১৯ মে ২০২৬, ১৯:৩৯

কলেজটির ৬১ শিক্ষক-কর্মচারীর সবার সনদই জাল, এমনকি অধ্যক্ষের সনদও

বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে জাল সনদের চিত্র  © টিডিসি সম্পাদিত

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভয়াবহ নিয়োগ জালিয়াতি, জাল সনদ ব্যবহার করে অবৈধভাবে বেতন-ভাতা উত্তোলনের বিস্ফোরক তথ্য সামনে এসেছে। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত ৭৬ শিক্ষকের মধ্যে ৭৩ জনের সনদই জাল। এর মধ্যে কলেজ শাখার ৬১ শিক্ষক-কর্মচারীর সবার সনদই জাল। এই সনদ দিয়ে চাকরি করে সরকারের সাড়ে ৫ কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। এর মধ্যে কলেজ শাখায় কর্মরতরা ৪ কোটি ২১ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬৬ টাকা এবং স্কুল শাখার শিক্ষক-কর্মচারীরা ১ কোটি ৩৬ লাখ ২২ হাজার ৮০১ টাকা বেতন-ভাতা বাবদ নিয়েছেন।

গত বছরের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে ডিআইএর পরিদর্শক সনজয় চন্দ্র মন্ডল, সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মো. নুরুল আফছার এবং অডিটর মো. সিরাজুল ইসলাম। গত রবিবার প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচাইয়ের জন্য পাঠানো প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হকের স্নাতকোত্তর সনদের সঙ্গে তার প্রকৃত পরিচয়ের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, সংশ্লিষ্ট সনদধারীর পিতার নাম ‘Md Asir Uddin’ এবং মাতার নাম ‘Mrs Ahmeda Khatun’ হলে সনদটি সঠিক। অথচ ইমদাদুল হকের এসএসসি, আলিম ও চাকরির কাগজপত্রে পিতার নাম ‘মো. আজহার আলী’ এবং মাতার নাম ‘মমিরন নেছা’ উল্লেখ রয়েছে। ফলে সনদটিকে জাল বলে অভিহিত করেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এত শিক্ষকের সনদ জালিয়াতির বিষয়টি উদ্বেগজনক। আমরা মন্ত্রণালয়কে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছি। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।’

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হক ২০০০ সালে নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু নিয়োগের সময় তার প্রয়োজনীয় বিএড সনদ ও অভিজ্ঞতা ছিল না। এমনকি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও ইচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষাগত যোগ্যতা সীমিত করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া যায়। পরে তিনি শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি থেকে বিএড সনদ নেন, যা তদন্ত কর্মকর্তারা গ্রহণযোগ্য নয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচাইয়ের জন্য পাঠানো মো. ইমদাদুল হকের স্নাতকোত্তর সনদের সঙ্গে তার প্রকৃত পরিচয়ের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, সংশ্লিষ্ট সনদধারীর পিতার নাম ‘Md Asir Uddin’ এবং মাতার নাম ‘Mrs Ahmeda Khatun’ হলে সনদটি সঠিক। অথচ ইমদাদুল হকের এসএসসি, আলিম ও চাকরির কাগজপত্রে পিতার নাম ‘মো. আজহার আলী’ এবং মাতার নাম ‘মমিরন নেছা’ উল্লেখ রয়েছে। ফলে সনদটিকে জাল বলে অভিহিত করেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হক এমপিওভুক্তির সময় তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ জমা দিলেও নিরীক্ষাকালে আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির আরেকটি সনদ দাখিল করেন। ইউজিসির নীতিমালা অনুযায়ী ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদও গ্রহণযোগ্য নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

