০৮ জুন ২০২৬, ২০:৪৪

৭ ব্যাংকে বন্দি শিক্ষকদের অবসরের টাকা

সাত ব্যাংকের লোগো  © টিডিসি সম্পাদিত

দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে শ্রেণিকক্ষে জ্ঞান বিতরণ করে অবসরে গেছেন হাজারো শিক্ষক। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের প্রাপ্য অবসর ও কল্যাণ তহবিলের টাকা পেতে পদে পদে হয়রানি আর ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। অবসর ও কল্যাণ তহবিলের জন্য শিক্ষকদের বেতন থেকে কেটে নেওয়া টাকা আটকে আছে বেসরকারি সাতটি ব্যাংকে। কোটি কোটি টাকার এই তহবিল ছাড় করতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, এমনকি উদ্যোগ নিয়েও সমাধান বের করতে হিমশিম খাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফলে অবসরের পর আর্থিক নিরাপত্তার আশায় থাকা শিক্ষকদের অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন, বাড়ছে ক্ষোভ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যে ব্যাংকগুলোতে অবসরের টাকা আটকে সেগুলো থেকে টাকা ফেরত পেতে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি ব্যাংকের টাকা লুটপাট হওয়ায় সেভাবে জোর দেওয়া যাচ্ছে না। তবে শিক্ষকদের কষ্টার্জিত টাকা আদায় করে তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

‘শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা দিতে ইতোমধ্যে একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।’—ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব এবং অবসর ‍সুবিধা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবদুল খালেক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘শিক্ষকদের অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের মোটা অঙ্কের টাকা সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে আটকে রয়েছে। এই টাকা আদায় করতে মন্ত্রণালয় অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে অবসর সুবিধা বোর্ডের তহবিলে ১ হাজার ৮২ কোটি টাকা এবং কল্যাণ ট্রাস্টের ৩৫০ কোটি টাকাসহ মোট প্রায় সাড়ে ১৪’শ কোটি টাকা তহবিলে জমা রয়েছে। এর মধ্যে ৬৩৯ কোটি ৬০ লাখ ৬১ হাজার ৭২৫ সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে রয়েছে। অবশিষ্ট ৮০০ কোটি টাকা রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ও জনতা ব্যাংকে রয়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলো থেকে টাকা ছাড় হতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

সূত্রের তথ্য বলছে, বেসরকারি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক—এই সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে শিক্ষকদের অবসরের টাকা এফডিআর এবং এসটিডি করে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ রাখা হয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে। শিক্ষকদের অবসরের ২০০ কোটি টাকার বেশি ব্যাংকটিতে রয়েছে।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসক মুহম্মদ বদিউজ্জামান দিদার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষকদের টাকা দেওয়ার কোনো চিঠি এসেছে কিনা সেটি অফিসে গিয়ে দেখে বলতে হবে। এছাড়া অবসর সুবিধা বোর্ডের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রাখা হয়েছে নাকি সরিয়ে ফেলা হয়েছে সেটিও এ মুহূর্তে বলতে পারছি না।’

ইউনিয়ন ব্যাংকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবুল হাশেম বলেন, ‘আগে যারা দায়িত্বে ছিল, তারা জমাকৃত টাকা অনেকক্ষেত্রে ভাগাভাগি করেছে বলে শুনেছি। এটি কোনো খাতে ইনভেস্ট করা হয়নি। এজন্য হয়তো টাকা দিতে অসুবিধা হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ইনস্টিটিউটশনাল ডিপোজিটের ক্ষেত্রে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেই নির্দেশনার আলোকে টাকা দেওয়া হচ্ছে।’

সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের প্রশাসক মো. আবুল বাশারকে কল করা হলে তিনি বিমানে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানান। বিষয়টি নিয়ে দেশে ফেরার পর কথা বলবেন।

সিটিজেনস ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ডিপোজিটের টাকা দেওয়ার নিয়ম অনুযায়ী যিনি টাকা রেখেছিলেন, তিনি আবেদন করলে আমরা টাকা দিয়ে দেই। অবসর সুবিধা বোর্ডের ক্ষেত্রেও এমনটি হওয়ার কথা। বিষয়টি নিয়ে এর চেয়ে বেশি তথ্য নেই।’

বাড়তি মুনাফার আশায় বেসরকারি ব্যাংকে শিক্ষকদের টাকা, নেপথ্যে সাবেক সচিব
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা আইন, ২০০২-এর ধারা ৯(৪) এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা প্রবিধানমালা, ২০০৫-এর প্রবিধি ৬ অনুযায়ী শিক্ষকদের অবসর সুবিধা বোর্ডের টাকা সরকারি ব্যাংকে রাখতে হবে। তবে এই নিয়মের লঙ্ঘন করে বাড়তি মুনাফার আশায় তুলনামূলক দুর্বল ব্যাংকে টাকা রেখেছিল বোর্ডের তৎকালীন কর্মকর্তারা।

অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ, বোর্ডের প্রোগ্রামার জামাল হোসেন এবং বোর্ডের ব্যবহারকৃত সফটওয়্যার কোম্পানির মালিক গোলাম সারোয়ার ও মোফাজ্জল মওদুদ এলাহীর যোগসাজশে টাকাগুলো বেসরকারি ব্যাংকে রাখা হয়। পরবর্তীতে তারা অতিরিক্ত মুনাফা আদায় করে নেন।

বেসরকারি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক—এই সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে শিক্ষকদের অবসরের টাকা এফডিআর এবং এসটিডি করে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ রাখা হয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে। শিক্ষকদের অবসরের ২০০ কোটি টাকার বেশি ব্যাংকটিতে রয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর বোর্ডের সচিব অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ দীর্ঘ সাড়ে ৮ বছর বোর্ডের সচিব হিসাবে দায়িত্বে ছিলেন। এ সময় তিনি ও তার ভাতিজা মোফাজ্জল মওদুদ এলাহীর সফটওয়্যার কোম্পানি ‘গ্রিন বি’কে অবসর বোর্ডের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেন। তারা পরস্পর যোগসাজশে অবসরে যাওয়া বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের শত শত কোটি টাকা তছরুপ করেন।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে শিক্ষকদের অবসর ও কল্যান ট্রাস্টের অর্থ আওয়ামী লীগ ঘরানার ব্যাক্তিদের মালিকানাধীন ব্যাংকে রাখা হয়েছিল। এর ফলে শিক্ষকদের টাকা সঠিক সময়ে দেওয়া যায়নি। বর্তমানে এই ব্যাংকগুলোতে একসঙ্গে একাধিক শিক্ষকের টাকা দেওয়ার আবেদন পাঠানো হলেও তারা টাকা দিতে পারে না। একজনের বেশি শিক্ষকের আবেদন গ্রহণে অনিচ্ছুক বেসরকারি ব্যাংকগুলো।’

বেসরকারি ব্যাংকে টাকা রাখায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বোর্ডের প্রোগ্রামার জামাল হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ ৫ আগস্টের পর থেকে পলাতক থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

পেনশন পেতে ভোগান্তি, টাকা পাওয়ার আগে মারা যাচ্ছেন কেউ কেউ
সাতক্ষীরার তালতলা আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী মো. সিরাজুল হক অবসরের পরে দীর্ঘদিন মানবেতর জীবনযাপন করে মৃত্যুবরণ করেন। ২০২৪ সালের ১ মে তিনি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অবসর গ্রহণের পর অবসরের পর টাকা পেতে আবেদন করেছিলেন। তবে অবসরের পর প্রাপ্য অর্থ না পাওয়ায় তিনি পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।

শুধু অফিস সহকারী সিরাজুলই নন; বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড এবং কল্যাণ ট্রাস্ট এখন হাজারো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর দীর্ঘশ্বাসের জায়গা হয়ে উঠেছে। আবেদন করার দীর্ঘ সময় পরও শিক্ষকরা টাকা পাচ্ছেন না। এমনকি অনেক শিক্ষক আবেদনের পর মৃত্যুবরণ করলেও টাকা পাননি। অথচ শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা সময় মতো পাওয়া তাদের অধিকার বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। উচ্চ আদালত অবসরের ছয় মাসের মধ্যে শিক্ষকদের টাকা দেওয়ার নির্দেশনা দিলেও সেটিও মানা হচ্ছে না।

সংকট নিরসনে নতুন পরিকল্পনা
অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আবেদনকারীরা কল্যাণ সুবিধার টাকা পেয়েছেন। এরপর ২৪ মে পর্যন্ত ৪৪ হাজার ৯৬৬ জন শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। আর ২০২৩ সালের এপ্রিল কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা দেওয়া হয়েছে। এরপর গত ২৪ মে পর্যন্ত ৪৪ হাজার ৯৬৬ জন শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে।

এই বিপুল আবেদন নিষ্পত্তি করতে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, অবসর সুবিধার জন্য প্রায় আট হাজার শিক্ষককে আংশিক (পাঁচ লাখ টাকা করে) টাকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য একটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত যাচাই-বাছাই করে প্রস্তুত করা হয়েছে ৩ হাজার ১০০ জনের টাকা। অন্যদিকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে কল্যাণ সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছে কল্যাণসুবিধা বোর্ড। তবে সংখ্যাটি হেরফের হতে পারে।

এ বিষয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা দিতে ইতোমধ্যে একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।’

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পেনশনের ৮ হাজার কোটি টাকা লোপাট, অভিযোগ করেছিলেন সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পেনশনের ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ। ২০২৫ সালের ৩ মার্চ রাজধানীর এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এমন অভিযোগ করেছিলেন তিনি।

এনইসি সভা শেষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন,  এটা সমাধানে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনেক প্রকল্প বন্ধও করা হয়েছে।