১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:৫৯

৪৮ ঘণ্টাও পেরোয়নি, মিলনে চমক দেখল শিক্ষা পরিবার

এহছানুল হক মিলন  © ফাইল ছবি

দশক দুয়েক আগে যেন ভাঁজ করে রেখে গিয়েছিলেন দেশের শিক্ষা জগৎটা। সময়ের দীর্ঘ ব্যবধানে সেই ভাঁজে জমেছিল ধুলা, বদলেছিল প্রেক্ষাপট, সঙ্গে প্রজন্মও। ২০ বছর পর ফিরে এসে যেন আবার সেই পুরোনো খাতা খুলে বসলেন। চেনা দপ্তর, পরিচিত করিডোর, মুখগুলোও অনেকটাই আগের মতো; শুধু সময়ের ছাপ স্পষ্টতর। ফেরার এই মুহূর্তে তার পদক্ষেপে আছে অভিজ্ঞতার ভার, কথায় আছে পুরোনো দায়বদ্ধতার সুর। যেন অতীতের অসমাপ্ত কাজগুলোকেই নতুন সময়ের প্রেক্ষাপটে মেলে ধরার চেষ্টা। পরিচিত পরিসরে ফিরেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন দীর্ঘ বিরতির পরেও শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে গুছিয়ে দাঁড় করানোর সেই লক্ষ্য তার আগের মতই আছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় লাভের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই শিক্ষা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে আশাব্যঞ্জক বার্তা দিয়েছেন তিনি। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে প্রথম কর্মদিবসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন নতুন এই শিক্ষামন্ত্রী।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল ও কার্যকর করতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা। দায়িত্ব গ্রহণের দ্বিতীয় দিন আজ বৃহস্পতিবারও তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ সময় তার বক্তব্যে প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও শিক্ষাবান্ধব ব্যবস্থার রূপরেখা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে জবাব দেন শিক্ষামন্ত্রী। বিগত সময়ে শিক্ষা প্রশাসনে ঘটে যাওয়া নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের বদলি প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে সফটওয়্যারভিত্তিক ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন।

‘স্কুল-কলেজ, কারিগরি ও মাদ্রাসার ছুটি নিয়ে অসন্তোষ ছিল, প্রথম কর্মদিবসেই সেই অসন্তোষ দূর করেছেন আমাদের শিক্ষামন্ত্রী। আমরা এমন শিক্ষামন্ত্রীই চেয়েছিলাম, যিনি সমস্যা জেনে বসে থাকবে না, সমস্যার সমাধান করবে।’- রাশেদ মোশাররফ, শিক্ষক নেতা

দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা হলে গণমাধ্যমের সামনে জবাবদিহি করতে প্রস্তুত থাকার ঘোষণাও দেন তিনি। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ, পরীক্ষায় নকল বন্ধ, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠে ফেরানো, শিক্ষকদের বেতন ও উৎসব ভাতা বৃদ্ধি, নির্ধারিত সময়ে বেতন প্রদান এবং বদলি প্রক্রিয়া চালু করাসহ শিক্ষা খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন শিক্ষামন্ত্রী।

শিক্ষামন্ত্রীর এমন বাস্তবমুখী উদ্যোগ ও সুপরিকল্পিত কর্মপরিকল্পনায় ইতোমধ্যেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মে জর্জরিত দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নয়নের ধারায় ফেরাতে কার্যকর নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল। আর সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হবেন নতুন শিক্ষামন্ত্রী।

কারিগরি শিক্ষক নেতা রাশেদ মোশাররফ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘স্কুল-কলেজ, কারিগরি ও মাদ্রাসার ছুটি নিয়ে অসন্তোষ ছিল, প্রথম কর্মদিবসেই সেই অসন্তোষ দূর করেছেন আমাদের শিক্ষামন্ত্রী। আমরা এমন শিক্ষামন্ত্রীই চেয়েছিলাম, যিনি সমস্যা জেনে বসে থাকবে না, সমস্যার সমাধান করবে।’

শিক্ষকদের উৎসব ভাতা বৃদ্ধির আশ্বাস
বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা পান। এ ভাতা শতভাগ করতে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সাথে আলাপকালে এ আশ্বাস দেন তিনি।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের শতভাগ উৎসব ভাতা পেলেও বেসরকারি শিক্ষকরা সেটা পান না। এ বিষয়টি নিয়ে আপনি কাজ করবেন কি না। প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের উৎসব ভাতার বিষয়টি আমি অবগত। এবার (এই সরকারের আমলে) এটা হয়ে যাবে। আমরা বিষয়গুলো কাজ করছি।’ 

এমপিওভুক্তিতে অনিয়ম যাচাই করার আশ্বাস
জাতীয় নির্বাচনের আগে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবেদন যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। 