বনপাড়া আদর্শ স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আরিফ রব্বানীর কাছ থেকে ৯ লাখ ১ হাজার ৮৭৭ টাকা, চার সহকারী শিক্ষক আছাদুজ্জামান, শামছুন নাহার, নাসরীন সুলতানা এবং আয়েশা খাতুনের কাছে যথাক্রমে  ৮ লাখ ৫ হাজার ১৯৪, ৩৭ লাখ ১১ হাজার ৭৩৮, ২৮ লাখ ৭১ হাজার ৭৪৮ এবং ৩২ লাখ ৮৯ হাজার ২৬০ টাকা করে ফেরত পাওয়া যাবে। এছাড়া অফিস সহায়ক ইসমেতারা, পরিচ্ছন্নতা কর্মী আবু নাঈম আয়া ঝর্ণা আক্তার এবং  নৈশপ্রহরী তরিকুল ইসলামের কাছে যথাক্রমে ৫ লাখ ৬০ হাজার ৮১৫, ৫ লাখ ৬০ হাজার ৭২৩, ৫ লাখ ৬০ হাজার ৭২৩ এবং ৫ লাখ ৬০ হাজার ৭২৩ টাকা করে ফেরত পাবে সরকার।

জাল সনদ ব্যবহার করে অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হক ৪১ লাখ ২১ হাজার ২৬১ টাকা সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন। এর মধ্যে নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে ২৬ লাখ ১৮ হাজার ৮৫৪ টাকা এবং অধ্যক্ষ হিসেবে ১৬ লাখ ১০ হাজার ৪০৭ টাকা উত্তোলন করেছেন। 

তদন্ত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানে কোনো স্টক রেজিস্টার নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি মালামালের হিসাব সংরক্ষণ এবং নিয়মিত স্টক যাচাই করা হয়নি। মেয়াদোত্তীর্ণ এডহক কমিটি দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়েছে। গভর্নিং বডির কার্যক্রমেও নানা অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। তদন্ত কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষা বোর্ড ও এমপিও নীতিমালা ধারাবাহিকভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে এবং এক পদে কর্মরত থেকে অন্য পদের বেতন উত্তোলনের ঘটনাও ঘটেছে।

জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা অধিশাখা) মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনটি এখনো আমার কাছে আসেনি। প্রতিবেদন পেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কলেজ শাখায় কার কাছে কত টাকা ফেরত পাবে সরকার
অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হকের কাছে ৪১ লাখ ২১ হাজার ২৬১ টাকা, তানজিলা ইসলাম লিজা, মো. আবু রায়হান, মোস্তাফিজুর রহমান, লুৎফা তালুকদার, মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, তৌহিদা বেগম, মো. শহীদুল আলম, মো. তৌহিদুজ্জামান আকন্দ, মাহমুদা আক্তার, লুবানা জাহান,  বিপুল দেবনাথ, আবু সাঈদ, মুহাম্মদ আজিজুল হক, খন্দকার শামছুল হুদা এবং মো. হাফিজুর রহমানের কাছ থেকে  ১২ লাখ ১২ হাজার ৯৯ টাকা করে ফেরত পাওয়া যাবে।

এছাড়া মো. জাবরুল ইসলামের কাছে ৬ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ টাকা, মো. কামরুল ইসলামের কাছে ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৪২৫, মোহাম্মদ লুৎফর রহমানের কাছে ১২ লাখ ৪১ হাজার ৫৮২, মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ হাসানের কাছে ১২ লাখ ৮১ হাজার ৫৮২, মোহাম্মদ এরশাদ আলীর কাছে ১২ লাখ ৪১ হাজার ৫৮২, মোস্তফা হাসানের কাছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৮, শাহানাজ পারভীনের কাছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৮ টাকা, ছিদ্দিকুন নাহার, ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯৭২, মো. ফারুক খানের ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৮, বিউটি রানী সরকারের কাছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৮, শফিকামালের কাছে ২ হাজার ৩২ হাজার ৫৮, নাসরিন আক্তার, ৪ হাজার ২১ হাজার ৯২৮, রেহানা পারভীনের ৪ হাজার ২১ হাজার ৯২৮, মো. আলমগীর হোসেনের ২ হাজার ৯২ হাজার ১০৪, মো. ফজলুল হকের কাছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৬০, মো. হাফিজুল ইসলামের কাছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৬০, শেফালী খাতুনের কাছে ৩৪ হাজার ৭৮, মো. খাইরুল বাশারের কাছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৪৭২, মো. সেলিমের কাছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৬০ টাকা ফেরত পাবে সরকার। তারা সবাই প্রতিষ্ঠানটিতে প্রভাষক পদে কর্মরত।

