০৯ জুন ২০২৬, ২০:৪৫

ভাউচারে ১ হাজার ১৩৭ বই, লাইব্রেরিতে নেই একটিও

কচুয়া ডিগ্রি কলেজ  © টিডিসি সম্পাদিত

চাঁদপুরের কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজে এক হাজার ১৩৭টি বই কেনার ভাউচার রয়েছে। তবে কলেজের লাইব্রেরিতে ওই বইগুলোর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়, কলেজটিতে বিভিন্ন খাতে প্রায় চার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় নিয়োগ পাওয়া ২২ শিক্ষকের বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে এসব অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে। গত ২ থেকে ৫ জুন কলেজটি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে ডিআইএ। পরিদর্শন শেষে প্রস্তুত প্রতিবেদনে আয়-ব্যয়, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, সরকারি রাজস্ব, নিয়োগ এবং ক্রয় সংক্রান্ত মোট ২৩ ধরনের আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি।

এ বিষয়ে ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘কচুয়া ডিগ্রি কলেজের অনিয়মগুলো নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।’

কলেজ কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় ১ হাজার ১৩৭টি বই ক্রয় করার ভাউচার উল্লেখ করা হয়েছে। ভাউচারের তথ্য অনুযায়ী, এই বইগুলো ক্রয় করতে ২ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে লাইব্রেরিতে সংশ্লিষ্ট বইয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এছাড়া কলেজে ক্রয় করা দুটি মোবাইল ফোনও নিরীক্ষাকালে উপস্থাপন করতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ। ফলে এই অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিআইএ।

কচুয়া ডিগ্রি কলেজ নিয়ে ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলেজটি জাতীয়করণের পরও দীর্ঘদিন ধরে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ না করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায় করেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ভ্যাট ও উৎস কর বাবদ প্রায় ২৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়নি কলেজ কর্তৃপক্ষ।

কলেজটি জাতীয়করণের পর অভ্যন্তরীণ ও বহিঃপরীক্ষার আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করা হয়নি। শিক্ষার্থী ফি আদায়ের ক্যাশবুক ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় রেজিস্টারও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেনি কর্তৃপক্ষ। ‘ডিড অব গিফট’ সম্পাদনের পর সরকারি সম্পদ হিসেবে বিবেচিত ব্যাংক হিসাবগুলোর অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে বিভিন্ন লেনদেন অব্যাহত রাখা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নীতিমালার বাইরে গিয়ে ১৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। ছাত্র সংসদ স্থগিত থাকা সত্ত্বেও ব্যয় নির্বাহ, লাইব্রেরি ও ল্যাবরেটরি তহবিলের অর্থ অন্য খাতে ব্যবহার, বিধিবহির্ভূত সম্মানী প্রদান এবং সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর-২০০৮) অনুসরণ না করে বিভিন্ন উন্নয়ন ও ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কলেজ কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় ১ হাজার ১৩৭টি বই ক্রয় করার ভাউচার উল্লেখ করা হয়েছে। ভাউচারের তথ্য অনুযায়ী, এই বইগুলো ক্রয় করতে ২ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে লাইব্রেরিতে সংশ্লিষ্ট বইয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এছাড়া কলেজে ক্রয় করা দুটি মোবাইল ফোনও নিরীক্ষাকালে উপস্থাপন করতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ। ফলে এই অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিআইএ।

প্রতিবেদনে ডিআইএ জানিয়েছে, বিভিন্ন জাতীয় দিবস, উৎসব, শিক্ষা সফর, ভর্তি কার্যক্রম ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের নামে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে বিপুল পরিমাণ সম্মানী বিতরণ করা হয়েছে। গভর্নিং বডির সদস্যদেরও বিধিবহির্ভূতভাবে সম্মানী দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

কলেজের সম্পদ ব্যবস্থাপনায়ও গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে ডিআইএর তদন্তে। প্রতিষ্ঠানটির পুকুর ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। কলেজ মাঠে গরুর হাট বসানোর বিষয়ে কোনো চুক্তিপত্র বা সিদ্ধান্তের নথিও পাওয়া যায়নি। এছাড়া কলেজের কিছু জমি দখলে না থাকা, জমির রেকর্ডে অসঙ্গতি এবং চলমান ভূমি মামলার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি রাজস্ব বাজেটের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৩৫৩ টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে ব্যয় হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বই লিখে আলোচিত আওয়ামীপন্থী অধ্যাপক হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি

প্রতিবেদনে ২২ জন শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগ বিধি অনুযায়ী হয়নি বলে জানিয়েছে ডিআইএ। জাতীয়করণের পরও তারা রাজস্ব খাত থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এসব নিয়োগের বিপরীতে মোট ৪ কোটি ৩ লাখ ২ হাজার ৪৩২ টাকা ফেরত আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বেতন-ভাতা বন্ধের জন্য রাজস্ব কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের ভর্তির অনলাইন-সংক্রান্ত কার্যক্রম প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক দোকান থেকে সম্পাদনপূর্বক অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই সমীচীন হয়নি। এর জন্য ২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ম্যাগাজিন খাতের টাকা নয়ছয়ের পাশাপাশি কলেজের ফটোকপি মেশিন থাকা সত্ত্বেও বাইরে ফটোকপি করে লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে।

এসবের পাশাপাশি সরকারি রাজস্ব বাজেটের বিধিবহির্ভূতভাবে ব্যয়িত ৬ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারি খাতে জমা করে মন্ত্রণালয় বরাবর ব্রডশিট জবাব প্রদানের জন্য সুপারিশ করেছে ডিআইএ। একই সঙ্গে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর্থিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে কলজেটির বর্তমান অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আফলাতুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।