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনের আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য যেসব আবেদন পড়েছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার সিদ্ধান্ত নিবে। কোনো ধরণের অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে কিনা আমরা সেসব বিষয় খতিয়ে দেখব।’

তিনি বলেন, ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলির প্রক্রিয়াটি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চালু করা হবে। আমি আশা করছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিক্ষকদের বদলি প্রক্রিয়াটা চালু করা হবে। না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সিস্টেমে যদি কোনো ত্রুটি থেকে থাকে, সেটাও খতিয়ে দেখা হবে।’

শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির আশ্বাস
বেসরকারি শিক্ষকদের নামমাত্র বেতনে চাকরি শুরু করা এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি সংক্রান্ত দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেছেন, ‘অপেক্ষা করুন এবং দেখুন আমরা কী করতে যাচ্ছি।’

প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বেসরকারি শিক্ষকদের এই স্বল্প বেতনের বিষয়টি স্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘সেটা আপনিও জানেন, আমিও জানি। লেস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি হোয়াট উই গো ডু। ইউ নো দ্যাট আমরা জানি এটা। আমরা কী করতে যাচ্ছি, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করুন, আপনারা জানেন আমরা এ বিষয়ে অবগত আছি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বদলি বাণিজ্য বন্ধের আশ্বাস
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কোনো বদলি বাণিজ্য চলবে না বলে মন্তব্য করেছেন নতুন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমগুলো অ্যাপভিত্তিক করা হবে, সময়মত শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্মত বই তুলে দেওয়া হবে এবং থাকবে না কোনো সিন্ডিকেট। 

কারিকুলাম চেঞ্জ নয়, রিভিউ হবে
শিক্ষাক্রম রিভিউ করা হবে বলে জানিয়েছেন নতুন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। এ সময় লিখিত বক্তব্যে শিক্ষা নিয়ে নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন নতুন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি করব না, আমরা শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্র গড়ব।’

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ
ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলগুলোকে নীতিমালার আওতায় আনার কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।বৃহস্পতিবার দুপুরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে শিক্ষামন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। এ সময় তার সঙ্গে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজও উপস্থিত ছিলেন।

এহছানুল হক মিলন বলেন, আমরা আমাদের সময়ে হেরিটেজ, কালচার, হিস্ট্রি, রিলিজিওন্সকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাপিডিয়াতে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। কিন্তু আমরা তখন ওদেরকে (ইংলিশ মিডিয়ামকে মন্ত্রণালয়ের) রেগুলেটরিতে আনতে পারিনি। সেই সময় এ উদ্যোগটা নিয়েও নেওয়া হয়নি। সেটা ভিন্ন গল্প। এবার আমার সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর কথা হয়েছে। আমরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে কীভাবে মন্ত্রণালয়ের রেগুলেটরির আন্ডারে আনা যায়, সেই ব্যবস্থা আমাদের নিতেই হবে।

শিক্ষার উন্নয়নে ১২ উদ্যোগ

১) বাজেটের ‘এনভেলপ’ বাড়ানো:
আমরা সবাই জানি, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রথম শর্ত অর্থায়ন। গত বছরগুলোতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ১২ শতাংশের আশেপাশে থেকেছে, এবং জিডিপির অনুপাতে তা দেড়-দুই শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করেছে-এটা একটি কাঠামোগত সীমা। কিন্তু আমাদের সরকারের-বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার: শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া এটা আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার। আর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডও বলে, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪-৬ শতাংশ এবং মোট সরকারি ব্যয়ের ১৫-২০ শতাংশ এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হবে।

এই লক্ষ্যগুলো অর্জনে আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মাঝারি মেয়াদের বাজেট কাঠামো অনুযায়ী তিন বছরের ধাপে ধাপে ফিসক্যাল আপলিফট পরিকল্পনা দেব। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়লেও শুধু মোট টাকার পরিমাণ নয়, কোথায় টাকা যাবে সেটাও বদলাতে হবে। তাই বাজেটের সমতা ও শেখার ফলাফল দুটি প্রধান সূচক হবে। 

২) উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন:
শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, খরচের গুণগত মান বদলাতে হবে। আমরা স্বীকার করছি, উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ বছরের শেষে হঠাৎ খরচ হয়। এর ফলে বই, নির্মাণকাজ, প্রশিক্ষণ সবকিছুই স্কুল ক্যালেন্ডার মিস করে। একটি কঠিন সত্য আজ আমি পরিষ্কারভাবে বলছি গত অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উন্নয়ন তহবিলের প্রায় ৫৩ শতাংশ অব্যবহৃত থেকে ফেরত গেছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি শিক্ষার্থীর সময় ও সুযোগের ক্ষতি। 

