১৪ জুন ২০২৬, ১২:৫৭

প্রাথমিকে ৪০ হাজার পদ শূন্য, জটিলতায় আটকে ৪৭ হাজার—কারণ জানালেন শিক্ষামন্ত্রী

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন  © সংগৃহীত

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতে বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। একই সঙ্গে বিচারাধীন মামলা ও বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রায় ৪৭ হাজার শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে আছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এসব জটিলতার কারণে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, যা দেশের বৃহৎ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আজ রবিবার (১৪ জুন) রাজধানীতে ইউনিসেফ আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী।

তিনি বলেন, দেশের প্রাথমিক শিক্ষাখাত অত্যন্ত বড় একটি সেক্টর। বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার ৫০০। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ওয়াশরুম থাকলেও সেগুলোর মানোন্নয়নে কাজ চলছে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব মূল্যবোধ গড়ে তোলা।

তিনি বলেন, দেশে ভর্তি হার তুলনামূলক কম এবং ঝরে পড়ার হার বেশি। এ বাস্তবতা বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী স্কুল ইউনিফর্ম চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। এর আওতায় সব শিক্ষার্থীকে সমানভাবে স্কুল ড্রেস দেওয়া হবে। প্রথম ধাপে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে, যা আগামী জুলাইয়ের শেষ বা আগস্ট মাসে শুরু হতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহ বাড়ানো।

একই সঙ্গে আগামী বাজেট থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে মিড-ডে মিল চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, খাবার সরবরাহে কিছু ত্রুটি পাওয়া গেলেও তা নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে। যারা অনিয়ম করছে বা নিম্নমানের ও নষ্ট খাবার সরবরাহ করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।

শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে এহছানুল হক মিলন বলেন, বিচারাধীন মামলার কারণে প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ প্রধান শিক্ষক নিয়োগ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে আটকে আছে। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৮৩ হাজার মামলা বর্তমানে বিচারাধীন থাকায় অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হচ্ছে না।

আরও পড়ুন: প্রাথমিক শিক্ষায় ১ কোটি ৭০ লাখ শিক্ষার্থী, ৬৫ হাজার স্কুল—চাপ সামাল দিতে নতুন উদ্যোগ

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ১৪ হাজার ৩০০ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছিল। তবে খুব দ্রুততার সঙ্গে সেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দুই বছরের প্রোবেশন রেখে ধাপে ধাপে তাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষামন্ত্রী জানান, বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে আরও প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষকের সংকট রয়েছে। তিনি বলেন, “আমি উচ্চ মাধ্যমিক বা অন্য কোনো স্তরের কথা বলছি না, শুধু প্রাথমিক পর্যায়ের কথাই বলছি।” আগামী চার বছর পর সরকার এসব উদ্যোগের ফলাফল মূল্যায়ন করবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বাজেট প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অতীতে শিক্ষা খাতে জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ বরাদ্দ ছিল, যার মধ্যে আইসিটি ও অন্যান্য খাতও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমান সরকার তা প্রায় ২ শতাংশে উন্নীত করেছে।

তিনি জানান, প্রাথমিক শিক্ষাখাতে আগে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যা বর্তমানে বেড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক খাতে বরাদ্দ ৩১ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। একইভাবে উচ্চশিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৪৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী আগামী চার বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নের সময় তিনি নিজেও চিন্তা করেছেন কীভাবে এই বড় বরাদ্দ কার্যকরভাবে ব্যয় করা হবে। তাই অতিরিক্ত চাহিদার পরিবর্তে বাস্তবসম্মত বাজেটের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম এবং লার্নিং আউটকাম এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল সন্তোষজনক নয় এবং এ বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। গত চার বছরের অর্জন মূল্যায়নের পাশাপাশি বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধানেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাল্যবিবাহ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এটি এখনো গোপনে ঘটছে। তবে সরকার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ১৮ বছরের নিচে কোনো বিয়ে হলে সংশ্লিষ্টদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।

নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরিসংখ্যানে অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের উপস্থিতি ছেলেদের তুলনায় বেশি দেখা যায়। তিনি উল্লেখ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় ‘ফুড ফর এডুকেশন’ কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে এ অগ্রযাত্রার সূচনা হয়েছিল। পরে তা নগদ সহায়তা ও স্টাইপেন্ড কর্মসূচিতে রূপান্তরিত হয়।

তিনি বলেন, মেয়েদের জন্য স্টাইপেন্ড চালুর ফলে শিক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরবর্তীতে এই সুবিধা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং ধীরে ধীরে ডিগ্রি পর্যায়েও নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্যই এ ধরনের সহায়তা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা জরুরি। এ লক্ষ্যেই কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষায়ও কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যাতে এটি আরও কার্যকর ও কর্মমুখী হয়। পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায়ে নতুন স্কুল, কলেজ ও ক্যাডেট কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে ৬৭০টি নতুন স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দেশের শিক্ষা খাতে একটি বড় কর্মসূচি।

উচ্চশিক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংযোগ এখনো দুর্বল। এ অবস্থার উন্নয়নে কাজ চলছে এবং দক্ষতা উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রতিটি সংসদীয় আসনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন শিক্ষামন্ত্রী। তবে তিনি বলেন, একই সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ও প্রয়োজন। এজন্য গ্রামভিত্তিক ম্যাপিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যাতে দেশের কোনো গ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়বিহীন না থাকে। দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগানোর জন্য ২০৪১ সালের মধ্যে মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন, যার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র শিক্ষা।

সবশেষে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ‘আমি যদি প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করি তার দ্বিতীয় বা তৃতীয় অগ্রাধিকার কী, তিনি বলবেন—শুধু শিক্ষা।