কোনো জরিপ খুঁজে পাওয়া যায়নি, পেজ থেকে ছড়ানো ভুয়া ফটোকার্ড নিয়ে আলোচনা
‘সকালের নাস্তা করেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী’—এমন একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর পর ক্যাম্পাসে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। এই আলোচনা ও সমালোচনায় যোগ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী, ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে শিক্ষকরাও। তবে ভাইরাল হওয়া ফটোকার্ডটি ভুয়া ও ভিত্তিহীন বলে নিশ্চিত হয়েছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির এক ছাত্রের পরিচালিত পেজ থেকে ফটোকার্ডটি গতকাল শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ছড়িয়েছে। আর ফটোকার্ডটির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘শিক্ষার্থীরা জানতে চেয়েছে সকালেও মানুষ খায়?’ ফটোকার্ডটিতে ছবি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ২০২৫ সালের ৬ জুলাই জাগো নিউজে প্রকাশিত ‘ঢাবির হল ক্যান্টিনে খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ’ শীর্ষক সংবাদের লিড ফটোটি।
আজ শনিবার (২৫ জুলাই) রাতে বিষয়টি নিয়ে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষ এক কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে নিশ্চিত করেছেন, এ ধরনের কোনো জরিপ কিংবা সার্ভে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে হয়নি। বাহিরের কেউ করেছে কিনা সেটাও তার নজরে আসেনি।
এদিকে, গুগল ও ফেসবুকে সার্চ ইঞ্জিনে কি-ওয়ার্ড অনুসন্ধান করে এ ধরনের কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, মো. ফয়সাল উদ্দিন নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীসহ কয়েকজন মিলে ডিইউ ইনসাইডারস (DU Insiders) নামে একটি ফেসবুকে পরিচালনা করেন। এটির ফলোআর সংখ্যা ৪ লাখ ৩০ হাজার। পেজটিতে প্রতিনিয়ত বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাসহ সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে ফটোকার্ড শেয়ার করা হয়। ফয়সাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র।
জানতে চাইলে ফয়সাল উদ্দিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে নিশ্চিত বলেছেন, এরকম কোনো জরিপ আনুষ্ঠানিকভাবে হয়নি। তবে সম্প্রতি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়েছে। আমরা তো আর অথিরিটি না। কতজন কতকিছু পোস্ট করে এরকম। আমরাও এটা পোস্ট দিয়েছি।
‘আমি একা এডমিন নয়। আরও কয়েকজন পেজটি চালাই’—জানিয়েছেন ফয়সাল উদ্দিন।
ফটোকার্ডটি ভুয়া ও ভিত্তিহীন হলেও বিষয়টি সঠিক ভেবে আলোচনা ও সমালোচনা করছেন অনেকেই, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেছেন, তারা (পেজটি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের কিছু শিক্ষার্থীর মাঝে ছোট্ট একটা জরিপ করেছেন। এ জরিপের উপর ভিত্তি করেই এ ফেসবুক পোস্টটি দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের জরিপের সাইজ ছোট্ট হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, গুগল সার্চ ইঞ্জিনে কি-ওয়ার্ড অনুসন্ধান করে গত ২৩ জুলাই কালের কণ্ঠ অনলাইনে ‘সকালের নাশতা করেন না বাকৃবির ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া গেছে। এতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) শিক্ষার্থীদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে পরিচালিত এক জরিপে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত সকালের নাশতা করেন না। এ ছাড়া প্রায় ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত দুপুরের খাবার এবং প্রায় ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত রাতের খাবারও গ্রহণ করেন না। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কমপ্লেক্সের সভাকক্ষে বাকৃবি শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত ‘শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের খামারগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এসব তথ্য তুলে ধরেন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান সরকার।’
অন্যদিকে, ছড়িয়ে পড়া ভুয়া ফটোকার্ডটিতে ছবি হিসেবে ব্যবহার করা ২০২৫ সালের ৬ জুলাই জাগো নিউজে প্রকাশিত ‘ঢাবির হল ক্যান্টিনে খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ’ শীর্ষক সংবাদেও এরকম কোনো জরিপের কথা উল্লেখ নেই। সেটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন ছিল।
গতকাল ফটোকার্ডটি ছড়িয়ে পড়ার পর ইস্যুটি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। আজ সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সিনেট সদস্য ড. কামরুল হাসান মামুন ফটোকার্ডটি শেয়ার করে বলেছেন, ‘‘অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা সর্বজন বিধিত। শুধু তাই না ভাষা আন্দলোন, ৯০ এবং ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নেতৃত্ব দিয়েছে। আর স্বাধীনতার পর থেকে সকল সরকার একে ব্যবহার করেছে কেবল বিনিময়ে দেয়নি কিছুই। ছাত্র শিক্ষকরাও তেমনি। শুধু ব্যবহৃত হয়েছে পায়নি কিছুই। দাবিও করেনি। যখন শিক্ষায় সবচেয়ে কম বরাদ্দ দিয়েছে তখনও খোদ ঢাকা বিশ্ববদিয়ালয়ের ছাত্ররাই আনন্দ মিছিল করেছে। সরকারকে বাজেটের জন্য ধন্যবাদ ও স্বাগতম জানিয়েছে। তাহলে তারা কি এর চেয়ে ভালো কিছু ডিজার্ভ করে? এই যে বর্তমান সরকার এত কম বরাদ্দ দিল ছাত্র শিক্ষক কেউ প্রতিবাদ করে বেশি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে? তাহলে কিসের জন্য ছাত্র শিক্ষক রাজনীতি? খামুশ থাকার জন্য?’’
আতিক শাহরিয়ার হামীম নামে এক শিক্ষার্থী লেখেন, ‘‘একটা রিপোর্ট দেখলাম, ঢাবির ৭৫% শিক্ষার্থী সকালের নাস্তা করে না। শুধু ৭৫% না, আমি মনে করি ৯৫%-ই করে না। ঢাবির একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে সংকটের জায়গা কী জানেন? উত্তর: খাবার।’’