এটি বাস্তবায়নে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কমিশনের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অনুমোদন ও প্রকল্প গেটকিপিং স্কুল বর্ষপঞ্জির সঙ্গে রি-অ্যালাইন করব। অর্থ বিভাগের ক্যাশ রিলিজ সমান কিস্তিতে না করে মাইলস্টোনভিত্তিক করব কোড, টেক্সটবুক, প্রশিক্ষণ, নির্মাণ সবগুলোর আলাদা মাইলস্টোন থাকবে। ই-জিপি (ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা) বাধ্যতামূলকভাবে আগেভাগে চালু করে প্রকিউরমেন্ট প্ল্যানিং করব, যাতে জুনে এসে দরপত্রের ভিড় না হয়। কন্ট্রোলার জেনারেল অব অ্যাকাউন্টসের লেজার পর্যন্ত হিসাব থাকবে, কিন্তু সেই হিসাবের শেষ গন্তব্য হবে ক্লাসরুমের আওয়ার মানে পাঠদানের ঘণ্টা।’

৩) উন্নয়ন ব্যয়কে অগ্রাধিকার:
চলতি ব্যয় স্কুলকে খোলা রাখে, কিন্তু উন্নয়ন ব্যয় স্কুলকে আধুনিক করে। আমাদের অগ্রাধিকার হবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, ভাষা ল্যাব তৈরি করা, ডিজিটাল কনটেন্ট ও মূল্যায়ন সক্ষমতা তৈরি করা, স্কুলের অবকাঠামো বিশেষ করে পানি, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক করা। এখানে আমরা নির্বাচনী অঙ্গীকারও বাস্তবায়ন করব মিড-ডে মিল, পরিষ্কার টয়লেট এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা। 

৪) ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব:
ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ শুধু ডিভাইস নয়, এটা পেডাগজি-রিফর্ম। আমাদের ইশতেহারে আছে, ‘ফ্রি ওয়াই-ফাই, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব। আমরা এটাকে ‘গ্যাজেট প্রজেক্ট’ বানাব না। আমরা এটাকে বানাব শিক্ষণ-শেখার অপারেটিং সিস্টেম। আমরা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সাথে সমন্বয় করে স্কুল পর্যায়ে ডিজিটাল লিটারেসি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সচেতনতা, সাইবার সেফটি এই তিনটি বাধ্যতামূলক সক্ষমতা হিসেবে নিয়ে আসব।

 শিক্ষক ট্যাবের ভেতর থাকবে, পাঠ-পরিকল্পনা টেমপ্লেট, প্রশ্নব্যাংক, উপস্থিতি ও শিখন-প্রমাণ (লার্নিং এভিডেন্স) আপলোড যাতে ‘শেখা’ ট্র্যাক করা যায়। আর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘ডিজিটাল দক্ষ বাংলাদেশ’ ভিশন বাস্তবায়নে জাতীয় ডিজিটাল দক্ষতা কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রতিশ্রুতির সাথে শিক্ষা খাতকে যুক্ত করব।

৫) তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক:
তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। এটির বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে, কারণ শিক্ষক, কনটেন্ট ও মূল্যায়নের প্রস্তুতি প্রয়োজন। আমাদের নীতি বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে তৃতীয় ভাষা যেমন আরবি, চীনা, জাপানি, ফরাসি যেগুলোর শ্রমবাজার ও উচ্চশিক্ষায় চাহিদা আছে। ভাষা শিক্ষা শুধু পড়া-লেখা নয়, শোনা ও বলাও যুক্ত করা হবে। মূল্যায়নে ধাপে ধাপে কমিউনিকেশন স্কিল অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কারণ পরীক্ষা যা মাপে, স্কুল সেটাই শেখায়। বিশ্ব প্রতিযোগিতামূলক মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে বহুভাষিক শিক্ষা একটি বাস্তব হাতিয়ার।’

৬) বিজ্ঞান, কোডিং, রোবোটিক্স: 
আমরা মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই বিজ্ঞান শিক্ষা, প্রযুক্তি সাক্ষরতা ও প্রজেক্টভিত্তিক কাজকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেব। প্রতিটি উপজেলায় নির্বাচিত স্কুলে রোবটিক্স ও মেকার কর্নার তৈরি হবে। বিজ্ঞানকে বই থেকে বের করে টার্মভিত্তিক প্র্যাকটিক্যাল রুটিনে আনা হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে বিষয়জ্ঞান ও অ্যাসেসমেন্ট লিটারেসি বাধ্যতামূলক করা হবে। এই উদ্যোগগুলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ যৌথভাবে চালাবে।’