কলেজ শাখার সহকারী শিক্ষক পলাশ চন্দ্র সরকারের কাছে ৬ লাখ ১৫ হাজার ৫৩০ টাকা, চার প্রদর্শক মোহাম্মদ সোহাগ মিয়া, আফরিন জাহান, ফাতেমা তুজ জহুরা এবং  মাহফুজুর রহমানের কাছে যথাক্রমে ৮ লাখ ৯১ হাজার ২৮৪, ৮ লাখ ৯১ হাজার ২৮৪ ৪০, ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৫৭৬ এবং ৮ লাখ ৯১ হাজার ২৮৪ টাকা করে ফেরত পাবে সরকার।

দুই সহকারী গ্রন্থাগারিক রেফাজ উদিন এবং মো. আহসান উল্যাহর কাছে যথাক্রমে ১ লাখ ৭১ হাজার ৯০০ এবং  ৮ লাখ ৯১ হাজার ২৮৪ টাকা করে; দুই অফিস সহকারী মো. আমিনুল হক এবং আসাদুজ্জামানের কাছ থেকেই ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৯ টাকা করে; হিসাব সহকারী মো. আব্দুল্লাহ আল ফাহিমের কাছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৯ টাকা, চারজন ল্যাব সহকারী ইমরুল হাসান কায়েস, ইসরাত জাহান, সুসমিতা আক্তার জেরিন এবং শেফালী বেগমের কাছে যথাক্রমে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৭৯৬, ৩ লাখ ৯ হাজার ৮৯৬, ৩ লাখ ৯ হাজার ৩৬৮ এবং ৩ লাখ ৩৪ হাজার ১৩২ টাকা করে ফেরত পাবে সরকার। 

চার অফিস সহায়ক মো. জুয়েল মিয়া,  সুজন মিয়া, মো. আমিনুল ইসলাম, আরিয়ান হাসান যথাক্রমে  ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৬২০, ৪ লাখ ৯১ হাজার ৬৫৫, ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৬৫৫ এবং ২ লাখ ৯৭ হাজার ৮৩ টাকা করে ফের পাওয়া যাবে। এছাড়া নিরাপত্তাকর্মী রাকিবুল হাসান রনি এবং  মো. জাকারিয়া ইসলামের কাছে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯৩৭ ও ৬৮ হাজার ৮২২ টাকা করে ফেরত পাওয়া যাবে। কম্পিউটার অপারেটর আশরাফুন নাহারের কাছে ৭৬ হাজার ৫৭৬, নিরাপত্তাকর্মী মোস্তফা কামালের কাছে ৭৬ হাজার ৩৫০ এবং অফিস সহায়ক রিফাত হাসানের কাছে ৭৬ হাজার ৩৫১ টাকা করে ফেরত পাবে সরকার। কলেজ শাখা কর্মরত আরও দুই জাল সনদধারী তাদের তথ্য না দেওয়ায় তাদের হিসাব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

স্কুল শাখা কার কাছে কত টাকা পাওয়া যাবে
বনপাড়া আদর্শ স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আরিফ রব্বানীর কাছ থেকে ৯ লাখ ১ হাজার ৮৭৭ টাকা, চার সহকারী শিক্ষক আছাদুজ্জামান, শামছুন নাহার, নাসরীন সুলতানা এবং আয়েশা খাতুনের কাছে যথাক্রমে  ৮ লাখ ৫ হাজার ১৯৪, ৩৭ লাখ ১১ হাজার ৭৩৮, ২৮ লাখ ৭১ হাজার ৭৪৮ এবং ৩২ লাখ ৮৯ হাজার ২৬০ টাকা করে ফেরত পাওয়া যাবে। এছাড়া অফিস সহায়ক ইসমেতারা, পরিচ্ছন্নতা কর্মী আবু নাঈম আয়া ঝর্ণা আক্তার এবং  নৈশপ্রহরী তরিকুল ইসলামের কাছে যথাক্রমে ৫ লাখ ৬০ হাজার ৮১৫, ৫ লাখ ৬০ হাজার ৭২৩, ৫ লাখ ৬০ হাজার ৭২৩ এবং ৫ লাখ ৬০ হাজার ৭২৩ টাকা করে ফেরত পাবে সরকার।