৭৩৯ জাল সনদধারীর কাছে সরকারের পাওনা ৫৩৪ কোটি টাকা
কুমিল্লার বড়ুরা উপজেলার বাতাইছড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের কম্পিউটারের সহকারী শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত মোহাম্মদ আক্তার হোসেন। তবে নিয়োগের সময় জমা দেওয়া তার কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সনদটি জাল বলে তদন্তে উঠে আসে। জাল সনদ দিয়ে চাকরি করে বেতন-ভাতা বাবদ ৩০ লাখ ৮০ হাজার টাকা আদায়ের সুপারিশ করেছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)।
সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার হযরত শাহজালাল (রা.) উচ্চবিদ্যালয়ের গণিতের সহকারী শিক্ষক মো. নাজিম উদ্দিন। ২০২৫ সালের ২৯ মার্চ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) তার শিক্ষক নিবন্ধন সনদ যাচাই করলে সেটি জাল বলে ধরা পড়ে। এর ফলে সরকারের কাছ থেকে নেওয়া বেতন-ভাতার ২২ লাখ টাকা আদায়যোগ্য বলে জানিয়েছে ডিআইএ।
শুধু এই দুই জাল সনদধারীই নয়; গত ২০২১-২২ অর্থ বছর থেকে শুরু করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশের ৭ হাজার ৩৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে ৭৩৯ জন জাল সনদধারী শনাক্ত করেছে ডিআইএ। এসব জাল সনদধারীর কাছে সরকার ৫৩৪ কোটি পাবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে বা সংশ্লিষ্ট অনিয়মের মাধ্যমে বেহাত হয়েছে অন্তত ২১৮৬ একর জমি। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭৩৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে দেওয়া প্রতিবেদন এই তথ্য উঠে এসেছে।
তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের এই সময়ে মোট ৮ হাজার ১৮টি প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে ডিআইএ। এর মধ্যে ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৭ হাজার ৯৮টি প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে আরও ৭৩৬টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে এক হাজার ৮২টি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে দুই হাজার ১০৩টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে ৮৬টি জাল সনদ শনাক্ত করা হয়। সরকারের আদায়যোগ্য অর্থ নির্ধারণ করা হয় ৪৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বেশি।
পরের বছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যায়। জাল সনদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৭টিতে। আদায়যোগ্য অর্থ এক লাফে বেড়ে ৯৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকায় পৌঁছায়। যদিও এই সময়ে পরিদর্শনের সংখ্যা বেড়ে দুই ২০৯টি হয়েছিল। তবে প্রতিবেদন কমে ১ হাজার ৩৪৯টিতে নেমে আসে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে পরিদর্শন কার্যক্রম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে ২ হাজার ৩৫৮টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে ডিআইএ। এই সময় ১০৫টি জাল সনদ শনাক্ত করে সংস্থাটি। এই অর্থ বছরে ৮৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকার বেশি আদায়যোগ্য হিসেবে নির্ধারিত হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এ সময় পরিদর্শনের সংখ্যা কম ছিল। তবে প্রতিবেদন প্রেরণ বেড়ে ২ হাজার ৮৩২-তে পৌঁছায়। একই অর্থ বছরে সর্বোচ্চ ২৭৪টি জাল সনদ শনাক্ত হয়। আর্থিক অনিয়মও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছে ১৯৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা আদায়যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়।
চলতি অর্থবছরের আট মাসেই আরও ১৪৭টি জাল সনদ শনাক্ত করা হয়েছে। ফলে মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩৯-এ। একইভাবে চার বছরে প্রায় ৪১৯ কোটি টাকা আদায়যোগ্য হিসেবে নির্ধারিত হলেও চলতি বছরে আরও ১১৫ কোটি টাকা যোগ হওয়ায় মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৩৪ কোটিতে।
পাঁচ বছরে বেহাত ২১৮৬ একর জমি
জানা গেছে, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭৩৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে ডিআইএ। এসব প্রতিষ্ঠানের ১৯৯ একর জায়গা বেহাত হয়েছে বলে ডিআইএর তদন্তে উঠে এসেছে। এর আগের অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭১২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তদন্ত করা হয়। এ সময় ৬৫৭ একর জমি প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ হাজার ৩৫৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তদন্ত করে ডিআইএ। এ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২৩২ একর জমি প্রভাবশালীদের দখলে চলে যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ২০৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তদন্ত করে ডিআইএ। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪৬৫ একর জমি প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ১০৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তদন্ত করে ডিআইএ। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ৬৩৮ একর জমি প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে।
যেসব স্কুলের জায়গা বেদখল
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মধুবাগের শের-ই-বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১ দশমিক ৪৬ একর জমি বেহাত হয়েছে। সম্প্রতি ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের এক দিকে সড়ক, বাকি তিন দিকেই বহুতল আবাসিক ভবন।
ঢাকার শান্তিনগর এলাকায় নয়াটোলা এ ইউ এন মডেল কামিল মাদ্রাসা অনুমোদনের সময় ৯৩ শতাংশ জমি দেখানো হলেও বর্তমানে জমি রয়েছে ৭১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। যাত্রাবাড়ী মান্নান হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ অনুমোদনের সময় ৫৯ দশমিক ২৮ শতাংশ জমি খারিজ করা হয় প্রতিষ্ঠানের নামে। আরো ২৬ দশমিক ৪০ শতাংশ জমি প্রতিষ্ঠানের নামে কিনতে তহবিল থেকে ব্যয় করা হয় ১৫ লাখ টাকা। ডিআইএর সবশেষ পরিদর্শনে সেখানে ৮৪ দশমিক ৯০ শতাংশের বদলে ৩০ শতাংশ জমির অস্তিত্ব মেলে। বাকি জমির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
জমি বেহাত হওয়া আরেকটি প্রতিষ্ঠান গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার কে কে টি হাজী এন সি ইনস্টিটিউট। ২৭ বছর আগে এই প্রতিষ্ঠান একবার পরিদর্শন করেছিল ডিআইএ। তখন বিদ্যালয়ের জমির পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৩৯ একর। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি আবারও পরিদর্শন করে ডিআইএ। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বিদ্যালয়টির জমির পরিমাণ ৩ দশমিক ৪০ একর বলে উল্লেখ করা হয়।
ঢাকার গেন্ডারিয়ায় শ্যামপুরে ফজলুল হক মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৭০ সালে। শুরুতে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২ দশমিক ৩২ একর জমি থাকলেও বর্তমানে ১ দশমিক ০৫ একর জমি রয়েছে। পরিদর্শনে এক একরের বেশি জমি বেহাত হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএ।
ডিআইএর বক্তব্য
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইএ পরিচালক প্রফেসর এম. এম সহিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘জনবল সংকটসহ নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। জাল সনদ এবং প্রতিষ্ঠানের জমি বেহাত হওয়ার বিষয়টি প্রতিটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে গুরুত্বসহ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বেহাত হওয়া জমি ও অন্যান্য অনিয়ম তুলে ধরে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।’