৭) মাধ্যমিকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক:
মাধ্যমিক থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক। আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী খেলাধুলায় জোর দিয়ে জাতীয় সংস্কৃতি ও সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশ করা হবে। মাধ্যমিক স্তরে ক্রীড়া শুধু ইভেন্ট হিসেবে নয়, টাইমটেবিলভিত্তিক বাধ্যতামূলক হবে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ে স্কুল ক্রীড়া প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। প্রতি সপ্তাহে নির্ধারিত স্পোর্টস পিরিয়ড থাকবে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ট্যালেন্ট হান্ট এবং স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপ বা লিগ চালু করা হবে।’

৮)  লার্নিং ট্রাজেক্টরি ও গ্রেড-টু-গ্রেড কনসেপ্ট ম্যাপ প্রকাশ:
কারিকুলাম যদি দক্ষতার কথা বলে আর পরীক্ষা যদি মুখস্থ মাপে, তাহলে কোচিং বাড়বে। তাই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে নির্দেশনা দেওয়া হবে প্রতিটি বিষয়ের লার্নিং ট্রাজেক্টরি ও গ্রেড-টু-গ্রেড কনসেপ্ট ম্যাপ প্রকাশ করতে। পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে ওয়ার্কড এক্সাম্পল, প্র্যাকটিস সেট ও রিভিশন ক্যালেন্ডার যুক্ত করা হবে। বোর্ড পরীক্ষায় ধাপে ধাপে আইটেম ব্যাংক, ব্লুপ্রিন্ট, মডারেশন এবং স্কুলভিত্তিক মূল্যায়ন গাইডলাইন চালু করা হবে। লক্ষ্য একটাই শিখনফল; শুধু সনদ নয়, সক্ষমতা।

৯) প্লুরালিজম থাকবে-কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড এক থাকবে:
বাংলাদেশে সরকারি স্কুল, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আলিয়া মাদ্রাসা, কওমি শিক্ষা, কারিগরি সব আছে। এই বৈচিত্র্যকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু বৈচিত্র্য মানেই অসম মান হতে পারে না। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ যৌথভাবে ন্যূনতম শিখন-মানদণ্ড (মিনিমাম লার্নিং স্ট্যান্ডার্ড) নির্ধারণ করবে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সরকারি বেতন-সুবিধা ও স্বীকৃতি-এসবের সাথে শিক্ষাদানের বাস্তব প্রমাণ (কন্ট্যাক্ট আওয়ার, ক্লাস অবজারভেশন, লার্নিং এভিডেন্স) যুক্ত হবে কওমি সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, এবং কারি ও আলেমদের রাষ্ট্রস্বীকৃতি। 

১০) কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে ক্রেডিট ব্রিজ:
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ে ক্রেডিট ব্রিজ কোর্স তৈরি হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া ইন্টার্নশিপ ও ক্যারিয়ার সেন্টার বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বাধ্যতামূলক করা হবে।

১১) উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ইনোভেশন গ্র্যান্ট: 
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্লাস নেবে না, গবেষণা ও উদ্ভাবন করবে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ইনোভেশন গ্র্যান্ট চালু করা হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য স্টুডেন্ট লোন ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা সহায়তার ব্যবস্থা থাকবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়ন ও মানোন্নয়ন করা হবে। এটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার রোডম্যাপের অংশ।

১২) জবাবদিহিতা থাকবে কন্ট্রোলার জেনারেল অব অ্যাকাউন্টস থেকে ক্লাসরুম পর্যন্ত:
প্রকল্পের টাকা খরচ হলো, কিন্তু ক্লাস হলো না এমন সংস্কৃতি ভাঙব। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে মাসিক পাবলিক ড্যাশবোর্ড থাকবে প্রকল্প অগ্রগতি, প্রশিক্ষণ সংখ্যা, বই বিতরণ, ক্লাস ঘণ্টা সব তথ্য উন্মুক্ত থাকবে। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে শিক্ষা রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ হবে। অভিযোগ ও সেবা মান পর্যবেক্ষণে ট্র্যাকিং নম্বরভিত্তিক ফিডব্যাক ব্যবস্থা থাকবে। রাষ্ট্র চলবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে।’

‘প্রথম ধাপ ডায়াগনস্টিক রিভিউ, উন্নয়ন বাজেট ফেরত যাওয়ার কারণভিত্তিক রুট-কজ অ্যানালাইসিস, শিক্ষক ট্যাব, মাল্টিমিডিয়া ও ভাষা শিক্ষা পাইলট ডিজাইন। দ্বিতীয় ধাপ প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সম্মতি নিয়ে জাতীয় শিক্ষা রোডম্যাপ ঘোষণা, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ও পরিমাপযোগ্য সূচকসহ। তৃতীয় ধাপ পরীক্ষা ও মূল্যায়নে বড় টেকনিক্যাল রিফর্ম, সাধারণ, মাদ্রাসা, কারিগরি ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা ও ইনোভেশন ব্র্যান্ড স্কেল-আপ।’