদ দখল করে ছিলেন রেজাউল করিম। বর্তমান উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসরিনের স্বামী। সেজন্য তিনি বরখাস্ত হওয়া সুপারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ইউনুছ খাদিজিয়া বালিকা দাখিল মাদ্রাসার সাবেক সুপার রেজাউল করিম তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘কোনো জাল রেজুলেশন তৈরির ঘটনা ঘটেনি।  সব নিয়ম মেনেই প্রতিষ্ঠান আমাকে নিয়োগ দিয়েছে।’ নীতিমালা লঙ্ঘন দুই পদে চাকরি করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি দুই পদে চাকরি করলেও বেতন নিয়েছি একটি পদে। এটি নেওয়া যায় বলে নিজের মনগড়া ব্যাখ্যাও দেন রেজাউল।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে দেখব। যদি অনিয়ম হয়ে থাকে তাহলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’